দুর্দিনে বলো, কোথা সে সুজন যে তোমার সাথী হয়?
আঁধার ঘনালে আপন ছায়াটি সেও, হায়, হয় লয় ॥
তদস্তিমে কৌন কিসকা সাথ দেতা হৈ?
কি ছায়া ভি জুদা হোতা হৈ ইনসাসে তারিকিমে ॥
এঁদের বয়স হয়েছে। এদের অনেকেই এখন গভীরে প্রবেশ করতে চান।
আমি তাই একটা মধ্যপন্থা অবলম্বন করব। দয়া করে আমার সহৃদয় পাঠকসমুদায় তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ এই অধম লেখককে তার মধ্যপন্থা অবলম্বনের প্রদোষে, তার ধূসর জীবনের গোধূলিতে তাকে আশীর্বাদ করবেন।
আমার অনুরোধ, আমার মূল লেখাটি পড়ার সময় যদি কৃপালু পাঠক অম্লাধিক নিরবচ্ছিন্ন আনন্দলহরীতে দোলা খেতে খেতে এগিয়ে যান, সে-রসস্রোতে (যদি আদৌ রসসৃষ্টিতে আমি কথঞ্চিৎ সক্ষম হই) ভেসে ভেসে সমুখ পানে চলতে থাকেন তবে হঠাৎ সে স্রোত থেকে সরে গিয়ে ফুটনোটের গভীরে ডুব দেবেন না।
আর যারা ফুটনোটের গভীরে গিয়ে কিছুক্ষণ সে গভীরে অবগাহন করার পর সাঁতার দিয়ে পুনরায় ভেসে উঠে স্রোতোপরি অন্যান্য পাঠকদের সঙ্গে সম্মিলিত হন তারা তখন নিশ্চয়ই আমাকে সস্নেহ আশীর্বাদ জানাবেন।
দ্বাপর
০১.
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে রাতদুপুরে হোক আর দিনদুপুরেই হোক চট করে বলতে পারবেন না, আপনি যে হোটেলে শুয়ে আছেন সেটা কোন শহরে। টোকিও, ব্যাংকক, কলকাতা, কাবুল, রোম, কোপেনহাগেন যে কোনও শহর হতে পারে। আসবাবপত্র, জানালার পর্দা, টেবিলল্যাম্প যাবতীয় বস্তু এমনই এক ছাঁচে ঢালা যে স্বয়ং শার্লক হোমসকে পর্যন্ত তারা সবকটা পুরু পুরু আতসি কাঁচ মায় তার জোরদার মাইক্রোস্কোপটি বের করে ওয়াটসনকে কার্পেটের উপর ঘোড়া বানিয়ে, নিজে তার পিঠে দাঁড়িয়ে, ছাতের উপর তার স্বহস্তে নির্মিত আ লা হোমস স্প্রে ছড়িয়ে বাকিটা থাক্, ব্যোমকেশ ফেলুদার কল্যাণে আজ ইস্কুল বায় ও সেগুলো জানে– তবে বলবেন, হয় মন্তে কালোর রেজিনা হোটেল নয় মোহোনেসবের্গের অল হোয়াইট হোটেল। দূরপাল্লার অ্যারোপ্লেনের বেলাও আজকের দিনে তাই। একবার তার গর্ভে ঢুকলে ঠাহর করতে পারবেন না, এটা সুইস এ্যার, লু হানজা, অ্যার ইন্ডিয়া না কেএলএম। তিমির পেটে ঢুকে নোয়া কি আর আমেজ-আন্দেশা করতে পেরেছিলেন এটা কোন জাতের কোন মুল্লুকের তিমি?
ইন্ডিয়ান মানেই নেটিভ, আস্তে আস্তে এ ধারণা কমছে। নইলে জর্মনি এ দেশের সেলাইয়ের কল, রুশ কলকাতার জুতো কিনবে কেন?
অতএব অ্যার ইন্ডিয়া কোম্পানির অ্যারোপ্লেনকে একটা চান দিতেই বা আপত্তিটা কী? অন্য কোম্পানিগুলো তো প্রায় সব চেনা হয়ে গিয়েছে। অবশ্য আরেকটা কথা আছে। ওই কোম্পানির এক ভদ্রলোক বুদ্ধি খাঁটিয়ে তদ্বির-তদারক করে আমার সুখ সুবিধার যাবতীয় ব্যবস্থা না করে দিলে হয়তো আমার যাওয়াই হত না। তার নাম বলব না। উপরওলা খবর পেলে হয়তো কৈফিয়ৎ তলব করে বসবেন, কোনও একজন ভিআইপিকে সাহায্য না করে একটা থাচ্ছো কেলাস নেটিভ রাইটারের পিছনে তিনি আপিসের মহামূল্যবান সময় নষ্ট করলেন কেন? তবে কি না তাঁর এক ভিআইপি মিত্রও আমাকে প্রচুরতম সাহায্য করেছিলেন। তাকে না হয় শিখণ্ডিরূপে খাড়া করবেন।
ভাবছিলুম চুঙ্গী (কাসটম্সের) উৎপাত থেকে এই দুই দোস্তো কতখানি বাঁচাতে পারবেন। ইতোমধ্যে এক কাস্টমিয়া আমার কাগজপত্র পড়ে আমার দিকে মিটমিটিয়ে তাকিয়ে শুধোলে, আপনিই তো আপনার বইয়ে চুঙ্গীঘরের কর্মচারীদের এক হাত নিয়েছেন, না?
খাইছে। এ যাত্রায় আমি হাজতবাস না করে মানে মানে কলকাতা ফিরতে পারলেই নিতান্তই পঞ্চপিতার আশীর্বাদেই সম্ভবে। কে জানে, এই কাস্টমিয়াই হয়তো হালে কয়েকজন ডাঙর ভিআইপি কাম সরকারি কর্মচারীকে বেআইনিতে মাল আনার জন্য নাজেহাল করেছিলেন।… এত দিন কলকাতা করপরশনের অত্যুৎসাহ ও মাত্রাধিক কর্মতৎপরতাবশত জলের কল খুললে যে রকম জল না বেরিয়ে শব্দ বেরুত সেই রকম আমার ব্লটিং পেপারের লাইনিংওলা গলা দিয়ে কথা না বেরিয়ে বেরোল ঘসঘস খসখস চো-ও-ও-ও ধরনের কী যেন বদখৎ আওয়াজ।
নাহ্। এ লোকটির রসবোধ আছে কিংবা এঁর বাড়িতে মাসে একদিন করপরশনের কলের জল আসে। ওই ভাষা বাবদে তিনি সুনীতি চাটুয্যে মশাইকে তাক লাগিয়ে উত্তম ধ্বনিতত্ত্ববাদের কেতাব লিখতে পারবেন। বললেন, নিশ্চিন্তমনে ওই আরাম চেয়ারটায় বসুন। আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি। তার পর ডাইনে-বাঁয়ে তাকিয়ে এক অশ্রুত টরে-টক্কার সঙ্কেত করলেন আর সঙ্গে সঙ্গে জনাচারেক বাঙালি কাস্টমিয়া আমাকে ঘিরে যা আদর-আপ্যায়ন আরম্ভ করলেন যে হৃদয়ঙ্গম করলুম, দেবীর প্রসাদে মূক যে রকম বাঁচাল হয়, আমি কেন, হরবোলাও মূক হতে পারে।
প্রতিজ্ঞা করলুম, চুঙ্গীঘর লেখাটি আমি ব্যান করে দেব। কার যেন দুশো টাকা ফাইন হয়েছে। অবশ্য অন্য অকারণে, কিন্তু জরিমানা ইজ জরিমানা! আপনার কারণ ভিন্ন বলে আপনি তো আর মেকি টাকা দিয়ে শোধবোধ করতে পারবেন না।
কিন্তু এত সব বাখানিয়া বলছি কেন?
শুনুন। জীবনে ওই একদিন উপলব্ধি করলুম, সাহিত্যিক- তা সে আমার মতো আটপৌরে সাহিত্যিক হওয়ার মধ্যেও একটা মর্যাদা আছে।
***
এসব যে বাখানিয়া বলছি তার আরও একটা কারণ আছে।
আমার নিজের বিশ্বাস, প্লেনের পেটের ভিতরকার তুলনায় অ্যারপোর্টে আজব আজব তাজ্জব চিড়িয়া দেখতে পাওয়া যায় ঢের বেশি। পাসপোর্ট, কাস্টমস, হেলথ অফিসে, রেস্তোরাঁয় তাদের আচরণে কেউ-বা সঙ্কোচের বিহ্বলতায় অতীব মিয়মাণ, কারও-বা গড় ড্যাম ডোন্টো কেয়ার ভাব– ওদিকে একটি বিগতযৌবনা মার্কিন মহিলা অ্যারোপ্লেনে অর্ধন্দ্রি যামিনী কাটিয়ে আলুথালু-কেশ, হৃতপাউডাররুজ, এঞ্জিনের পিস্টন বেগে পলস্তরা পলস্তরা ক্রিম-পাউডার-রুজ মাখছেন, এদিকে তার কর্তা প্লেনে সস্তায় কেনা স্কচ স্যাট স্যাট করছেন; আর ওই সুদূরতম প্রান্তে দেখুন, দেখুন বললুম বটে, কিন্তু দেখার উপায় নেই- কালো বোরকাপরা জড়োসড়ো গণ্ডা দুই মক্কাতীর্থে হজযাত্রিনীর গোঠ। এরা নিশ্চয়ই চলতি ফ্যাশানের ধার ধারেন না। বেশিরভাগ আঁকড়ে ধরে আছেন পুঁটুলি- হ্যাঁ, বেনের পুঁটুলি। গরুর গাড়িতে, গয়নার নৌকোয় ওঠার সময় যে পটুলি নেন। ওঁরা ভাড়া বাবদ কয়েক হাজার টাকা দিয়েছেন নিশ্চয়ই। অনায়াসে হাল্কা স্যুটকেস কিনতে পারতেন। দু-একজনের ছিলও বটে। কিন্তু ওদের কাছে গরুর গাড়ি যা, হাওয়াই জাহাজও তা– এদের মক্কা পৌঁছলেই হল। হায়, এঁরা জানেন না প্লেনে ভ্রমণ– তা সে যে কোনও কোম্পানিই হোক না কেন– গরুর গাড়িতে মুসাফিরি করার তুলনায় ঢের বেশি তকলিফদায়ক। এমনকি প্লেনে এঁদের পক্ষে হায়া-শরম বাঁচিয়ে চলাও কঠিন। কলকাতার বস্তিতে কী হয় জানিনে, কিন্তু এদের গ্রামাঞ্চলে কেউ কখনও প্রাতঃকৃত্যের জন্য কিউ দেয় না। অথচ প্লেনে প্রাতঃকৃত্যের জন্য এদের কিউয়ে দাঁড়াতে হবে– মেয়েমদ্দে লাইন বেঁধে। সে কথা পরে হবে। তবে হজযাত্রীদের জন্য স্পেশাল প্লেনে যদি স্পেশাল ব্যবস্থা থাকে তার তথ্য জানিনে। কোনও কোম্পানি অপরাধ নেবেন না।
