কিন্তু আপনি পাসপোর্ট পেয়ে যাবেন। যদিস্যাৎ না পান তবে জানবেন অন্য কোনও ব্যাপারে আপনার জীবন নিষ্কলঙ্ক নয়। পুলিশ আপনার সম্বন্ধে অনুসন্ধান করে, কিংবা আপন ফাইল (দসিয়ে) থেকে আবিষ্কার করেছে, আপনি ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে রুশ লেখক গর্কির মাদার পড়েছিলেন, কিংবা ওয়েল নেভার মাইন্ড—কিছু একটা আছে।
এমন সময় আপনার এক উকিল বন্ধু আপনাকে বললে, সংবিধানে প্রত্যেক ভারতীয়কে জন্মগত অধিকার দিয়েছে, যত্রতত্র গমনাগমনের স্বাধীনতা। ঠোকো মোকদ্দমা। পেত্যয় যাবেন না, আপনার চেয়েও শতগুণে তালেবর এক খলিফে ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়ে বিদেশ যাবার পাসপোর্ট পেয়েছিলেন। তিনি বগল বাজিয়ে প্লেনের টিকিট কাটতে ধাওয়া করেছিলেন কি না জানিনে, আমরা হুঁশিয়ার করছি,
ঘুঘু দেখেই নাচতে শুরু
ফাঁদ তো বাবা দেখোনি।
কিংবা’ না আঁচিয়ে’ ভরসা কই! কিংবা সুকুমার রায়ী ভাষায়
কেই বা শোনে কাহার কথা
কই যে দফে দফে।
গাছের পরে কাঁঠাল দেখে
তেল দিয়ো না গোঁফে ॥
পাসপোর্ট পাওয়ার পর একটি
বৈষ্ণব হইতে মনে গেল বড় সাধ।
তৃণাদপি শোলোকেতে ঘটালো পরমাদ।
সে তৃণটি এস্থলে পি ফরম। বিদেশের হোটেলে তো আপনাকে মুফতে থাকতে দেবে না, রেস্তোরাঁতে মাগনা খেতে দেবে না। অতএব আপনার বিদেশি মুদ্রার প্রয়োজন। সে মুদ্রা ক্রয় করার তরে আপনি দিশি মুদ্রা দিতে প্রস্তুত, কিন্তু পি ফর্মের পীঠস্থান রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সবিনয়ে বলবে, এদানির বিদেশি অর্থের বড়ই অনটন। সরি! কথাটা খুবই সত্য, সে কথা আমি কোনও ব্রাহ্মণ বন্ধুর কাছ থেকে পৈতে ধার করে সেইটে ছুঁয়ে কসম খেতে রাজি আছি।
সবই জানি। শুধু জানিনে, পাসপোর্ট না পেলে যে রকম মোকদ্দমা করা যায় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বিদেশি কড়ি না দিলে তার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা দায়ের করা যায় কি না।
এ পর্যায়ে কিন্তু একটি শেষ কথা না বললে অন্যায় হবে। কর্তারা যে যাকে-তাকে চট করে বিদেশ যেতে দেন, তার প্রচুর কারণ আছে। কিন্তু সেকথা আরেক দিন হবে।
.
মোদ্দা কথায় ফিরে যাই।
ত্রিশ বৎসর পূর্বে এইসব বহুবিধ, যাবতীয়, হরেকরকম্বা সমস্যা সম্বন্ধে সবাই ছিল উদাসীন। মার খেয়ে খেয়ে, এবং তার চেয়েও নির্মমতর অভিজ্ঞতা পয়সাওলারা কী করে সর্ববাধা অতিক্রম করে সর্বত্র যাতায়াত করেন, বিজনেসমেন দেশের সম্পদ বৃদ্ধির জন্য বিদেশ যাবার তরে সর্ব ছাড়পত্র সংগ্রহ করে ড্যাংড্যাং করে রওনা দিলেন, আপনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন, সে তো বুঝি, কিন্তু সঙ্গে তাঁর বিরাটকলেবরা ভামিনী গোটাদুত্তিন বালক পুত্র এবং কন্যা,– এনারা যাচ্ছেন দেশের কোন সম্পদ বৃদ্ধি করতে, এবং এনাদেরই একজন
উনিশটিবার ম্যাট্রিকে সে
ঘায়েল করে চললো হেসে
বিলেতে কিংবা ওয়াশিংটন
মুদ্রা মেলা, হাজার টন।
এ তো বিদেশের কথা। কটা লোকই-বা বিদেশ যাবার মতো রেস্ত ধরে। দেশের ভিতরকার সমস্যাই-বা কিছু ছেড়ে কথা কয় নাকি? একদা ভূমিকম্প হলে, যথেষ্ট বৃষ্টিপাত না হলে, টাইগার হিল থেকে কুয়াশার দরুন কাঞ্চনজঙ্র দর্শন না পেলে, বাজী পঠি বাচ্চা না বিয়োলে অন্যথা বউ সাত নম্বরের বাচ্চা বিয়োলে, পর্যাপ্ত পরিমাণে স্কচ চুকুস চুকুস করে না চাখতে পারলে, গণ্ডায় গণ্ডায় রামমোহন রবিঠাকুর না জন্মালে আমরা বণিকের মানদণ্ড-র উত্তরাধিকারিণী মহারানির (পাড়ার ঘোষাল বলত, ব্যাটাদের ঘিনপিতও নেই– বেনের এঁটো গব গব করে খেল রাজার বেটাবেটি) বাজার সরকার বড়লাটের খুলিতে ডবল বম ফাটাবার চেষ্টা করতুম– অবশ্য সঙ্গোপনে মনে মনে।
সুস্থাবস্থায় কিন্তু সেই মনই অতিশয় বেয়াদব প্রশ্ন শুধোত এসব বর্গিদের, খাজনা দেব কিসে?
গুরু বড় দুঃখে বলেছিলেন, শোন থেকে মশান থেকে ঝোড়ো হাওয়ায় হা হা করে উত্তর আসে আব্রু দিয়ে, ইজ্জৎ দিয়ে, ইমান দিয়ে–বুকের রক্ত দিয়ে।
একই নিশ্বাসে গুরুর সেই ভবিষ্যবাণীর সঙ্গে আমার পরবর্তী যুগের অক্ষম সাবধানবাণীর কথা তুলি কোন পাপমুখে? কিন্তু পাঠক ক্ষণতরে চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন, এটা আমার দম্ভ নয়। ঝাড়া তিনটি মাস মেসের ভাত না খেলে (কিংবা উপস্থিত আমি যে নার্সিং হোমের খুঁটে খাচ্ছি সে বস্তুর অভিজ্ঞতা না থাকলে) মায়ের রান্নার প্রকৃত মূল্য কে কখন বুঝতে পেরেছে? যুধিষ্ঠিরকে যে নরক দর্শন করানো হয়েছিল সেটা বিধাতার কোনও উটকো খামখেয়ালি নয়। নইলে স্বর্গপুরীর অপ্সরাদের সঙ্গে দু দণ্ড রসালাপ বিশ্রম্ভালাপ করার পূৰ্ণানন্দটা তিনি তারিয়ে তারিয়ে চাখতেন কী প্রকারে? গব গব করে গিলতেন, আমরা যে রকম মেসের রান্না হড় হড় করে গিলে রেকর্ড টাইমে পাপ বিদেয় করি।… এইবারে শ্যানা পাঠক নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন, আমার প্রবন্ধ সাতিশয় মনোযোগ সহকারে পঠন কেন অবশ্য কর্তব্য, একান্ত অবর্জনীয়। তার চেয়েও ইমপর্টেনট প্রবন্ধ : তার চেয়ে আরও ইমপর্টেনট কর্তব্য, আমার বই কিনুন– চাই পড়ুন, চাই না বা পড়ন।
ত্রিশ বৎসর পূর্বে আমি পুনঃপুন বলেছিলুম, আরও কঠোরতর, আরও নির্মমতর খাজনা দিতে হবে স্বরাজ লাভের পর। এইবেলাই যদি সে খাজনার সন্ধান না নাও তবে তোমার কপালে বিস্তর গদিশ আছে। এই দেখুন না আজ পুব বাংলার হাল! কাল যে পশ্চিম বাংলায় হবে না তার আশ্বাস দেবেন কোন পলিটিকাল গোঁসাই?– আমি অবশ্য এসব দুর্যোগের ভবিষ্যত্বাণী আপ্তবাক্য রূপে প্রকাশ করিনি। কিন্তু যা কিছু নিবেদন করেছিলুম সেটা কেউ কান পেতে শোনেনি। (বলতে ইচ্ছে করছে এখন তবে খাও কানমলা, কান টানলে মাথা আসে সেটা যেমন সত্যি, ঠিক তেমনি সত্যি কান না পাতলে কানমলা খেতে হয়)।
