ওঁরা বলতেন বা ভাবতেন, আমার বক্তব্য স্পেশালাইজড নলেজ; এসব এখন তকলিফ বরদাস্ত করে আমরা পড়বই-বা কেন, বুঝতে যাবই-বা কেন। আগে স্বরাজ আসুক তার পর অন্য কথা। আমি সবিনয় বলেছিলুম, রাধে মেয়ে কি চুল বাধে না?
মার খেয়ে অপমান সয়ে সয়ে আমরা এখন অনেক কিছু শিখে ফেলেছি- এই যেমন খানিকক্ষণ আগে পাসপোর্ট কী প্রকারে পেতে হয়, সেটা পাওয়ার পরও আপনার কপালে আর কোন কোন গর্দিশ আছে সে সম্বন্ধে অতিশয় যৎকিঞ্চিৎ সাতিশয় সংক্ষেপে নিবেদন করেছি।
তারই ফলে একদা যেসব তথ্য নিয়ে শুধু স্পেশ লশটরা আলোচনা করতেন, যেগুলো নিছক স্পেশালাইজড নলেজ ছিল এখন সেগুলো হয়ে গিয়েছে ডালভাত, কমন নলেজ। একদা যেমন বিশেষজ্ঞরাই শুধু মাথা ঘামাতেন, পৃথিবী ঘোরে না সূর্য ঘোরে, পরবর্তী যুগে সেই সমস্যার সমাধান কমন নলেজ হয়ে দাঁড়াল!
চল্লিশ-পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে বঙ্গসন্তান আমার য়ুরোপ ভ্রমণ, লন্ডনে বঙ্গ মহিলার ঘরকন্না, নরওয়েতে প্রথম বঙ্গরমণী উৎসাহ ও কঙ্গোতে কৌতূহল সহকারে পড়ত। এখন এতশত লোক নিত্য বঙ্গো ইন উইক এন্ড কাটাতে যায়, জবল অল অলবিয়াতে হানিমুনের প্রথমার্ধ চুষে আসে যে ফ্রান্স ভ্রমণ কিংবা মন্তে কার্লো দর্শন শিরোনামা এখন সে অবজ্ঞার চোখে দেখে, লেখক পরিচিতজন হলে গেরেমভারি মুরুব্বির মতো তাকে পেট্রোনাইজ করে পিঠ চাপড়ে বলে, লেগে থাকো ছোকরা; এখনও হাদ্ৰামুৎ অঞ্চলে অমুসলমানকে ঢুকতে দেয় না বটে কিন্তু তুমিই হয়তো একদিন সেখানকার সেই বিরাট প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ যেখানে একদা শেবার রানি বাস করতেন সেইটে সক্কলের পয়লা দেখে এসে তাবৎ গৌড়জনকে তাক লাগিয়ে দেবে।
একদা আমি দেশে-বিদেশে নাম দিয়ে কাবুল সম্বন্ধে একখানা পুস্তক রচনা করি। প্রকাশকালে বইখানা কিছু লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শুনেছি, এখনও নাকি কেউ কেউ বইখানা পড়ে। আমি জানি, কেন? তার একমাত্র কারণ যদিও কাবুল পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে অবস্থিত নয়, এবং উত্তর মেরুতে অভিযান করার মতো বিপজ্জনকও নয়, তবু একাধিক কারণে প্রধানতম কারণ অবশ্য এই যে আফগান সরকার চট করে সব্বাইকে ও দেশে যাবার অনুমতিলাঞ্ছন ভিসা পারমিট মঞ্জুর করে না, এবং এই একটি কারণই পূর্বে উদ্ধৃত তৃণাদপি শোলকের মতো কাবুলগামীর সম্মুখে অলঙ্ প্রতিবন্ধন; কাবুলি প্রবাদও বলে সিংহের এক বাচ্চাই ব্যস (যথেষ্ট)। বইখানি তাই এখনও লিকলিক করে টিকে আছে।
.
গৌড়জনের কমন নলেজ এ-কালে এতই সুদূরবিস্তৃত– ভয়ে ভয়ে বলি, কুলোকে বলে শুধু বিস্তারই আছে– গভীরতা আদৌ নেই এবং সে বিস্তারও নাকি বড় পল্লগ্রাহী যে তাদের মন পাওয়া প্রতিদিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শুনতে পাই, বিকৃত যৌনজীবন, এবনরমাল সেকস, সমকাম, সাদিজম, মাসোখিজম, পিকচার পোস্টকার্ড, ব্লু ফিলম ইত্যাদি ইত্যাদি নানাবিধ বিষয়বস্তু বেহদ্দ রগরগে ভাষায়, সর্ববিধ অসম্ভব ফোটোগ্রাফসহ পরিবেশন করলেও তারা যে শুধু নাসিকা কুঞ্চিত করেন তাই নয়, বা দিকে ঘাড় বেঁকিয়ে ডান রু ইঞ্চিটাক উত্তোলন করে বলেন, ছোঃ! চাঃ!! পুঃ!!! এগুলো আবার কী? ক-অ-অ-বে কোন আদ্যিকালে এ-সব তো কমন নলেজেরও নিচের স্তরে নেমে গিয়েছে। পুলিশের নাকের সামনে পেভমেন্টে বিক্রি হয়, জলের দরে। শোনননি বুঝি থাকো কোন ভবে কোন দুনিয়ায়?- যবে থেকে ডেনমার্কে এসব মালের ওপর থেকে ব্যান তুলে দেওয়া হয়েছে সঙ্গে সঙ্গে তার বিক্রি দশ আনা পরিমাণ কমে গিয়েছে। তাবৎ বস্তু, সাকুল্যে বিষয় ব্যান তুলে দেওয়ার ফলে যখন তিন দিনের ভিতর কমন নলেজ হয়ে গেল, তখন আর ওসব মাল কানা কড়ি দিয়েও কিনবে কে? শুনছে, এখন নাকি দিনেমার প্রকাশক ওসব মাল তালাক দিয়ে ধর্মগ্রন্থ ছাপবে। সেটা যখন স্পিরিচুয়াল লেভেলে উঠে গিয়েছে তখন স্পিরিচুয়াল বই অর্থাৎ গ্রন্থ ছাপানোই প্রশস্ততর।
হ্যাঁ, তদুপরি আরেকটি খবর আমি কাগজে পড়েছি। তত্ত্বটি আমি বাল্যকালেই শুনেছিলুম। পরিপূর্ণ স্বাদ পেতে হলে চুম্বনটি চুরি করে নিতে হয়। এ কিস টু বি দি সুইটেসট হ্যাঁজ টু বি স্টোলেন। সম্মানিত মার্কিন কাগজে পড়লুম, নাম ছিল লেডি চ্যাটারলিজ লয়ারজ। লাভারজ নয়–অর্থাৎ কি না মার্কিন মুলুকে যখন লেডি চ্যাটারলি কেতাবখানা অশ্লীল কিংবা কাব্যরসের অত্যুকৃষ্ট উদাহরণ কি না ওই নিয়ে মোকদ্দমা উঠল তখন এক বাঘা উকিল বিচারগৃহ প্রকম্পিত করে ওজস্বিনী ভাষায় তাঁর সুদীর্ঘ বক্তৃতা শেষ করে আবেগোল কণ্ঠে বললেন, ধর্মাবতার তথা সম্মানিত জুরি মহোদয়গণ! লেডি চ্যাটারলি পুস্তকে গ্রন্থকার যে অপূর্ব কলানৈপুণ্য ও সত্য শাশ্বত সাহিত্যরস সৃষ্টি করেছেন তাই নয়, যৌনজীবনকে তিনি স্পিরিচুয়াল লেভেলে (আধ্যাত্মিক স্তরে) তুলে নিয়েছেন, তুলে ধরেছেন।
এই শেষ অভিমতটি শুনে এক পরিপক্কা সমাজে সম্মানিতা ফরাসি নাগরী মৃদু, দুই মেয়ের স্মিত হাস্য হেসে বললেন, সর্বনাশ। আমি তো এ্যাদ্দিন জানতুম যৌনসম্পর্কটা নিষিদ্ধ পাপাচার। এখন থেকে ওই আনন্দের অর্ধেকটাই মাঠে মারা গেল।
.
নিষিদ্ধ হোক, কিংবা পুলিশসিদ্ধ তথা শাস্ত্রসম্মত হোক আর নাই হোক বিদগ্ধ গৌড়ীয় পাঠক এখন চান কড়া পাকের মাল, তত্ত্ব ও তথ্য সম্বলিত– একদা যে রকম নৃত্যসম্বলিত গ্রামোফোন রেকর্ড সাদামাটা রেকর্ডের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল। অর্থাৎ পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর আগে আমি যে সওগাত পরিবেশন করছিলুম তারা অধুনা সেই বস্তু চান।
