এইসব এবং অন্যান্য নানাবিধ কারণে ট্রেনজিসটারের সুলভতা ভুলবেন না– দেশের লোক, রকের রকফেলার এস্তেক পাড়ার পদীপিসি পর্যন্ত নানা বিষয়ে এমনই ওয়াকিফহাল হয়ে গিয়েছেন যে ১৯৪৪ সালে যা ছিল কঠিন বিষয়বস্তু, স্পেশেলাইজড তত্ত্বতথ্য, আজ তার অনেক কিছু হয়ে গিয়েছে ক ম ন ন লে জ। যেমন ধরুন ১৯৪৪–চুয়াল্লিশ কেন প্রায় ১৯৫২/১৯৫৩ অর্থাৎ যত দিন না নাপাক সরকার উভয় বঙ্গের যাতায়াতের জন্য ভিসা প্রথা প্রচলন করলেন। সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গসন্তান চোখের জলে নাকের জলে শিখল, ভিসা কারে কয় এবং প্রথম আপন সরকার ভারতীয় হলে ভারত সরকার পাকিস্তানি হলে পাক সরকারের কাছ থেকে যে সর্বপ্রথম দশ টাকা না পনেরো টাকা খর্চা করে একখানি পাসপোর্ট যোগাড় করতে হয়। তার জন্য কিউয়ে দাঁড়াও, ফর্ম বের করো এবং বিরাটতম চার পৃষ্ঠাব্যাপী তিন দফে (ইন ট্রিপলিকেট!) সেগুলো ফিলআপ করো। পাক্কা দেড়ঘণ্টা থেকে দু ঘণ্টা লাগে, যশয়। এই ফর্ম যদি আপনি স্বয়ং ফিলআপ করেন তবে আন্তর্জাতিক প্রাথমিক আইনকানুন সম্বন্ধে আপনার বেশ খানিকটে জ্ঞান হয়ে যাবে। কিন্তু দোহাই ধর্মের, আপনার নিরাপত্তার জন্যে তথা পাসপোর্ট আপনি আখেরে যেন পান তার জন্য আপনি সে ফর্ম স্বয়ং ফিলআপনা করে করাবেন ওই আপিসের আশেপাশে যেসব প্রফেশনাল ফর্ম ফিল আপ করনেওলারা আছে। অপরাধ নেবেন না; বেহারি ভাইয়ারা যে রকম ইটালিয়ান ব্যুরোতে, অর্থাৎ ইটের উপর বসে প্রফেশনালকে দিয়ে মনিঅর্ডার ফর্ম ফিলআপ করায়। হুবহু সেই রকম। অ। আপনি বুঝি ইংরেজিতে এম.এ. ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট, পিএইচডি.লিট। তাই আপনার দেমাক। কোনখানে ব্লক ক্যাপিটাল হরফে লিখবেন আর কোনখানে সাদামাটা হরফে, যে সব জায়গা দফতর ফিল আপ করবে, করে ফেললেন আপনি, যে জায়গাটা সুন্দুমাত্র খালাসিদের (যারা একদা পাকিস্তানি ছিল কিন্তু অধুনা ইন্ডিয়ান, আবার কখন রঙ বদলাবে তার স্থিরতা নেই এবং ইতোমধ্যে বেআইনি কায়দায়– যার জন্য তিন মাসের তরে শ্রীঘর-শ্বশুরালয়– সে জোগাড় করেছে তিন-তিনখানা পাসপোর্ট : প্রথমটাতে সে ভারতীয় নাগরিক, দ্বিতীয়টাতে সে পাক্কা ব্রিটিশ, তৃতীয়টাতে সে পাকিস্তানি। পুলিশ সন্দেহ করে শুধোলে সে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলবে সে ভারতীয় এবং ভারতীয় পাসপোর্ট তার ছিল কিন্তু সেটা খোয়া গেছে : তার মতলব আরেকখানা পাবার। পেলে এটা বা আগেরটা বিক্রি করে দেবে। এই কলকাতাতেই যারা নোট জাল করে তারা স্পেয়ার টাইমে করে পাসপোর্ট জাল। এরা সে পাসপোর্ট কিনে নিয়ে অত্যুকৃষ্ট কেমিক্যাল দিয়ে খালাসির ফোটোগ্রাফ সেই পাসপোর্ট থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। যে ব্যক্তি গুণ্ডা বা ফেরার বলে পাসপোর্ট যোগাড় করতে পারেনি তার ফটো ছাপা হবে– সেখানে জায়গাটায় নতুন ফোটো কেমিকাল লাগিয়ে।… এতে বেশ কাঁচা দু পয়সা আমদানি হয়। খিদিরপুর অঞ্চলে নাকি একটা (প্রাইভেট) লিমিটেড কোম্পানি হয়েছে– ভাবছি কিছু শেয়ার কিনব) সেটা ফিল আপ করে বসলেন আপনি। সে ভুলটা ধরিয়ে দেবে আপনারই এক ভাগ্নে– উনিশবার ম্যাট্রিকে সে/ঘায়েল করে থামল শেষে। তখন ছিঁড়ে ফেলুন সেই তিন প্রস্ত ফর্ম, ফের দাঁড়ান কিউয়ে– ফের, ফিনসে। আর সবচেয়ে মারাত্মক অদৃশ্য ফাঁদ যেটি সদাশয় সরকার, অবশ্য অতিশয় অনিচ্ছায় কিন্তু সরকারি পয়সার যাতে অপচয় না হয় সেই শুভ ব্রত গ্রহণ করে আপনার জন্য পেতেছেন। অদৃশ্য কেন বললুম এখখুনি বুঝতে পারবেন। আমরা তথা পাকিস্তানিরা বিলেত ফ্রান্সের তুলনায় তো সবে স্বরাজ পেয়েছি। আমাদের সরকারকে কোন কোন প্রশ্ন জিগ্যেস করতে হয় সে সম্বন্ধে খুব একটা স্পষ্ট ধারণা নেই। ইংরেজ একদা যেসব প্রশ্ন শুধোত তার বেশকিছু বিশেষ একটা উদ্দেশ্য নিয়ে মহারানির রাজত্ব যেন হিটলারের সহস্রবর্ষের রাইষ-এর মতো অজরামর হয়ে থাকে। মহারানির রাজত্বে যেন কস্মিনকালেও– মহাপ্রলয়ে তাবৎ মণ্ডলসমূহ তথা অগণিত নক্ষত্ররাজি লোপ পাওয়ার পরও সূর্য কখনও অস্তমিত না হয়। … তা সে যাক গে। এখানে পাসপোর্ট ফরম তৈরি করার সময় ভারতীয় হুজুরদেরই স্থির করতে হয় আমরা কোন কোন প্রশ্ন শুধব। পয়লা ঝটকাতেই সব প্রশ্ন হুজুরদের মনে আসে না। পরে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন, ঐয্যা! অমুক প্রশ্নটা তো শুধানো হয়নি। কিন্তু হায় তখন তো আর তাবৎ ছাপা ফর্ম বাতিল করে দেওয়া যায় না। তাই বের করলে এক নয়া কৌশল। নতুন প্রশ্ন রবার স্ট্যাম্পে বানিয়ে নিয়ে চাপরাশিকে দিলেন হুকুম, প্রত্যেক ফর্মে মারো এই ইস্টাম্পো। চাপরাসি ভটভট সেই কর্ম করতে লাগল ফর্মের এক সংকীর্ণ কোণে। এখন হয়েছে কী, আপনি পেলেন ৩৭৩৮৫ নম্বরের ফর্ম। ততক্ষণের রবার স্ট্যাম্পের হরফগুলো সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে সেটি হয়ে গিয়েছে নখের মতো পালিশ। তখন ফর্মে একটা ঝাপসা ঝাপসা ফিকে বেগনি রঙের কুয়াশা কুয়াশা মাত্র দেখা যায় অবশ্য আপনি যদি সেটি সাতিশয় মনোযোগসহ নিরীক্ষণ করেন। সেটা দেখে আপনার মনে কিছুতেই সন্দেহ হবে না যে এটা খয়ে যাওয়া রবারস্ট্যাম্পের অবদান– আপনি সন্দেহ-পিচেশ হোন না কেন? অ! ভুলে গিয়েছিলাম আপনি ইংরেজিতে ডি লিট কিংবা যাই হোন না কেন, যেখানে কোনও অক্ষরের চিহ্নমাত্র নেই তার পাঠোদ্ধার করবেন কী করে? তাই আপনি নিশ্চিন্ত মনে ফর্ম পাঠিয়ে দিলেন হেড অফিসে। এক মাস পরে সেটি এল ফেরত। এবং সঙ্গে লেখা আছে আপনি অমুক নম্বর প্রশ্নের উত্তর দেননি কেন? আপনি খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে যাবেন সেই প্রফেসনালের ইটের পাজাতে। সে লেটেস্ট খবর রাখে। সে সেই বেগনি কুয়াশার মধ্যিখানে সঠিক জায়গায় উত্তরটি লিখে দেবে। শুধু কি তাই? আপনি যেসব উত্তর দিয়েছেন, আপনার জ্ঞান আপনার বিবেক অনুযায়ী সেগুলো চেক অপ করতে করতে সে বিষম খাবে, আঁতকে উঠবে আর গোঙরাতে গোঙরাতে বলবে, এসব কী উত্তর দিয়েছেন! বরঞ্চ আপনার কৃষ্ণপ্রাপ্তি হলেও হতে পারে কিন্তু এসব উত্তর শুনতে চান এবং শুধু তাই নয়, আজ কী উত্তর শুনতে চান, মত পালটে পরশু দিন ফের কোন উত্তর দিলে পাসপোর্ট প্রাপ্তি হবে না। সে জানে, হুজুররা কী উত্তর শুনতে চান। সে নতুন ফর্ম তার বাক্স থেকে বের করবে আপনাকে ফের কিউয়েতে ধন্না দেবার গব্বযন্তনা থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে এবং এমন সব আকাশকুসুম, সোনার পাথরবাটি উত্তর লিখবে যে এবারে আপনার বিষম খাবার, আঁতকে ওঠবার পালা।
