তা সে যাই হোক যাই থাক, কর্মক্ষেত্রে দেখা গেল গাঁধীজির প্রতিশ্রুতি এক বৎসর অতি সরেস রবারের মতো– বড্ডই ইলাস্টিক, বিলম্বিত উভয়ার্থে হওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা ধারণ করে। যতই মারিবে টান ততই যাবে বেড়ে।
এ স্থলে আমাকে বাধ্য হয়ে কিছুটা জীবনস্মৃতি মন্থন করতে হবে। পাঠক, অসংখ্যবার আমার অপরাধ মার্জনা করেছ। আরেকবার করলে হয়তো একশোতে পৌঁছে তুমি রত্নাকরের মতো মোক্ষ লাভ করে যাবে। আর কথায় বলে যাহা বাহান্ন তাহা তিরানব্বই (হায়, হায় পাঠক, দ্যাখ তো না দ্যাখ, বিধাতা গয়লা আমার হাত দিয়ে কী কৌশলে তামাক খেয়ে নিলেন, অতি সাধারণ একটি প্রবাদ গুবলেট করে দিলেন)। কিন্তু আমার জীবনস্মৃতি লিপিবদ্ধ করার মতো দুর্মতি আমার কখনও হবে না সে আমি জানি। ওদিকে আবার আমার চেয়েও পাপিষ্ঠজন ইহসংসারে আছে। তারা সর্বক্ষণ আমাকে টুইয়ে টুইয়ে অনুযোগ বিনয় করে, আমি যেন আমার আত্মজীবনী লিখি, কারণ আপনার মতো বিচিত্র অভিজ্ঞতা কজনের আছে (অর্থাৎ খুনখারাবি করে পৃথিবীতে কোন দীনতম দেশের কারাগারের শ্রীবৃদ্ধি সাধনে মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন আমি করিনি?), পৃথিবীর কোন দেশ আমি চষিনি (অর্থাৎ কোন দেশের পুলিশ আমাকে গুণ্ডা আইনে ফেলে– যে আইনানুযায়ী নগরপাল যে কোনও গুণ্ডাকে চব্বিশ ঘণ্টার ভিতর শহর ছেড়ে অন্যত্র যাবার মোক্ষম আদেশ দিতে পারেন– সেদেশ থেকে বের করে দেয়নি?)। মোদ্দা কথা আমি অকপটে সত্যবর্ণন করলে তেনারা বগল বাজিয়ে নৃত্য করতে করতে বলবেন, বলেছিলুম, তখনই বলেছিলুম। হয়তো-বা একটি ছড়াও সঙ্গে জুড়বেন :
বাইরে তোমার লম্বা কোঁচা
ঘরেতে চড়ে না হাঁড়ি,
খেতে মাখতে তেল জোটে না,
কেরোসিনে বাগাও তেড়ি।
যাও হে, যাও হে, কালাচাঁদ
আর এসো না আমার বাড়ি
এবার এলে আমার বাড়ি
দেব তোমায় খ্যাঙরার বাড়ি।
পক্ষান্তরে এবারে আমার জীবন সম্বন্ধে নির্বিকার উদাসীন পাঠক বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়ই, কোন দুষ্ট, পরশ্রীকাতর, বিঘ্ন-সন্তোষী জুগুপ্সা দ্বারা তাড্যমান হয়ে এনারা আমাকে জীবনস্মৃতি লিখতে বলেন।
কিন্তু ভবদীয় সেবককে তার কিছুটা, সামান্যতম অংশটা এ স্থলে নিবেদন করতেই হবে। নইলে (১) সে-পটভূমি নির্মিত হবে না যার সাহায্য বিনা পাঠক আমার তাবৎ সম্যক হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন।
অপরঞ্চ (২) পূর্বলিখিত চল্লিশ বৎসর যে মুষ্টিযোগ প্রসাদাৎ আমি ডুবসাঁতার মেরে মোজায়িক নির্মাণ করেছিলুম এ স্থলেও তদ্বৎ। সেই পদ্ধতিই অবলম্বন করব।
.
১৯৪৪-এর কাছাকাছি আমি বে-car (বে-কার) তো বটেই, এবং নির্জলা বেকার। শ্যামপেন বরগন্ডি মাথায় থাকুন জল এস্তেক জোটে না। মাথার উপরে ছাতখানাও যদি না থাকে তবে ট্যাপই-বা কোথায় কুঁজোই-বা কই? কাজেই রাস্তার কল থেকে আঁজলা আঁজলা জল খেতুম। তদাভাবে পার্কের পুকুর কিংবা মা-গঙ্গার স্তন্যরসই ছিল আমার সম্বল।
অবস্থা যখন চরমে তখন শ্রীমান কানাই (ভজু-কানাই) সরকারের সঙ্গে দেখা। তার হঠাৎ মনে পড়ে গেল, (আমি যখন শান্তিনিকেতন কলেজে পড়তুম সে তখন ইস্কুলে) যে আমি তখন ইস্কুলের সাহিত্য সভায় বেনামিতে কয়েকটি রচনা পেশ করি। সেগুলো এমনই ওঁচা যে আমি স্বয়ং পড়লে সাধু-স্ সাধু-সাধু রব ওঠার পরিবর্তে দুয়ো দুয়ো দুয়ো ধ্বনি সভাস্থলের চতুর্দিকে মুখরিত হত। ওদিকে মহারাজ শ্রীমান ভজু-কানাই সাহিত্যসভার সেক্রেটারি (আমরা আড়ালে বলতুম স্যাঁকা রুটি) তারে মারে কেডা।*
[*শ্রীমান কানাই যখন শান্তিনিকেতনে এলেন তখন অন্য এক কানাই সেখানে বর্তমান। গুবলেট এড়াবার জন্য তখন তার দাদা ভজুর সঙ্গে তার নাম জুড়ে দিয়ে ভজু-কানাই নাম রাখা হল। আরেকটি উদাহরণ চমৎকার একটি এমনি ছোটখাটো একমুঠো ছেলে এল যে সবাই তার নাম দিল সিকি। ওমা, পরের বৎসর সে তার ছোট ভাইকে নিয়ে এল–সে আরও ক্ষুদে, একদম মাটির সঙ্গে কথা কয়। তার নাম রাখা হল দুআনি।]
সেই কানাইয়ের সঙ্গে দেখা কলকাতায়। ছেলেবেলার বিস্তর কচিকাঁচারা একটুখানি সিনিয়র ছাত্রদের হিরো ওয়ারশিপ করে। আমার রচনা পরে সে যে বিস্তর সাধু-স-সাধু কুড়িয়েছিল তার থেকে তার একটা অন্ধ ধারণা হয়ে গিয়েছিল আমি কালে রীতিমতো ডাকসাইটে কেউকেডা লেখক হব। তাই দেখা হওয়া মাত্রই আমাকে পড়কে নিয়ে গেল স্বর্গত সুরেশ মজুমদার মহাশয়ের সমীপে।
আহা! এ রকম আরেকটি সংবাদপত্র কর্ণধার আমি ত্রিভুবন চষেও পাইনি। কিন্তু আজ না, মোকা পেলে আরেকদিন তাঁর দেহ, মন ও সর্বোপরি তার হৃদয়ের সবিস্তর বর্ণন দেব। তিনি আড়নয়নে আমার দিকে একবার মাত্র তাকিয়েই কানাইয়ের দিকে তাকিয়ে কী যেন একটা মুদ্রা দেখালেন। এ রকম বিনা মেহনতে আমি কোনও পরীক্ষা পাস করিনি।
সত্যপীর ছদ্মনামে সপ্তাহে দু বার দুই কলম, আফটার এডিট লিখতুম। সে কাহিনী দীর্ঘ। শুধু দুঃখের সঙ্গে বলি সে আমলে যারা সবে সাবালক হতে যাচ্ছেন সেই আমি আজ হয়ে গেলুম তাদের পেট রাইটার, অর্থাৎ আমি তাদের ফ্যান। হায় আজ তাদের দরবারে কল্কে পেতে হলে আমাকে রীতিমতো কসরৎ করতে হয়। সব সময় পাইনে। এখন যদি সেই প্রায় ত্রিশ বৎসরের পুরনো সত্যপীর নাম দিয়ে কিছু লিখি– অতিশয় সভয়ে বৃদ্ধ বরজলালের মতো ক্ষীণ কণ্ঠে অর্থাৎ শ্লথ অক্ষম হস্তে লিখিত যৎকিঞ্চিৎ পাঠাই তবে সেটা ছাপা হয় ইংরেজিতে যাকে বলে অন এ রেনি ডে। রবীন্দ্রনাথ বৃদ্ধ বয়সে একটি কবিতা নিম্নের কটি ছত্র দিয়ে আরম্ভ করেন :
