আমরা যখন ক্লাসে ঢুকলুম তখন একটি আঠার-উনিশের খাপসুরৎ চিংড়ি প্রায় চল্লিশ-বিয়াল্লিশের রগে-পাক-ধরা চুলের চীনা ভদ্রলোককে ব্লাকবোর্ডের উপর কী একটা ধাঁধা বোঝাতে গিয়ে খিলখিল করে হাসছে, আর চীনা প্রৌঢ়টি গাম্ভীর্যের স্মিতহাস্যের সঙ্গে বোকা বনে যাওয়ার ভাবটা মিশিয়ে ঘন ঘন সামনে পিছনে দুলে দুলে দু ভাঁজ হচ্ছেন– ভদ্রতা আর ধন্যবাদ জানাতে হলে চীনারা যে রকম কাওটাও করে।
প্রফেসর হেসে বললেন, চলুক। আমি বাধা দিতে চাইনে। ধাঁধাটা কী?
চিংড়ি আড়াই লফে ডেসকে পৌঁছে তারই উপর মোলায়েমসে বা হাত রেখে অর্ধ লক্ষের আধা চক্কর খেয়ে ডেসক টপকে গুপুস করে বসে পড়ল আপন সিটে। আমি শুধু দেখতে পেলুম, একগাদা বাদামি-সোনালি মেশা ঢেউখেলানো চুল আর বেগুনি হলদেতে ডোরাকাটা ঘাগরার ঘূর্ণি।
ক্লাসের লটবর– পরে জানলুম গ্রিক বললে শাবাশ!
ত্রেতা
সেই যে সুন্দরী মেয়েটি এক লফে ডেসক ডিঙিয়ে আসন নিয়েছিল তার পর ঝাড়া বিয়াল্লিশটি বছর কী করে যে হুশ করে মাথার উপর দিয়ে চলে গেল তার জমা-খরচ আমি কখনও নিইনি। এই চল্লিশ বৎসরের ইতিহাস লেখা আমার শক্তির বাইরে। তবে মনে মনে আশা পোষণ করেছিলুম ল্যানগুইজ পরীক্ষায় পাস করে আমি যে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছিলুম তার বয়স, বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মপদ্ধতি, সেখানকার ছাত্রজীবন, তার পর বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন, এদিকে বন শহর ওদিকে সপ্তকুলাচল, মাঝখানে বিশাল প্রশস্ত রাইন নদ, গোডেসবের্গে জীবন যাপন, হিটলারের অ্যুদয়, তার একচ্ছত্রাধিপত্য, ইতোমধ্যে হাজার হাজার বৎসরের প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি মিশরে বৎসরাধিক কাল বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, (ওই সময়টায় আমি অবশ্য জর্মনিতে ছিলাম না কিন্তু হিটলারের তাবৎ বক্তৃতা এবং গ্যোবেলস-এর অনেকগুলো বেতার মারফত শুনেছিলুম) হিটলারের পতন, যুদ্ধশেষের কয়েক বৎসর পর পুনরায় একাধিকবার– জর্মন ভ্রমণ, বন্ধুমিলন এবং যারা যুদ্ধ থেকে ফেরেনি তাদের বিধবা পুত্রকন্যার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ আরও কত কী– এসবের বর্ণনা দফে দফে দেব। কিন্তু বিধাতা বোধহয় সেটা চাননি। আমি যাতে অকরুণ অকারণে নিরীহ বঙ্গপাঠকের মস্তকোপরি অষ্টাদশ ভলুম নিক্ষেপ না করি তাই তিনি এই চল্লিশ বৎসর আমাকে ননস্টপ তুর্কি নাচন নাচিয়েছেন এবং তার ড্যান্স-ফ্লোর কন্যাকুমারী থেকে সিমলে, মসৌরি, পিণ্ডিদাদনখান থেকে কামাখ্যা! আর সব বাদ দিন– অষ্টাদশপদী এ খট্টাঙ্গ পুরাণ রচনা করার জন্য নিদেন যেটুকু দেশকাল পাত্রের তথা অবকাশের প্রয়োজন তার একরত্তিও তিনি আমাকে দেননি। তাকে বার বার নমস্কার।
পাগলা রাজা মুহম্মদ তুগলুক সর্বদাই তাঁর প্রজাদের মঙ্গল কামনা করতেন। কিন্তু অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন বলে মাত্রাবোধ ছিল তাঁর কম এবং প্রায়ই লঘু অপরাধে মারাত্মক গুরুদণ্ড দিয়ে বসতেন– অনেক স্থলে মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী পিতা যে রকম পুত্রকে তস্য উপকারার্থে মাত্রাধিক লাঠৌষধি সেবন করান। তাই পরলোক গমনের কিয়দ্দিন পূর্বে তিনি আফসোস করেছিলেন, আমি প্রজাদের কল্যাণার্থে যেসব আদেশ দিতুম তারা সেগুলো অমান্য তো করতই তদুপরি আমার পুণ্য উদ্দেশ্যও তারা হৃদয়ঙ্গম করতে পারল না। তাঁর মৃত্যুর পর রাজ-ঐতিহাসিক জিয়া উদ-দীন লিখলেন প্রজাসাধারণের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে মহারাজ আনন্দিত হলেন ও প্রজাসাধারণও হুজুরের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
অষ্টাদশী খট্টাঙ্গ পুরাণ লোষ্ট্র চিরসহিষ্ণু বঙ্গীয় পাঠকের শীর্ষদেশে নিক্ষেপ না করতে পেরে আমি হর্মোদ্বেলিত কণ্ঠে শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ আমেন আমেন জপ করছি এবং আচণ্ডাল গৌড়জনও সেই বিকট মধুচক্র পান না করতে পেরে ঘন ঘন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন।
কিন্তু ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আপ্তবাক্য রূপে বলেছেন, যে-লোক মুলো খেয়েছে তার ঢেকুরে মুলোর গন্ধ থাকবেই। তাই এই চল্লিশ বৎসরের অভিজ্ঞতা যে আমার লেখাতে কিছু না কিছু বেরিয়ে যাবেই যাবে এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু যে ইঙ্গিত পূর্বেই দিয়েছি তারই পূর্ণার্থ প্রকাশ করে বলি, সে সব অভিজ্ঞতা সুসংলগ্নভাবে কালানুক্রমে লিখে উঠতে পারিনি। কিন্তু আমি ভরসা রাখি যে, সুচতুর পাঠক আমার প্রকাশিত পুস্তক থেকে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত টুকিটাকি ছিটেফোঁটা জুড়ে নিয়ে একটি জিগশো পাজল সমাধান করতে পারবেন অর্থাৎ একটি মোজাইক নির্মাণ করতে পারবেন, তদর্থ : মোটামুটি একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি পেয়ে যাবেন। যদিও তার আউটলাইনগুলো সূক্ষ্ম শার্প হবে না, বহু ডিটেল বাদ পড়ে যাবে কিন্তু তাতে করে কিছু আসে-যায় না। তদুপরি ভারতের প্রায় সর্বশেষ আলঙ্কারিক বলেছেন, সবকিছু সবিস্তর বর্ণন করো না; পাঠককে ইঙ্গিত দেবে ব্যঞ্জন দেবে মাত্র যাতে করে সে তার কল্পনাশক্তির সদ্ব্যবহার করার সুযোগ পায়। তাই কবিগুরুও আপ্তবাক্য বলে গেছেন :
একাকী গায়কের নহে তো গান
গাইতে হবে দুজনে
একজন গাবে খুলিয়া গলা
অন্য জন গাবে মনে।
যে দেশে বার বার গিয়েছি তারই এক গুণী বলেছেন, যে সবকথা সবিস্তর বলতে চায়, তার কোনও কথাই বলা হয় না। অনেক কথা যাও যে বলি কোনও কথা না বলি। (তাই) তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি ॥
