ডাক্তারেতে বলে যখন মরেছে এই লোক
তাহার তরে বৃথায় করা শোক।
কিন্তু যখন বলে জীবন্মৃত্রর
তখন শোনায় তিতো
আমার হল তাই—
পরে কবি বুঝলেন, গৌড়ীয় পাঠক মাত্রই তার এ-বিনয় অট্টহাস্যসহ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবে। তাই পুস্তকাকারে প্রকাশের সময় এ ছত্র কটি তিনি নাকচ করে দিলেন।
আর আমার বেলা?
জীবন্ত না। খাবি-খেকো, গঙ্গাযাত্রার আস্ত জীবন্মৃত।
সে কথা থাক।
ওই সময় অন্যান্য যাবতীয় বিষয়বস্তুর মধ্যে আমার একটি বক্তব্যে আমি বার বার ফিরে আসতুম। বলতুম, স্বরাজ আমাদের দিগ্বলয় চক্রের মতোই নিয়ে বা ঊর্ধ্বে দৃষ্টির বাইরে থাকুন না কেন, এই বেলাই তার জন্য কিছু কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজন। ২. স্বরাজলাভের সঙ্গে সঙ্গেই ভারত পৃথিবীর সর্বদেশেই এম্বেসি, লিগেশন, কনসুলেট, ট্রেড কমিশন নিযুক্ত করবে; ৩. সে সব দফতরের জন্য বিদেশি ভাষা জাননেওলা লোকের প্রয়োজন হবে; ৪. বাঙালি ভাষা শেখার জন্য বিশেষ বুদ্ধি ধরে অতএব, এই বেলাই সাততাড়াতাড়ি কলকাতাতেই ভিন্ন ভিন্ন ভাষা শিখবার ব্যবস্থা করা অতীব প্রয়োজনীয় জরুরি কাজ। কারণ প্রথম ধাক্কাতেই যারা ফরেন সার্ভিসে ঢুকতে পারবেন তারা দেশদেশান্তরে ঘুরে বেড়াবেন এবং ফলে তাদের ছেলে এমনকি মেয়েরাও একাধিক ভাষা ইচ্ছা-অনিচ্ছায় শিখে নেবে। তখন আমাদের কলকাতার মেধাবী ছেলেরাও এদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। ফলে ভালো ভালো চাকরি, যারা প্রথম ধাক্কায় ঢুকেছিল বংশানুক্রমে তাদের গোষ্ঠীপরিবারের একচেটে সম্পত্তি হয়ে যাবে। এ কিছু আজগুবি নয়া হাল নয়। বিসমার্ক এমনকি তার পূর্বেও যেসব খানদানি পরিবার ফরেন অফিসে প্রথম ধাক্কাতেই প্রবেশ করেছিল তাদের বংশধরগণকে গণতান্ত্রিক ভাইমার রিপাবলিক কমিয়ে দিয়ে মেধাবী মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোককে ঢোকাতে পারেননি। এমনকি হিটলারও এদের বিশেষ কাবু করতে পারেননি। এঁরা মস্করা করে বলতেন, নাৎসিদের দিয়ে এসব কাজকর্ম করানো যায় না; আমাদের মতো স্পেস (স্পসিয়ালিসট= স্পেশালিস্ট ওয়াকিফহাল) না থাকলে তাবৎ ফরেন আপিস এবং সঙ্গে সঙ্গে ওদের নিযুক্ত ন্নি ভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলো তছনছ বানচাল হয়ে যাবে।
আমার এসব সাবধানবাণীতে খুব কম লোকই তখন কান দিয়েছিলেন। একাধিক জন। আমাকে বলেন, আরে মশাই, আগে তো স্বরাজ ফলটি পেকে মাটিতে পড়ুক।
আমার পেটেন্ট উত্তর ছিল, রাধে মেয়ে কি চুল বাঁধে না?
আজ আমাদের কানে জল গেছে। আজ ম্যাকস্যুলার ভবনে, রুশ পাঠচক্রে ভিড় এমনকি কোনও কোনও বাড়ির বউ-ঝিরা এঁদের মধ্যে আছেন। শ্ৰীযুত মনোজ বসুর ধর্মপত্নী ও পুত্রবধূ কয়েক বৎসর আগে একই রুশ ক্লাসে পড়াশুনো করতেন।
কিন্তু ইতোমধ্যে ঘোড়া পালিয়েছে। আস্তাবলে এখন চাবি মারাটা বন্ধ্যাগমনের ন্যায় নিষ্ফল। সংস্কৃত সুভাষিত কয়, প্রদীপ নির্বাপিত হয়ে যাওয়ার পর তেল দিয়ে কী লাভ, যৌবনান্তে বিবাহ করে কী ফল পাবে!
সেই ১৯৪৪ থেকে কানমলা খেয়ে খেয়ে অর্থাৎ এ সব বাবদে লেখা সাধারণ জনের কৌতূহল উদ্রেক না করাতে আমি অন্য সব বিষয় নিয়ে লিখতে আরম্ভ করলুম। যারা দেশ পত্রিকায় (এ পত্রিকাতে ১৯৪৮/৪৯-এ আমার সর্বপ্রথম পুস্তক দেশে-বিদেশে ধারাবাহিক রূপে বেরোয় এবং সে-সম্বন্ধে দেশ পত্রিকার সুযোগ্য একনিষ্ঠ সম্পাদক শ্রীমান সাগরময় ঘোষ তাঁর অনবদ্য সম্পাদকের বৈঠক পুস্তকে কীর্তন করেছেন। সে যুগ থেকে বস্তুত ১৯৪৪ থেকে আমি কয়েক মাস, কখনও-বা দু এক বৎসর বাদ দিয়ে ঢাকের বাদ্যি থেমে গেলেই ভালো শোনায় দেশ পত্রিকায় প্রধানত পঞ্চতন্ত্রই লিখে আসছি) আমার এই পঞ্চতন্ত্র মাঝে মধ্যে পড়েছেন তারাই জানেন আমি এখন প্রধানত অজগর আসছে তেড়ে।/আমটি আমি খাব পেড়ো কিংবা ঔড্র পদ্ধতিতে ক রে কমললোচন শ্রীহরি/। করেন শঙ্খচক্রধারী ধরনের নির্বিষ অজাতশত্রু রচনাতে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখি।
কিন্তু ইতোমধ্যে মেঘে মেঘে বেলা হয়ে গিয়েছে। আমি তখন ছিলেম মগন গহন ঘুমের ঘোরে। স্বরাজ লাভের সঙ্গে (১) ভারতীয় রাষ্ট্রদূতরা মদনভস্মের মতো বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়লেন। তারা যে সব দেশে অবস্থান করছেন তাদের সমস্যা, ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ইত্যাদি নানাবিধ বিষয় সম্বন্ধে বিবৃতি দিতে লাগলেন; কখনও স্বেচ্ছায় কখনও পার্লিমেন্টের তাড়া খেয়ে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারফত। তাঁদের দারাপুত্ৰপরিবারও এ সব দেশকে কেন্দ্র করে সাহিত্য নিম-সাহিত্য প্রকাশ করলেন। (২) দলে দলে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, জর্নালিস্ট, সাহিত্যিক, ছাত্রছাত্রী, টুরিস্ট, সরকারি কর্মচারী গয়রহ নিত্যি নিত্যি দুনিয়াটা চষে ফেলতে লাগলেন। তাদের অনেকেই গানা থেকে অল-আলেমিন সিদি অল-বররাণি, পানামা থেকে তাশকেন্দ প্লাদিভস্তক সম্বন্ধে এন্তের এন্তের প্রবন্ধ কেতাব লিখলেন। অনেক সময় অগ্রপশ্চাৎ সম্যক বিবেচনা না করে। পরে সে বইয়ের কিয়দংশ সানুষ্ঠানে ভস্মীভূত করা হল। চার্বাক বলেছেন, ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতৎ কিন্তু এস্থলে পুনরাগমন আদৌ অসম্ভব নয়। বিশাখাপট্টনমে যখন জাপানি বোমা পড়ে তখন সরকারের হুকুমে ট্রেজারি অফিসার জমায়েত কারেনসি নোট পুড়িয়ে দিল্লিতে খবর দিলেন তিনি সাকুল্যে তাবৎ নোট ভস্মীভূত করেছেন। উত্তম। দু বত্সর যেতে না যেতে তার কিয়দংশ গুঁড়ি গুঁড়ি কী করে যে হাটবাজারে মদ্যালয়ে ক্লাবে আত্মপ্রকাশ করল কেউ জানে না।… এবং সবচেয়ে মোক্ষম তত্ত্ব (৩) ইংরেজ আমলে আমাদের বৈদেশিক নীতি কী হবে সে নিয়ে আমাদের কোনও শিরঃপীড়া ছিল না। এখন ওই বিষয় কানু ভিন্ন গীত নেই। অধুনা ডিহি পোঁদালিয়া ২/১ক/ক নং থার্ড বাইলেন শালপাতা ঠোঙ্গা বিতরণীর সহ-শাখা-কমিটির রক থেকে আরম্ভ করে টাটা-বিড়লা-লিভার ব্রাদারজের গোপনতম আলোচনা কক্ষে ওই এক কানুর গীত। যেমন মনে করুন এই যে ইংরেজ কমন মার্কেটে ঢোকার জন্য বেহায়া বেশরম হ্যাংলামোর চূড়ান্তে পৌচেছে, টা-পেনি হে-পেনি লুকসুমবের্গ বেলজিয়ামের মতো দেশের পা চাটছে সর্ব ইজ্জৎ সর্ব ইমান সৰ্ব আব্রু বাকিংহাম প্রাসাদস্থ স্কেটিং করার পুকুরে গলায় পাথর বেঁধে বিস্ হাথ পানিমে ডুবিয়ে দিয়ে দ্য গলের প্রেতাত্মারূপী বর্তমান সরকার তাদের পশ্চাদ্দেশে দু-চারখানা সবুট সরেস কিক কষাবে না তো- গোষ্ঠ-সমদ যে রকম পেনালটি পেলে, কালী (মৌলা) আলী ফোকটে বেমক্কা না-হক্কো পেনালটি পেলে যে রকম কালী আলীর (কালীঘাট মৌলা আলী) কাছে পুজো শিরনি মানৎ করে।
