বলেছেন পুনরপি ভাষার জহুরি বিশ্বকবি।
মোদ্দা কথা : কোনও পুস্তকের সব ছত্রই যদি আন্ডারলাইন করো তবে কোনও ছত্রই আন্ডারলাইন করা হয় না।
শ্রদ্ধেয় সুনীতি চট্টোপাধ্যায় একখানা বিরাটাকার বাংলা ব্যাকরণ লেখার পর অনুভব করলেন, হয়তো বড় বেশি বলা হয়ে গেছে। তাই রচনা করলেন একটি ক্ষুদ্র ব্যাকরণ। পথে দেখা হতে বললেন, এবারে একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাকরণ লিখেছি; আগেরটা ছিল ক্ষিপ্ত ব্যাকরণ। আমার এ লেখাটাতে তাঁর ইরশাদ-নির্দেশ মস্তকাভরণ হয়ে রইল।
আরেক গুণী আরেকটি সরেস উপদেশ দিয়েছেন : স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে লেখাতে কিছু কিছু ভুল রেখে দিয়ে। পাঠক সেগুলো ধরতে পারলে বিমলানন্দ অপিচ আত্মপ্রসাদ অনুভব করে। মনে মনে বলে, আমিই-বা কম যাই কিসে! ব্যাটা লেখক যতই বড়-ফাট্টাই করুক না কেন আমি, হ্যাঁ, আমি তার সবকটা বমাল ধরতে পারি। হয়তো-বা কাগজে ভ্রম সংশোধন করে চিঠি লিখবে। সে শংকরের কান মলতে পারে, অবধূতের নাসিকা কর্তন কর্মে সিদ্ধহস্ত। আপনার বইয়ের আরও তিন কপি সে কিনবে। সে যে কেরামতি মেরামতি করেছে সেগুলোসহ বিয়ে-শাদিতে প্রেজেন্ট করবে। আপনার অন্যান্য তাবৎ বই গ্যাটের কড়ি খর্চা করে বাড়িতে তুলবে– ভুলের সন্ধানে, আত্মপ্রসাদ লাভের জন্য।
আমাকে অবশ্য সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় ভুলের কলঙ্ক লেখার উপর ছিটোতে হয় না। সদাপ্রভু আমার হাত দিয়ে নিত্য নিত্য তামাক খান আর আমি খাই পাঠক পণ্ডিতের কানমলা।
ঈশ্বর সদগুরু জগদগুরু মন্নাহ জগন্নাথ আচার্য ক্ষিতিমোহন সেই পরলোক গমনের দিন দুই পূর্বে তাঁরই সম্মুখে তাঁর চিকিত্সক তার সহধর্মিণীকে বলেন, আর দুধটাতে একটু জল দিয়ে সেটা পেতলে নেবেন–উনি তা হলে সহজেই হজম করতে পারবেন। ক্ষিতিমোহন জানতেন তাঁর মৃত্যু আসন্ন। কিন্তু যে লোক আজীবন রসিকতা করেছে মৃত্যুভয় তাকে স্বধর্মচ্যুত করতে অক্ষম। মৃদু কণ্ঠে বললেন, সিডা আর হাসপাতালে করন লাগবে না। গয়লাই আপন বাড়িতে কইরা লয়!
বিধাতা বলুন, নলরাজের অন্তরে প্রবিষ্ট কলিই বলুন, তিনি ওই গয়লার মতো আমার রচনাতে অনবরত জল মেশাচ্ছেন। অধম এ লেখককে আমার গুবীর মতো আর জল মেশাতে হয় না।
আগাতা ক্রিস্টি বিয়ে করেন এক আর্কিয়োলজিস্ট বা প্রত্নতাত্ত্বিককে। ক্রিস্টি যখন বার্ধক্যে উপনীত হলেন তখন এক দরদী যুবতী তাঁকে শুধোন, আপনি বুড়িয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আপনার স্বামী আপনাকে অবহেলা করছেন না তো? আফটার অল– পুরুষের মন।
মাদাম স্যানা হাসির ঝিলিক খেলিয়ে বললেন, তোমরা তো বিয়ে করার সময় অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে দুম করে ঝুলে পড়ো! আম্বো প্রথম বারে তাই করেছিলুম। দ্বিতীয় বারে নির্বাচনটি হৃদয়ের হাতে ছেড়ে না দিয়ে দিলুম হেডাপিস অর্থাৎ ধুরন্ধর ব্রেন বকসটিকে। সে ফরমান দিলে বিয়ের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করাটাই শ্রেয়তর প্রস্তাব। কিন্তু নিতান্তই যদি করতে হয়, তবে কোনও প্রত্নতাত্ত্বিককে।… খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর মাদাম শেষ তত্ত্ব, গভীরতম তত্ত্ব প্রকাশ করে বললেন, জানো তো, যে জিনিস যত বেশি প্রাচীন হয়, প্রত্নতাত্ত্বিকের কাছে তার মূল্য তত বেশি। কব্জিটো এর্গো সুমের ছকে ফেলে অতএব আমি যত বুড়োচ্ছি ততই ওর কাছে আমার মূল্য বাড়ছে।
বিধাতা গয়লা আমার লেখাতে যেমন শনৈঃ শনৈঃ ব্যাকরণের ভুল বাড়াচ্ছেন, শৈলীর শিরদাঁড়া আর ভাষার পাঁজর কটা মটমট করে ভাঙছেন, আমার বইয়ের কাটতি তেমন তেমন হুশহুশ করে বেড়ে যাচ্ছে। পূর্বে যে স্থলে আড়াই শো বইয়ের এক সংস্করণ কাটতে ঝাড়া কুড়িটি বছর কেটে যেত এখন মাত্র উনিশটি বত্সর।
হরি হে তুমিই সত্য।
এই যে হনুমানি লম্ফ দিয়ে আমি মবলগ চল্লিশটি বছর অতিক্রম করলুম নানাবিধ প্রবন্ধ গল্প মারফত এ চল্লিশ বৎসরের একটা সাদামাটা বোচাভোতা মোজায়িক গড়ে তুলেছি, যার উল্লেখ পূর্বেই করেছি, এবং এটাকে দু যুগের সেতুবন্ধস্বরূপ বিবেচনা করা যেতে পারে সে সম্বন্ধে এবং বর্তমান লিখন সম্বন্ধে একটি সাবধানবাণী চতুর্থ বা পঞ্চম বারের মতো পাঠকের দরবারে পেশ না করলে আমি গুরুহীন তথা ধর্মভ্রষ্ট হব।
সেটি এই :
১৯৪৪ সালে যখন স্বরাজ কোন শুভাশুভ লগ্নে অবতীর্ণ হবেন, কী রূপ নিয়ে অবতীর্ণ হবেন, বামন অবতার না এক আজব নয়া ক্লীব শিখণ্ডি অবতার এবং সে-ও অতিশয় ক্ষুদ্রস্য ক্ষুদ্র ধূলি পরিমাণ অংশাবতার হয়ে (আজ তো অহরহ চতুর্দিকে সেই নপুংসকাবতারই দেখতে পাচ্ছি) এই দিলীপ ভগীরথের (একদা) প্রাতঃস্মরণীয় পুণ্যভূমি ভারতবর্ষে অবতীর্ণ হবেন- সে যুগে আমাদের মনে স্বরাজ সম্বন্ধে স্পষ্টাস্পষ্ট কোনও ধারণাই ছিল না। ১৯২০/২১-এ গাঁধীজি এক বৎসরের ভিতর (ভাগ্যিস দশ মাস দশ দিন বলেননি) স্বরাজ আনবেন বলে দিলাশা দেন। কবিগুরু তখন তাকে মুখোমুখি বলেন, এক বৎসরের ভিতর যদি না আসে তবে প্রতিক্রিয়া স্বরূপ জনগণ-মনে যে নৈরাশ্যজনিত কর্মবিমুখ জড়ত্ব এনে দেবে সে কথা ভেবেছেন কি? মহাত্মাজি বলেন, আমি মরালি স্থিরনিশ্চয় যে প্রত্যেক ভারতীয় যদি আমার কর্মসূচি গ্রহণ করে তবে এক বৎসরের ভিতর আমরা স্বরাজ লাভ করবই করব। (এর মাত্র আঠারো বৎসর পর হিটলারও রণশখে ফুকার দেবার পূর্বে বলেন, প্রত্যেক জর্মন সৈন্য যদি সূচ্যগ্রন সুতীনে ভিদ্যতে যা চ মেদিনী পরিত্যাগ করে পশ্চাৎপদ না হয় অপিচ শত্রুকে নিধন করতে করতে বীরের ন্যায় যে ভূমিতে দণ্ডায়মান সেখানেই মৃত্যুবরণ করে তবে আমার জয়লাভ অনিবার্য। অতিশয় হক কথা- সাধু, সাধু। উত্তম, উত্তম। কিন্তু জিজ্ঞাস্য : আমাদের যখন অজানা নয় যে প্রত্যেক মানুষেই কর্মক্ষমতা, আত্মোৎসর্গপ্রবৃত্তি, শৌর্যবীর্য পরিচয় দানের একটা সীমা আছে তখন প্রত্যেকটি লোক শেষমুহূর্ত পর্যন্ত সংগ্রাম করে করে ধূলিশয্যা গ্রহণ করবে এহেন আশা করাটা পূৰ্বাভিজ্ঞতাসম্মত নয়– এটাকে বরঞ্চ ধর্মরাজের দূতক্রীড়ার সময় এবারে আমি জিতব, এবারে আমি জিতবই জিতব দুরাশা দুরাশায় গড়া পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তদুত্তরে হিটলার অবশ্যই বলতে পারতেন, নিয়তি (হিটলার ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন না, কট্টর নাস্তিকও না, কিন্তু নিয়তির অদৃশ্য লিখনে দৃঢ় বিশ্বাস করতেন) কখনওই কোনও মানুষের স্কন্ধে সে বোঝা চাপান না যেটা বইতে পারবে না।
