কী মহান আপ্তবাক্য! মরিস, তুমি যদি চাও যে তোমার রচনা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লোকে পড়ক তবে সে রচনার ঘাড়ে বিস্তরে বিস্তর ভারী মাল চাপিয়ো না। অর্থাৎ যে মাল কনসানট্রেশন চায়, ডিভোশন চায়।
ব্যাসদেব এ তত্ত্বটির প্রথম আবিষ্কারক। গণপতিকে যখন তিনি মহাভারতের ডিকটেশন নেবার জন্য মনোনীত করেন তখন তার মাত্র একটি শর্ত ছিল, তুমি নিজে না বুঝে কোনও বাক্য লিখতে পারবে না। গণপতি গণের অর্থাৎ সাধারণজনের, mass-এর প্রতি। অতএব তিনি লিখবেন সবকিছু নিজে প্রথমটায় বুঝে নিয়ে যাতে করে জন গণও সবকিছু বুঝতে পারে। তাই বোধহয় কাব্যতত্ত্ববিশারদ তলস্তয় মন্তব্য করেছিলেন, মহাভাররে মতো কাব্য ইহসংসারে আর নেই।
আনাতোল ফ্রাঁস হুবহু এই আদর্শটিই শ্রীমান মরিসের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।
অবনত মস্তকে, করজোড়ে, দাঁতে দাঁতে কুটো কেটে স্বীকার করছি, প্রাগুক্ত তত্ত্বটি আবিষ্কার করতে এবং সেটা হৃদয়ঙ্গম করতে আমার অনেকখানি সময় লেগেছিল। অবশ্য মসিয়ো মরিসের মতো সশ্রদ্ধ একাগ্রতার প্রত্যাশা করার মতো হিমালয় বিনিন্দিত উত্তুঙ্গ দম্ভ আমার কস্মিন কালেও ছিল না। আমি ভুল করেছিলুম অন্য ক্ষেত্রে। আমি মনে করেছিলুম দেশবিদেশ ঘুরে আমি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি, একাধিক ভিন দেশে বাধ্য হয়ে যে দু একটি ভাষা নিয়ে নাড়াচাড়া করেছি, বহুবিধ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিরীক্ষণ এবং তার নির্যাস গলাধঃকরণ করেছি, নানান ধরনের নানান চিড়িয়ার সঙ্গে মোলাখাৎ-সহবাসের ফলে যে আদর-অনাদর, দাগা-মহব্বত পেয়েছি, প্রবাসের নিরানন্দ দিনে, নির্জন ত্রিযামা শর্বরীতে আকাশকুসুম চয়ন করেছি, দীর্ঘ, দীর্ঘকাল ধরে মাতৃবিরহের অসহ কাতরতা এবং তার চেয়েও নিষ্ঠুর উপলব্ধি যে পুত্রবিরহিণী আমার মা-জননী আমার চেয়েও কত লক্ষ গুণে কাতর নিরানন্দ নিরালোক দিনযামিনী যাপন করছেন আমার প্রত্যাগমন প্রত্যাশা করে এর মধ্যে অসাধারণ অলৌকিক এমন কোনও সৃষ্টিছাড়া উপাদান-উপকরণ নেই যেটা আমার মতো নিতান্ত সাধারণজনসুলভ সাধারণ ভাষায় প্রকাশ করলে গৌড়ীয় পাঠকের বোধগম্য হবে না, তার দিকচক্রবাল অতিক্রম করে মহাশূন্যে বিলীন হবে না।
আমি জানতুম, এবং এখনও দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করি যে হাড় আলসে, রকবাজিতে দিগ্বিজয়ী ফোকটে টু পাইস কামাবার তরে বাপের কামানো ফোর পাইস ঝটসে ঝেড়ে দিতে প্রস্তুত, এবং পাড়ায় একটি সর্বজনসেবী পাঠাগার নির্মাণের জন্য হোক কিংবা নির্মাণান্তে দলাদলিবশত সেটিকে বীরদর্পে ভস্মীভূত করাই হোক, উভয় মহৎ কর্মের জন্য, তদাভাবে সর্বকর্মের জন্য, তদাভাবে কর্মহীন কর্মের জন্যই হোক, চাঁদা তোলাতে যে বাঙালি অদ্বিতীয়, অপরাজেয়, যে বাঙালি গত বিশ্বযুদ্ধের সময় ওই মহৎ ব্রত উদযাপনের জন্য হিটলার-স্তালিনের চাঁদা তোলার প্রয়াস-পদ্ধতির বর্ণনা শুনে শিশু! শিশু!! বলে অট্টহাস্য দ্বারা গোরশয্যাশায়ী ওই দুই মহাপ্রভুকে লজ্জা, আত্মগুলায় ঘন ঘন ঘূর্ণায়মান করতে ভানুমতী বিশারদ, সেই বাঙালি, আবার বলছি, সেই বাঙালি– অন্য জাত যারা ভ্রমণ ব্যপদেশে কলকাতাতে এসে সভয়ে, আমাদের রঙ্গভূমি থেকে সম্মানিত ব্যবধান রক্ষা করে, আমাদের কীর্তিকলাপের খুশবাইটুকু মাত্র পেয়েছে তারা কিছুতেই প্রত্যয় যাবে না যে বাঙালি বই পড়ে।
হ্যাঁ, বই পড়ে। অধিকাংশ স্থলেই অবৈধ কিন্তু মার্জনীয় পদ্ধতিতে। কিন্তু পড়ে।
তাই আমি হরেদরে ধরে নিয়েছিলুম, আমার বক্তব্যবস্তু যতই হ য ব র ল মার্কা হোক না কেন, সেটা তার কাছে কিছুতেই সম্পূর্ণ অপরিচিত হতে পারে না– নিতান্ত দু-একটি উৎকট ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ছাড়া। কারণ প্রকৃত পাঠকের কাছে কোনও বিষয়ই সম্পূর্ণ অজানা নয়, আবার কোনও বিষয়ই সম্পূর্ণ জানা নয়। তাই এক আরব গুণী বলেছেন, পুস্তক, সে যেন একটি ছোট্ট বাগান যেটি তুমি অনায়াসে পকেটে পুরে সর্বত্র নিয়ে যেতে পার। যখন খুশি তাতে ডুব মেরে ভ্রমরগুঞ্জন, কোকিলের কণ্ঠ, বসরাই গোলাপের খুশবাই, সারা দিনমান ঝরনার গান সবকিছুই পেতে পার। তেমন বই যদি বেছে নাও তবে সে বাগিচায় মিশরের পিরামিড, হিমালয়ের গিরিশ্রণি, পাভলোভা পাভলোভাই বা কেন উর্বশী-মেনকার নৃত্যও দেখতে পাবে। এমনকি এমন বই অর্থাৎ এমন বাগিচাতেও তুমি প্রবেশ করতে পার যে বাগিচা তোমাকে আরও লক্ষ লক্ষ বাগিচার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে। যেমন ধরো, প্যারিসের জাতীয় গ্রন্থাগার সম্বন্ধে একখানি প্রামাণিক পুস্তক। কত লক্ষ বাগবাগিচার সঙ্গে সে যে তোমার পরিচয় করিয়ে দেবে সেটা নির্ভর করে শুধু তোমার কৌতূহলের ওপর।
আরেক জ্ঞানী বলেছেন, একখানা পুস্তক যেন একখানা ম্যাজিক কার্পেট; তারই উপর আরামসে তাকিয়া হেলান দিয়ে বসে তুমি যত্রতত্র যেতে পার, যা ইচ্ছা তাই এমনকি তোমার সে রকম রুচি হলে যাচ্ছেতাই দেখতে পারো।
তবে হ্যাঁ, আমার মনে ধারণা ছিল, ম্যাজিক কার্পেট রাজারাজড়ার মিনার, অধুনা মার্কিন মুলুকের চন্দ্ৰস্পৰ্শী প্রাসাদাদির থেকে গা বাঁচিয়ে বহু উধ্বলোক দিয়ে উড্ডীয়মান হয় বলে পাঠক সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পায় না। আমার রচনা হবে যুগ মানানসই হেলিকপ্টার, অনেক নিচু দিয়ে যায় বলে, অনেক মন্থরে চলে বলে পাঠক হয়তো অনেক আধ-চেনা জিনিসের চৌদ্দ আনা চিনে নেবে।
