একটু পরেই খুব তাড়াতাড়ি রাত এসে গেল। বৃষ্টির মধ্যে কুয়াশার মতো অপরিচ্ছন্নতায় বিচের বাতিগুলো জ্বলে উঠল। দ্য শার্ক বা হাঙর নামে একটেরে ঝাউবনের ধারে যে নির্জন ছোট্ট বার কাম-রেস্তোরাঁ রয়েছে, সেখানে ভিড় কম ছিল। মদ্যপিপাসুরা আজ বিকেলে সমুদ্রের ধারে বসে সুখ চেয়েছিল। তাছাড়া, কেন যেন আজ জমেইনি এখানকার আসর। কাউন্টারের ভদ্রলোক এক মাদ্রাজী। তিনিই মালিক। বিকেলে ভালো আবহাওয়া পেয়ে মোহনপুর চলে গেছেন– বউয়ের অসুখ নাকি। তিনজন ওয়েটার, কিচেনে দুজন রাঁধুনি, দুটো কিশোর বয় এবং কাউন্টারে রোগা হাড়জিরজিরে একজন বাঙালী কর্মচারী।
এ রেস্তোরাঁয় যারা দৌড়ে ঢুকেছিল, সাতটা অব্দি কেউ কেউ বিয়ার খেয়ে ভিজতে ভিজতে কেটে পড়ল। একজন অবশ্য হুইস্কি খেয়েছে পেগ তিনেক। সেও দুলতে দুলতে চলে গেল। এক মধ্যবয়সী দম্পতি ছিলেন। তারা লাইম দিয়ে জিন খেলেন এক পেগ করে তারপর রেনকোট চড়িয়ে বেরোলেন। রাত আটটাতেও বৃষ্টি চলেছে সমানে। এবং ঘরে তখন কোণার টেবিলে কেবল দুটি মেয়ে বসে রয়েছে। একজন স্ন্যাকসপরা, অন্যজন বেলবটম। বাইশ থেকে চব্বিশের মধ্যে বয়স। একজন মোটাসোটা, একটু বেঁটে, খুব পাতলা ঠোঁট আর একবার ভাজা বেগনীর মতো সরু নাক, ছোট্ট কপাল–উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ বলা যায় এবং তার মাথায় ববছাঁট চুল–সে স্ন্যাকস পরেছে ক্রিমরঙা। গায়ে তাঁতের ফিকে হলুদ হাফ পাঞ্জাবি–তাতে বাটিকের কালো ছাপ, কবিজিতে চওড়া কালো বেল্টের মোটা ঘড়ি। তার পায়ে সরু দু ফিতের হালকা স্লিপার।
বেলবটপরা মেয়েটির গায়ে শুধু ধবধবে সাদা গলা-আঁটো হাফ স্পোর্টিং গেঞ্জি, তার বুকে ব্রেসিয়ার নেই, তা স্পষ্ট। তার মুখটা একটু লম্বাটে–গালের দিকটা ডিমালো, চিবুক তিনকোণা কিন্তু প্রশস্ত, বেমক্কা পুরু ঠোঁট ঠোঁটের কোণায় উদ্দেশ্যহীন হাসির আভাস আছে। তার ভোলা বলিষ্ঠ বাহু দুটো টর্চের নতুন ব্যাটারি থেকে উৎসারিত জোরাল দুটি আলোর মতো। তারও কবজিতে মোটা ঘড়ি এবং একই ব্যাণ্ড। তার পায়ে পেতলের চওড়া বকলেস দেওয়া চটি। তার গায়ের রঙ বেশ ফরসা। হঠাৎ দেখলে অবাঙালী মনে হতে পারে। তার কপাল অশোভন ভাবে চওড়া এবং ঘন কালো ভুরু পাপড়ি, ডাগর চোখ, কালো একরাশ চুল কাঁধ থেকে কয়েক ইঞ্চি নেমে গেছে। কীরকম পুরুষালি চেহারা যেন। হঠাৎ দেখলে কিম্পুরুষ মনে হয়।
হাফ-পেগ জিন নিয়ে তারা রাত আটটা অব্দি হাঙর-এর মধ্যে বসে রয়েছে। তার জন্য অবশ্য এই দুঃসময়ে হাঙরওয়ালাদের কোনও বিরক্তি নেই বরং উপভোগ্য দ্রব্য, এই ক্লান্তিকর বৃষ্টির রাতে দুটি উঁচুদরের যুবতী! তাদের শরীরে বিবিধ আয়োজন এবং ধনী গৃহস্থের বিয়েবাড়ির দরজার সামনে দিয়ে যাবার সময় নিম্নবিত্ত যেমন একবার তাকিয়ে দেখে যায়, তেমনি করে ঘুরঘুর করে যাচ্ছে। রাঁধুনি, ওয়েটারদ্বয়–এমন কি বয় দুজনও।
মেয়ে দুটি কি বৃষ্টির দরুন উদ্বিগ্ন? তা কিন্তু কারো মনে হচ্ছিল না। ডেরায় ফিরে যাবার কোনও তাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছিল না তাদের মধ্যে। বরং যেন কী নিশ্চিন্ত নির্ভরতায় সময় কাটানো আলস্যে বৃষ্টিকে উপভোগ করছিল। চাপা গলায় কথা বলছিল পরস্পর। এদিকে ক্রমশ রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাবার নির্দিষ্ট সময় এগিয়ে আসছিল। আজ মালিক নেই, তুমুল বৃষ্টি আর নির্জনতা, তাই কাউন্টারের রোগা কর্মচারীটি হাই তুলে বারবার ঘড়ি দেখছিল। তার ইচ্ছে, নটার বেশি অপেক্ষা করা আজ অসম্ভব। মালিক আসবেন না। তাঁর স্কুটার না থেকে পুরোপুরি গাড়ি থাকলে অবশ্য অন্য কথা ছিল। তাই হঠাৎ দেখা গেল সে চাপা গলায় ওয়েটারদের কী সব বলে সাড়ে আটটাতেই অধৈর্য হয়ে বেরিয়ে গেল–দরজার কাছে ছাতা খুলল, তারপর বৃষ্টি ও কালো রাতের মধ্যে ডুব দিল।
তার পনের মিনিট পরে বেরোল দুজন ওয়েটার–আর তাদের ছাতার তলায় একজন করে ক্ষুদে বয়। আরও পাঁচটা মিনিট লম্বা পায়ে চলে গেল রাঁধুনি দুজনও একইভাবে বেরোল। তারা মেয়ে দুটোর দিকে একবার যথারীতি তাকিয়েও গেল।
এখন রইল শুধু সবচেয়ে শক্তিমান, লম্বাচওড়া গড়নের লোক তার নাম নব। নব হাঙরে রাতে একমাত্র পাহারাদার। বোঝা যায়, সেই মালিকের একমাত্র বিশ্বস্ত ও প্রশ্রয় পাওয়া কর্মী। কারণ ক্যাশবাক্সটা সে লম্বা মোটা হাতে অবহেলায় তুলে লোহার আলমারিতে ঢোকাল। চাবির গোছাটা উর্দির তলায় গাপ করল। তারপর ক্যাশ কাউন্টারে বসে মেয়ে দুটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার তাকানোর মধ্যে বিস্ময় বিরক্তি কিংবা প্রশ্নবোধক চিহ্ন নেই। বোঝা যায়, এই ধরনের জীবনে সে কোনও আকস্মিকতা আশা করে নাবস্তুত সব আকস্মিকতাই তার কাছে নিয়ম। এবং সেজন্যেই সে ফাঁক পেলেই বলে, এই হচ্ছে হাঙরের কানুন।
হ্যাঁ, যে-কোনও সময় কোনও আবেগবান, ভাবপ্রবণ কিংবা খামখেয়ালী খদ্দের এসে হানা দিতে পারে। দেয়ও। রাত বারোটা অব্দি তাই খুলে রাখার নিয়ম আছে দ্য শার্কের দরজা। অনেক সময় এসে পড়তে পারেন পুলিশ অফিসারদেরও কেউ। বঙ্গোপসাগরের উত্তর পশ্চিম তীরবর্তী এই উপনগরীটিতে প্রচুর রহস্যময় ঘটনা ঘটে থাকে। অনেকে জানে, নব পুলিশের একজন টাউট। এবং পুলিশ সচরাচর গভীর রাতেই আসে এখানে।
রাত নটা বাজলে এতক্ষণে মেয়ে দুটি আরও দুট হাফ-জিনের অর্ডার দিল। নব অর্ডার সার্ভ করে ফের কাউন্টারে মাছের চোখ নিয়ে বসল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ তখনও শোনা যাচ্ছে। সমুদ্রের গর্জন কাঁপয়ে দিচ্ছে মানুষের সচেতন ইন্দ্রিয়গুলোকে। এই উপকুলে এমনিতেই সমুদ্র খুব রাফ যাকে বলে–তাতে এই দুর্যোগে তার ভয়ঙ্কর আওয়াজ অনভিজ্ঞদের অস্বস্তিতে অস্থির করে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, ঠিক দরজার সামনে ঢেউ এসে ভেঙে গেল। তিনজনের কেউ তাকিয়ে দেখে না।…
