.
একটু পরেই দরজার বাইরে একটা ভিজে মানুষের মূর্তি দেখা গেল। দরজায় এসে দুটো হাত দুদিকে রেখে মাথা গলিয়ে দিল সে। মেয়ে দুটি অমনি অস্ফুট চেঁচিয়ে উঠল। বড়বড় চোখে তাকাল তার দিকে। দুজোড়া চোখে প্রচণ্ড আতঙ্ক ম্লান আলোয় ঝলমল করে উঠল।
নবও নড়ে উঠেছিল। সে সিংহের মতো গ্রীবা ঘুরিয়ে দেখছিল আগন্তুককে।
কারণ, আগন্তুকের মুখে একটা কালো মুখোশ।..
সে এক লাফে ভিতরে এসে গেল। পরক্ষণে তার হাতে ঝলসে উঠল একটা ছোরা। অমনি স্ন্যাকসপরা মেয়েটি জন্তুর মতো অব্যক্ত একটা আর্তনাদ করে কোণের দিকে ছিটকে গেল। অসমাপ্ত গ্লাসগুলো উল্টে ঝনঝন শব্দে নিচে পড়ে ভাঙল। বেলবটমপরা মেয়েটি যেন হতবুদ্ধি হয়ে বসেছিল। আততায়ী ছোরাটা নিয়ে এক পা এগোতেই সে মুখে আঙুল পুরে গোঁ গোঁ করে উঠলতারপর কাউন্টারের দিকে দৌড়ে যেতে চেষ্টা করল। কিন্তু তার সামনে আততায়ী-তাই কিচেনের দরজার দিকে এগোল।
তাও পারল না। আততায়ী এক লাফে সেদিকে এগোলে মেয়েটি কোণে তার সঙ্গিনীর কাছে চলে গেল। দুজনেই ভীষণ কাঁপছিল।
বড়জোর কয়েকটা সেকেণ্ডের মধ্যে এগুলো ঘটল।
তখন দেখা গেল নব আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াচ্ছে। তার মুখে সংশয়। প্রস্তুতির অভাব তখনও স্পষ্ট। আগন্তুকের হাতে ছোরা রয়েছে।
দ্য শার্কের সাত বছরের জীবনে এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি। মারামারি বিস্তর হয়েছে কিন্তু হঠাৎ এমন দুর্যোগের রাতে নির্জন পরিবেশে মুখোশপরা কোনও লোক ছোরা হাতে ঢোকেনি। নব তাই হয়তো হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল।
আট-দশ সেকেণ্ডের মধ্যে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। আততায়ী ছোরাটা তুলে জড়সড় বোবায়ধরা মেয়ে দুটির দিকে এগোতেই বেলবটমপরা ফরসা মেয়েটি ছিটকে সদর দরজার কাছে চলে গেছে এবং তারপর তাকে বাইরে অদৃশ্য হতে দেখা গেল।
তারপর ভয়ঙ্কর কানামাছি খেলা চলল স্ন্যাকসপরা বেঁটে মেয়েটি ও আততায়ীর মধ্যে। মেয়েটি বোবায়ধরা গলায় গোঁ গোঁ করতে করতে এদিক-ওদিক লাফ দিচ্ছে। টেবিল-চেয়ার ইত্যাদি লণ্ডভণ্ড হচ্ছে। নব সেইসময় একহাতে চেয়ার তুলে অন্যহাতে একটা বড় বোতল তাক করল। সে খুব অবহেলায় ব্যাপারটা দেখছিল।
আর সেই মুহূর্তেই দ্বিতীয় মেয়েটিও ছিটকে সদর দরজা গলিয়ে বেরিয়ে পড়ল এবং অদৃশ্য হলো। নবর বোতলটা লাগল দরজার পাশে। প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে গেল। আততায়ী তখন দরজায়। পরক্ষণে নব দ্রুত একটা সোডার বোতল তুলে। মারল। বোতলটা বাইরে বৃষ্টির মধ্যে মোটাসোটা বাচ্চার মত ধপ্ করে পড়ল মাত্ৰ-ফাটল না। লন মতো আছে ওখানটায়-ঘাস আর ফুলের গাছ রয়েছে। ঘাস আর ফুলের গাছের মধ্যে বেহেড মাতালের মতো ঘাড় গুঁজে পড়ে রইল বোতলটা।
তখন নব দুহাতে চোখ মুছল। মঞ্চে কেউ নেই।
দুঃস্বপ্ন দেখছিল না তো?
.
মোটেও না। রেস্তোরাঁর ভিতর জলজ্যান্ত ওল্টানো টেবিল-চেয়ার, ভাঙা কাচের গ্লাসগুলো, ছত্রাকার ছাইদানি ইত্যাদি-মেঝের কারপেট ভিজে গেছে ইতস্তত, একটা বোতল থেকে তখনও বগবগ করে জল পড়ছে। দরজার কাছে অজস্র কাচের .. টুকরো। একদিকের পর্দা ছিঁড়ে বেমক্কা ঝুলছে।
নব প্রথমে এক লাফে দরজায় এসে বাইরে তাকাল। কেউ কোথাও নেই। বাতিগুলি বৃষ্টির ঝাপটায় ম্লান-বিচের দিকে যেন কুয়াশার পর্দা ঝুলছে। ডাইনে বাঁয়ে উপকূলের সমান্তরাল অপ্রশস্ত রাস্তা নির্জন। ফুলগাছ কিংবা অন্যান্য সব বড় গাছগুলো বৃষ্টির মধ্যে ছটফট করছে, যেন পায়ে বাঁধা সব জন্তু-জানোয়ার।
সে দরজা ভাল করে এঁটে দিল। ডানপাশের কোনও বাড়ি বলতে বালিয়াড়িটার পিছনে কোস্টের সবচেয়ে কস্টলি হোটেল সী ভিউ। অন্তত চল্লিশ-পঞ্চাশ গজ হেঁটে যেতে হয় এখান থেকে। বাঁ পাশে একটা লম্বা ঝাউবন পেরিয়ে অন্তত একশো গজ দূরত্বে এক ধনী মানুষের বাংলোবাড়ি। পিছনে দেড়শো গজ পোভড়া জায়গায় কাটাতারের বেড়া এবং সরকারের লোহালক্কড়ের পাহাড়, তার পিছনে ত্রিশ গজ দূরে অবজারভেটরি। তারপর বড় রাস্তা এবং ছড়ানো-ছিটানো বসতি এলাকা, বাজার এবং সরকারী কোয়ার্টার। তারও পিছনে সরকার-লালিত অরণ্য অঞ্চল এবং কয়েকটি টিলা বা হিলক-শ্রেণীর ক্ষুদে পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় কোথাও বাংলো, কোথাও আশ্রম আর মন্দির রয়েছে।
এই ভূগোল ও প্রকৃতি-পরিবেশ ঝটপট মনে ভাসল নবর। সে খুব ক্লান্ত বোধ করল। বৃষ্টি ছাড়বার কোনও লক্ষণ নেই। সমুদ্র গর্জাচ্ছে। কোনও পুলিশ অফিসারও তো আজ আসছে না এমন রাতে! হাঙরে কোনও ফোন নেই। বড়ো হোটেলগুলোয় আছে। কিন্তু বাইরে বেরোনো অসম্ভব।
মেয়ে দুটি গতকাল সন্ধ্যায় এসেছিল হাঙরে। হাফ-পেগ জিন নিয়ে দুঘন্টা কাটিয়ে গিয়েছিল। কেমন গম্ভীর টাইপ মেয়ে যেন কম কথা বলে। কলকাতা থেকে এসেছে, সেটা বোঝাই যায়। কোথায় উঠেছে ওরা? আর, আচমকা ওই মূর্তির উদয় হলো, তাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেল…কোনও মানে হয় না। এ একটা স্বপ্নই!
একটু পরে সে সিগারেট ধরাল। তারপর ধীরে সুস্থে ঘরটা সামলাতে ব্যস্ত হলো। কাচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে টেবিলে রাখল। তারপর মেয়ে দুটি যেখানে বসেছিল, সেখানে গেল। চেয়ারগুলো ঠিকঠাক করার সময় হঠাৎ তার চোখে পড়ল কিছু কাগজের টুকরো পড়ে রয়েছে কুচিকুচি এবং দলা পাকানো। দলা পাকানো কাগজটা সে অকারণ অন্যমনস্কতায় খুলল। একটা বড় কাগজের অংশ–কিন্তু ছাপানো নয়, হাতের লেখা। সে আদৌ লেখপড়া জানে না।
