কিংবা বলি, ম্যাজিক কার্পেটের সন্ধানে অতদূরে যাই কেন? এই কাছেই তো বাঙলা দেশ, নিত্য নিত্য যার ক্রন্দনধ্বনি আমাদের কানে আসছে, কিন্তু সে কথা থাক। সেই বাঙলা দেশের ঢাকার এক কুট্টি ফেরিওলা আম বেচতে এসে বাড়ির সামনে লন-এর উপর ঝুড়িটা রেখেছে। বাবু উপরের বারান্দা থেকে আমগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে ঈষৎ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, কী আম আনছে, মিয়া, বড় যে ছোড় হোড় (ছোট ছোট)। কুট্টি একগাল হেসে উপরভাগে তাকিয়ে বললে, ছোড তো লাগবই, কর্তা–উচা থনে ছোড তো লাগবই। ল্যামা আহেন মহারাজ, তখন দেখবাইন অনে, বরো বরো।
কিন্তু হায়, আমার পাঠক মহারাজা নেমে এলেন না। আমগুলোর সত্য রূপ তাঁরা নিকটে এসে দেখতে রাজি হলেন না। সেটা হয়ে যেত স্পেশালাইজড নলেজ। তখন তারা চাইতেন কমন নলেজ। এখন তারা চান স্পেশালাইজড নলেজ। কিন্তু অধম এ-খাট, ইন্দ্রলুপ্তজন আর দ্বিতীয়বার বিল্ববৃক্ষ নিয়ে গমনাগমন করিবেক না।
এখন থেকে আমি সুদুমাত্র অতিশয় সাদামাটা, সাতিশয় নির্জন কমন নলেজ পরিবেশন করব।
কিন্তু না, পুনরপি না। যদ্যপি উন্নাসিক সম্প্রদায় উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে বারবার বলছেন সে কমন নলেজ হয়ে গিয়েছে, এবং আমিও এইমাত্র যে প্রতিজ্ঞাপাঠ লিপিবদ্ধ করলুম তার কালি এখনও শুকোয়নি, এবং যার অর্থ, আমি এখন থেকে শুধু কমন নলেজ নিয়ে লিখব তার অর্থ এই নয় যে আমি ইহসংসারের তাবৎ কমন নলেজ-এর বিশ্বকোষ রচনা করতে বসে যাব। সংসারের বিস্তর পোড় খাওয়া এক ধনী বাপ মৃত্যুকালে অন্যান্য উপদেশ দিতে দিতে বলেছিল, আর হ্যাঁ, প্রতি গ্রাসে পাঁচটা করে মাছের মুড়ো খাবি। পয়সাওলা সে বাড়িতে পাকা রুই বাঘা কাৎলা গোত্রের বড় মাছের মুড়ো ভিন্ন অন্য কোনও মাছের মুড়ো কস্মিন্ কালেই প্রবেশ লাভ করেনি। ছেলে বেচারী একই গ্রাসে পাঁচটা রুই মাছের মুড়ো খেতে গিয়ে দমবন্ধ হয়ে মৃত পিতার অনুজ হওয়ার উপক্রম। বাবা বলতে চেয়েছিল চুনোর্পটি কেঁচকি পোনার মুণ্ডু খেয়ে সস্তায় আহারাদি সমাপন করো। আমি কমন নলেজের চুনোপুঁটির মুণ্ডু গিলতে রাজি আছি কিন্তু রাঘব বোয়ালের বাঘা মুণ্ডু এক গরাসে গেলবার চেষ্টা করতে রাজি নই, যদিও মুণ্ড তো দুটোই। সে কমন নলেজ আবার পুরাতন ভৃত্যও কমন নলেজ।
দ্বিতীয়ত, এ যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবে কেরে? হরে মুরারে হরে মুরারে আর্তনাদ করেছিলেন কবি আকুল কঠে। এখন এ যৌন বটতলা প্লাবন রুধিবে কে রে? আই জি রে, পি সি রে? আমি বাস করি একতলায়। খুব বেশি দিনের কথা নয়, তেড়ে নেমেছে কলকাতার বর্ষা। গৃহিণী দুরুদুরু বুকে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে দেখছেন রাস্তা থেকে পেভমেন্টে জল। উঠেছে। এইবারে পেভমেন্ট ছাড়িয়ে ঘরের ভিতরে জল ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার আবর্জনা ময়লাও অপর্যাপ্ত পরিমাণে। (পৌর পিতারা নিশ্চয়ই উদ্ধাহু হয়ে নৃত্য করেছিলেন এবং মার্কিন টুরিস্টদের দাওয়াত করেছিলেন দেখে যেতে, আমাদের কলকাতা কী সুন্দর, কী সাফ, কী সুৎরো) এবং তার পর কেলেঙ্কারি। ডাবু সি-তে জল ঢুকে, না জানি কোন বৈজ্ঞানিক কারণে উজান বইতে আরম্ভ করল কোথা থেকে নানাবিধ স্রোত, ভেসে আসতে লাগল নানাবিধ অবদান। বীভৎস রস এ স্থলেই সমাপ্ত হোক।
হুবহু একদম সে-ই প্রক্রিয়ারই পুনরাবৃত্তি হল যৌন-সাহিত্য মারফত। প্রথম ছেয়ে গেল পেভমেন্ট, তার পর হুড়হুড় করে ঢুকল ঘরের ভিতরে। কিন্তু সত্যিকারের রগড় তো শুরু হল তার পর। যৌনজীবনের যেসব আবর্জনা আমরা ডাবু সি দিয়ে, স্যুয়ারেজ দিয়ে বাড়ি থেকে নগর থেকে বের করে দিয়েছি সেগুলোকে কোন এক পিচেশ মার্কা উচাটন মন্ত্রে আবাহন জানাল বাইরের সেই আবর্জনা, সেই বিদেশ থেকে আমদানি যৌন-বটতলীয় মাল যা ধীরে ধীরে ছেয়ে ফেলেছিল কুল্লে পেভমেন্ট, তাবৎ ফুটপাথ পুলিশের নাকের ডগায় সুড়সুড়ি দিতে দিতে (আমি পুলিশের ঘাড়ে কুল্লে বেলেল্লাপনার বালাই চাপাতে চাইনে; দেশের লোক যদি এ মাল চায় তবে পুলিশ আর কতখানি ঠেকাবে?) দেশ-বিদেশের একাধিক ডাঙর ডাঙর কর্ণধার কখনও সোল্লাসে, কখনও-বা মুচকি হেসে, কখনও-বা বক্রোক্তি করে আপ্তবাক্য ঝেড়েছেন, এ নেশন (কানট) বি রং।
এই হৈ-হুল্লোড়, জগঝম্প বাদ্যির মধ্যিখানে কে কান দেবে, মশাই, আপনার গুনগুনানি প্যানপ্যানিতে। আপনার বক্তব্য, যত অসুস্থই হোক না কেন, তাকে দেখতে হবে। কিন্তু সুস্থ মাথায়, অধ্যয়ন করতে হবে শান্তচিত্তে, অযথা উত্তেজিত না হয়ে। কিন্তু তাতে কোনও ফায়দা হবে না, এখন থেকেই বলে দিচ্ছি। এই যে সেদিন শ্যামাপুজোর সাঁঝ থেকে ভোর অবধি বেধড়ক, আচমকা, নানাবিধ কর্ণপটহ বিদারক বাজি ফাটালে কলকাত্তাইরা, সে অক্তে আপনি পাকা সুরেলা হাতে বীণাযন্ত্রে দরবারি কানাড়া বাজালে কান দিত না যেদো-মেধো কেউই। তাই কবি শাবাশ শাবাশ রব ছেড়ে বলেছেন :
ভদ্রং কৃতং কৃতং মৌনং কোকিল জলদাগমে
বর্ষাকাল এসেছে। এখন মত্ত দাদুরী পাগলা কোলাব্যাঙের পালা। কোকিল যে মৌনতা অবলম্বন করল সেটা অতিশয় ভদ্র কর্ম (বিচক্ষণেরও বটে)। জন্ম-অভিজাত জাতদ্রই এ আচরণ ভিন্ন অন্য আচরণ কল্পনা করতে পারে না।
.
তা আমি যতই কমন নলেজ নিয়ে পড়ে থাকতে চাইনে কেন, আমরা একদল হাফউন্নাসিক (হাফ-গেরস্ত তুলনীয় নয়, থুড়ি, থুড়ি, এই দেখুন, ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যতই সন্তর্পণে আপনি যৌনের প্রতি সামান্যতম ইঙ্গিত দিয়েছেন কি না, অমনি দ্যাখ-তো-না-দ্যাখ ওই খাটালের বোঁটকা গন্ধের অর্ধান্যায্য বখরাটি আপনি পেয়ে যাবেনই যাবেন)– হ্যাঁ, কী বলছিলুম, এক দল অর্ধ-উন্নাসিক পাঠক আমাকে সঙ্গ দিয়েছেন বহু বৎসর ধরে। কেন, বলতে পারব না। কখনও ভেবেছি, অনুকম্পাবশত লক্ষ করেননি এই তত্ত্বটি, পথে যেতে যেতে দেখলেন দুই অজানা টিমে ফুটবল খেলা হচ্ছে, তার একটি স্পষ্টত দুর্বল; আপন অজানতে দেখবেন, আপনার দরদখানি আস্তে আস্তে ওই দুলা টিমের পাল্লার ওপর ভর দিচ্ছে। কখনও ভেবেছি, হয়তো আমার মুসলমানি চিন্তাধারা, ভাষার যাবনিক কায়দা কেতা তার নতুন তত্ত্বের জন্যে কোনও কোনও একঘেয়েমি-ক্লান্ত পাঠককে আকৃষ্ট করেছে। আমি অবশ্য সে সম্বন্ধে অল্পই সচেতন ছিলুম; আমি জানত এমন কোনও বিষয়, এমন কোনও ভাষা ব্যবহার করিনি যা সুদ্ধমাত্র যাবনিকতা দ্বারা নিত্যনবীনের সন্ধানী জনের পাজরে কাতুকুতু দিয়েছে, জড় রসনায় চুলবুল জাগাবার চেষ্টা করেছে। যাবনিক জিনিস আমি আলিঙ্গন করেছি, পাঠকের সম্মুখে পেশ করেছি তখনই, যখন অনুভব করেছি সে যাবনিকতার মধ্যে বিশ্বজনীন ভাব সঞ্চারিত আছে, যে যাবনিকতা দেশ-কালপাত্র উত্তীর্ণ হয়ে শাশ্বত হবার অধিকার লাভ করেছে। কোণের প্রদীপ মিলায় যথা জ্যোতিঃ সমুদ্রেই। বলা বাহুল্য খ্রিস্টীয়, অখ্রিস্টীয়, জনপদসুলভ ভাবধারা, আমার আবাল্য পরিচয়ে খাসিয়া-সাঁওতাল সভ্যতার প্যাটার্ন আমি ঠিক সেইভাবেই গ্রহণ করেছি যেভাবে আমি যাবনিক চিন্তামণিকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছি।.. এই পতন অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থা অতিক্রম করার সময় কিছু পাঠক সর্বদাই আমাকে সঙ্গ দিয়েছেন, বিশেষ করে দুর্দিনে;
