আরবি ভাষায় বলে, আকাশে দু খানা চাপাতি। একটি ঠাণ্ডা, আরেকটি গরম। চন্দ্র আর সূর্য।
রাস্তায় যখন বেরোলুম তখন দুপুর। সূর্যটিও তখন আমার কাছে ঠাণ্ডা চাপাতি বলে মনে হল।
তাই বলছিলুম, ভাষা-পরীক্ষার শক্ত জমিতে পড়ে হাড়-হাড্ডি চুরমার না হওয়া পর্যন্ত এখন শুধু হুশহুশ করে নিচের দিকে পতন।
বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে ক্রসিঙে ক্রসিঙে ট্রাফিক পুলিশম্যান রাখা উচিত। আমি ঢুকেছিলুম দু পিরিয়ডের মাঝখানে ক্লাস বদলাবদলির সময়। করিডরে করিডরে আপন ডাইন রেখে তরুণ-তরুণীর জনস্রোত উত্তর-দক্ষিণ পূর্ব-পশ্চিম পানে যাচ্ছে, কিন্তু ক্রসিঙে এসে লেগে যাচ্ছে ধুন্ধুমার। ঠিক ওই সময়ই হয়তো খুলে গেল তারই পাশের বিরাট হলের দরজা। তার থেকে বেরুবার চেষ্টা করছে আরও শ-দুই ছাত্রছাত্রী। তখন লেগে যায় সত্যিকার হরিনট। সবই আবার চলতে চলতে ধাক্কা খেয়ে এদিক-ওদিক ঠিকরে পড়ে তর্ক চালাচ্ছে নিজেদের মধ্যে এখখুনি ক্লাসে অধ্যাপক যা পড়িয়েছেন তারই বিষয়বস্তু।
কিন্তু এত তাড়া কিসের। পরে শুনলুম এবং দেখলুমও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা এবং তার অনুপাতেরও বেশি ছাত্রীসংখ্যা এত মারাত্মক রকমের বেড়ে গিয়েছে যে, এখন আর ক্লাসে জায়গা হয় না। আগে না গেলে রক্ষে নেই।
রোল কল এদেশে নেই। শুনে বঙ্গসন্তান আমি বড়ই উল্লাস বোধ করেছিলুম। গাইড বুক নিশ্চয়ই আছে। তাই মুখস্থ করে ঠিক পরীক্ষা পাস করে যাব– অবশ্য ভাষা-পরীক্ষা নয়, ফাইনালটার কথা হচ্ছে। তখন শুনলুম, গাইড বুক নেই, অধ্যাপকরা বই লেখেন, সেগুলো পড়তে হয়। তা হলে ক্লাসে যাবার কী প্রয়োজন? বিস্তর বই প্রকাশিত হওয়ার পরও অধ্যাপকরা যেসব গবেষণা করেছেন সেগুলো বলেন ক্লাস লেকচারে। পরীক্ষার সময় প্রশ্ন করেন তার থেকে। তার উত্তর না দিতে পারলে ভালো নম্বর পাওয়া যায় না শুধুমাত্র বইয়ের জোরে মেরে-কেটে পাসনম্বর পাওয়া যায় মাত্র।
এসব পরের কথা।
এ জলতরঙ্গ ভেদ করে গন্তব্যস্থলে পৌঁছানো সম্পূর্ণ অসম্ভব বুঝতে পেরে আমি মোকা পেয়ে একটা ফাঁকা ক্লাসে ঢুকে পড়লুম। খানিকক্ষণ পরে ঘণ্টা পড়ল, নেক্সট পিরিয়ডের। করিডরগুলো মরুভূমির মতো খা খা করতে লাগল।
দেশে থাকতে কত রকম কথাই না শুনেছিলুম– জর্মনি পণ্ডিতের দেশ, সেখানকার সবাই ইংরেজি জানে। রাস্তা সোনা-মোড়া। গাঁয়ের লোক যে রকম ভাবে, শ্যালদায় পৌঁছলেই তার জন্যে হুদো হুদো চাকরি অপিক্ষে করে বসে আছে।
অনেক কষ্টে বিদেশিদের প্রতিষ্ঠানটি আবিষ্কার করলুম। আশা করেছিলুম, বিদেশিদের নিয়ে এদের যখন কারবার তখন অন্তত এরা ইংরেজি বলতে পারবে। পারে, তবে আমি যতখানি জর্মন পারি তার চেয়েও কম।
বুঝলুম, বিদেশি রাজত্ব না হওয়া পর্যন্ত কোনও দেশের লোক ব্যাপকভাবে বিদেশি ভাষা শেখে না। আমরা এককালে ফারসি শিখেছিলুম; তার পর ইংরেজি শিখলুম।
মনকে সান্ত্বনা দিলুম, এরা সবাই ইংরেজি বলতে পারলে আমার আর জর্মন শেখা হত না।
ইতোমধ্যে এক সুপুরুষ কাউন্টারে এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন। ওঁকে দেখেই যে মহিলাটি আমার তদারক করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি খুশিভরা মুখে অনর্গল জর্মন বলে যেতে লাগলেন। বার বার প্রফেসর কথাটা আসছিল বলে অনুমান করলুম, ইনি আমাকে জর্মন শেখাবেন। আমিও খুশিমনে ভাবলুম, এবারে আমার ভাঙা নৌকা কূল পেল। একে। আমার হৃদয়বেদনা সমুচিত ভাষায় বুঝিয়ে বলতে পারব।
ইয়াল্লা। ইনিও তদ্বৎ। পরে জানলুম, পাছে তার ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই আপন আপন মাতৃভাষায় তার সঙ্গে কথা বলে বলে জর্মন অবহেলা করে তাই তিনি একাধিক ভাষা জানা সত্ত্বেও জর্মন ভিন্ন অন্য ভাষা বলেন না।
নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। ভাঙা নৌকাটা দ-য়ের দিকে ঠেলে দিয়ে অতল জলে ডুব দিলুম। মা গঙ্গাই জানেন, বস্ত্র নেই– গামছাখানা পর্যন্ত গেছে। মনকে ধমক দিয়ে বললুম, ইংরেজির প্রতি তোমার এত দরদ কেন? ওটা কি তোমার বোনপোর ভাষা? জর্মন কি সতীনের ভাষা? ব্যস, হয়েছে, আর মুক্তোবনে বেনা বোনবার প্রয়োজন নেই।
প্রফেসর আদর করে প্রায় হাতে ধরে ক্লাসের দিকে নিয়ে চললেন। আবার চতুর্দিকে জনসমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ। এবারে কিন্তু ভয় নেই। প্রফেসর কাণ্ডারী। ইনি যদি এ দরিয়ায় আমাকে না বাঁচাতে পারেন তবে ব্যাকরণ পারাবারের কুমির-হাঙ্গর কৃৎ-তুদ্ধিতের পুচ্ছ-দন্ত থেকে পরিত্রাণ করে ভাষা-পরীক্ষার ওপারে নিয়ে যাবেন কী করে? সেই পাদ্রি সায়েবের গল্প মনে পড়ল। বদলি হয়ে এসে অচেনা গ্রামে নেমেছেন। রাস্তায় দুটি ছেলেকে জিগ্যেস করলেন গাঁয়ের গির্জের পথ।
তারা বাতলে দিলে তিনি খুশি হয়ে বললেন, আজ তোমরা আমাকে গাঁয়ের পথ বাতলে দিলে; আসছে রবিবারে যদি গির্জেয় আস তবে স্বর্গে যাওয়ার পথ আমি তোমাকে বাতলে দেব!
তখন একটা ছেলে অন্য ছেলেটার পাজরে খোঁচা মেরে বললে, শুনলি? গাঁয়ের পথ জানে না- সে বাতলে দেবে স্বর্গে যাবার পথ।
উপস্থিত দেখলুম, জর্মনি দেশের আমার প্রথম গুরু অন্তত গাঁয়ের পথটা জানেন।
সে কী ক্লাস! চীনেম্যান থেকে আরম্ভ করে নিগ্রো পর্যন্ত। ঢের ঢের চিড়িয়াখানা দেখছি, কিন্তু এ রকম তাজ্জব চিড়িয়াখানা পূর্বে দেখিনি, পরেও দেখিনি। এরা যদি কোট-পাতলুন না পরে আপন আপন দেশের পোশাক পরত তা হলে অনায়াসে পৃথিবীর যে কোনও ফ্যানসি ড্রেস, কম বলকে হারাতে পারত। দুনিয়ার চিড়িয়া জড়ো হয়েছে জর্মন বুলি শিখে, এদেশের এলেম রপ্ত করে দেশে ফিরে নয়ি তালিমের ছয়লাপ বইয়ে দেবার জন্য। আর বয়েসেরই-বা কত রকমফের! আঠার থেকে চল্লিশ অবধি ছেলেবুড়ো, মেয়ে-মন্দ।
