কিন্তু আমি পোড়া গোরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরাই।
ইতোমধ্যে আবার অন্য দিক থেকে আরেক বিপরীত বায় বইতে আরম্ভ করেছে। জীবনসংগ্রাম কঠোরতর হয়েছে, পাপাচারের উত্তাল তরঙ্গ গিরিচূড়া লঙ্ন করে উধ্বমুখে উৎক্ষিপ্ত, দিনান্তে বলীবদের ন্যায় কর্মক্লান্ত জন স্বগৃহে পৌঁছবে না টিয়ার গ্যাসে অন্ধ হবে এবং/কিংবা গুলি খেয়ে পঞ্চভূতে লীন হবে সেই দুশ্চিন্তায় সে ম্রিয়মাণ মোহ্যমান।
ঠিক এই একই অবস্থাতে ফরাসি সাহিত্যের তদানীন্তন গ্রামেত্র (গ্রান্ড মাস্টার) কী উপদেশ দিয়েছিলেন সেটি অবহিত চিত্তে শ্রবণ করে কর্ণ সার্থক তথা পুণ্যার্জন করুন।
প্যারিসের এক অসহিষ্ণু গবি অর্থাৎ যিনি অবোধ্য মডার্নস্য মডার্ন গবিতা লেখেন আনাতোল ফ্রাসকে প্রায় শাসিয়ে হুঁশিয়ার করে তালিম দেন, কবিতা পড়াটা কিছু ছেলেখেলা নয়, যে ছ্যাবলামো এ্যাদ্দিন ধরে চলে আসছে। মডার্ন কবিতা আগাপাশতলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তু।৬
এ কবিতা-দেউলের প্রতি পাঠককে তীর্থযাত্রীর ন্যায় অবনত মস্তকে অগ্রসর হতে হয়। ভক্তিশ্রদ্ধা তথা (সূচ্যগ্রন সুতীক্ষেণ) একাগ্রতাসহ মডার্ন পোয়ট্রির দ্বারস্থ হতে হয়! (মডার্ন পোয়েট্রি শুড বি এপ্রোচ উইদ ডিভোশন অ্যান্ড কনসানট্রেশন)
এ উদ্ধৃতি দেওয়ার পর ফ্ৰাস যেন দিবাদ্বিপ্রহরে সাক্ষাৎ যমদূতের দর্শন পেয়ে সাতঙ্কে ভগবানকে স্মরণ করছেন যে স আযৌবন প্রকাশ্যে একাধিকবার তার নাস্তিকতা প্রচার করেছিলেন; এর থেকেই সর্ব আস্তিক সর্ব নাস্তিক অনায়াসে বুঝে যাবেন। সেই গবির আপ্তবাক্য শুনে তাঁর হৃদয়ে কী মারাত্মক গগনচুম্বী পাতালস্পর্শী ভীতির সৃষ্টি হয়েছিল। উচ্চকণ্ঠে সৃষ্টিকর্তাকে আহবান জানিয়ে প্রার্থনা করছেন :
হেভন ফরবিড! দেবভাষায় বলা হয় ঈশ্বর রক্ষতু, মুসলমান বলে লা হাওলা কুয়েতি ইল্লা বিল্লা। বাংলায় এ স্থলে ঠিক কী বলা হয় জানিনে। ভূত দেখলে লোকে রাম নাম স্মরণ করে অবশ্য। কিন্তু এ স্থলে প্রার্থনা রয়েছে, নাস্তিক ফ্ৰাস বলছেন, ঈশ্বরাদেশে এ হেন অপকর্মে যেন বিরত হয়।
এর পরই ফ্ৰাঁস বলছেন, আমি জানি বেচারী (সাধারণ) ফরাসিকে সমস্ত দিন সামান্য রুটি-মাখনের জন্য কী রকম মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়।
এ স্থলে এগোবার পূর্বে পাঠককে ফের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, ত্রেতা যুগটি আমি লিখছি (দ্বাপরের পরে। কেন, সেটা যারা তাপসী অহল্যার কাহিনী পড়েছেন তারাই জানেন) হাসপাতালে। (যদিও খানদানি ভাষায় এটি নার্সিং হোম বা মেডিকাল সেন্টার নামে সগৌরবে প্রচারিত, তথাপি আমার সামান্য অভিজ্ঞতা প্রতিবাদ জানিয়ে অজ্ঞজনকে হুঁশিয়ার করে বলে, এটা হোম তো নয়ই, এবং আচার-আচরণ, প্রাচীন যুগীয় সাজ-সরঞ্জাম দেখে মনে হয়, মেডিকাল সেন্টার-এর নাম পালটে এটাকে মেডিঙ্গভালো– মধ্যযুগীয় কান্তার নাম দিলেই এর প্রতি সত্য বিচার করা হয়, কিংবা মেডিঙ্গভালো হান্টারও বলতে পারেন, এবং এখানে কী শিকার হয় তার আলোচনা করে অসুস্থ শরীর নিয়ে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে চাইনে)। সবসুদ্ধ মিলিয়ে এখানকার কর্তৃপক্ষই স্মৃতিভ্রষ্ট হন, আমি যে আনাতোল ফ্রাসকে উদ্ধৃত করার সময় পর্বতপ্রমাণ ভুলভ্রান্তি করব সেটা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং কার্সিং (প্রুফরিডার মশাই, আমি কার্সিং অভিসম্পাত অভিশপ্ত-ই লিখেছি– সজ্ঞানে; নার্সিং লিখিনি) বম বাবদে যাদের সামান্যতম অভিজ্ঞতা আছে, অর্থাৎ এ পুরী থেকে সুস্থ অস্থি নিয়ে নিতান্তই ভগবদকৃপায় বেরুতে পেরেছেন তারা যে আমাকে ক্ষমাসুন্দর চক্ষে দেখবেন সেটা ততোধিক স্বাভাবিক।
ফ্ৰাঁস বলছেন, বেচারী ফরাসি যখন ক্লান্ত দেহে শ্লথ পদে বাড়ি পৌঁছে একখানা পুস্তক হাতে তুলে নেয় (অর্থাৎ, অত্যধিক মদ্যপান করে বউকে না ঠেঙিয়ে, কিংবা ঝটপট জুয়ো খেলাতে বসে বউ-বাচ্চার জন্য দু মুঠো অন্ন কেনার রেস্ত উড়িয়ে না দিয়ে– লেখক) তখন, ঈশ্বর রক্ষতু, আমি তার কাছ থেকে সশ্রদ্ধ একাগ্রতা (ডিভোশন অ্যান্ড কনসানট্রেশন) মোটেই কামনা করিনে– বলছেন ফ্রাঁস। তার পর তিনি যেন নিবেদন করছেন : আমি যা দিতে চাই, এবং সে-ই আমার উজাড় করে দেওয়া, (অল আই উয়োন্ট টু গিভ) তার যেন একটুখানি শ্রান্তি বিনোদন হয়, তার যেন একটুখানি ফুর্তি জাগে (রিলেকসেশন, এনটারটেনমেন্ট, এম্বুজমেন্ট হয়। এবং যেদিন ওই সবের ফাঁকে ফাঁকে ওই বেচারী ফরাসিকে কোনও প্রকারের কোনও ইনফরমেশন দিতে পারি, সেদিন আমার আর আনন্দের সীমা পরিসীমা থাকে না (মাই জএ নোজ নো বাউন্ডজ)।
দম্ভী মসিয়ো মরিসকে, আমার পাঠকদের মধ্যে দম্ভী কেউ নেই, কিন্তু যদিস্যাৎ কোনও উটকো দম্ভী মাল ছিটকে এসে গোলে হরিবোল দিয়ে থাকেন তবে তাকে বলছি, অবহিতচিত্তে প্রণিধান করো, যে ফ্রাসকে ফরাসিদের লোক ক্রাঁ মেৎর, গ্র্যান্ড মাস্টার, গুরুদেব বলে একবাক্যে স্বীকার করে সাহিত্যের ময়ূর সিংহাসনে বসিয়েছিল তিনি কতখানি বিনয় সহকারে বলছেন, তার নগণ্য অর্ঘ্য কী? এবং সেটা এমনি যৎসামান্য অকিঞ্চিত্বর যে তার জন্য কোনও পাঠকের কাছ থেকে কোনও প্রকারের ডিভোশন বা কনসানট্রেশন তিনি চান না।
এবং সর্বশেষে মসিয়ো মরিসকে একটুখানি ধূলি পরিমাণ উপদেশ দিচ্ছেন : তদুপরি সর্বোপরি, হে মসিয়ো মরিস, তুমি যদি শতাব্দীর পর শতাব্দী ভ্রমণ করতে করতে পেরিয়ে যেতে চাও তবে হাল্কা হয়ে ভ্রমণ করো। (ইফ ইউ উয়োন্ট টু ট্র্যাভেল গ্রু সেঞ্চুরিজ, ট্র্যাভেল লাইট!)
