তাই বোধহয় নগণ্যজনের দৈন্য-দুর্দশা সম্বন্ধে তিনি যৌবনপ্রারম্ভেই সচেতন হন। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার পদ্ধতি দেখে উদ্ধত তার প্রতিবাদ জানিয়ে যে সংস্কারকর্ম আরম্ভ করলেন সে কথা আজও জর্মনি ভোলেনি। পরবর্তীকালে দাসপ্রথার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ-পরিচয় হয়। তিনি তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন এই যুগধর্মসম্মত প্রথার বিরুদ্ধে। এবং আজীবন তাঁর সাধনার মার্গ বর্জন না করে।
তাই যখন কৃতজ্ঞ জর্মনগণ বিত্তহীন জ্ঞানার্থীর জন্য ব্রহ্মোত্তর বা ওয়াফ অর্থাৎ ট্রাস নির্মাণ করল তখন সেটিকে উৎসর্গ করা হল তাঁরই নামে আলেকজান্ডার ফন হবল্ট স্টিফটুঙ। দেশে-বিদেশে এটি সুপরিচিত।
এদেশে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীকে এই ভ্রাতৃদ্বয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ইনি এঁদের জীবনী ও কার্যকলাপের সঙ্গে সুপরিচিত ছিলেন।
সে সত্যযুগ গেছে। মহাকবি গ্যোটেকে গুরুত্বে বরণ করে তাঁর চতুর্দিকে যে কেন্দ্র সৃষ্টি হয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আর কোথাও হয়নি। শ্লেগেল, ফিষটে, শিলার, হুমবল্ট ভ্রাতৃদ্বয়, একেরমান ইত্যাদি ইত্যাদি বহু পণ্ডিত, গবেষক, কবি তাঁদের জীবন-বাতায়ন উন্মুক্ত করে পূর্ব-পশ্চিমের জ্ঞান-দর্শন, ঊর্ধ্ব-অধেঃর বিজ্ঞান-বিশ্লেষণকে যে আবাহন করেছিলেন, তারই ফলে জর্মনির যে সর্বমুখী বিকাশ হল আজও সে বিশ্বজনের বিস্ময়।
লোকে শুধায়, যে জর্মনি ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে পদদলিত, নিঃস্ব, আজ সে বিশ্বের উত্তমর্ণ হল কী প্রকারে?
এর বুনিয়াদ বড় দড়।
.
জীবনে সেই তিনটি সপ্তাহ কী করে কেটেছে তার বর্ণনা দেবার শক্তি আমার নেই। যেন পাহাড়ের চূড়ায় হঠাৎ কুয়াশা নামল। হাতড়ে হাতড়ে আমি এদিক যাচ্ছি ওদিক যাচ্ছি আর দুঃস্বপ্নের বিভীষিকা দেখছি; হঠাৎ পায়ের তলায় শক্ত জমি খসে পড়েছে আর আমি সর্বনাশের অতল গভীরে বিলীন হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছি। এবারে ভাষা-পরীক্ষার শক্ত জমিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব কটা হাড়হাড়ি গুঁড়িয়ে যাবে।
ভাষা-পরীক্ষাটা কী?
চাটুয্যে নিয়ে গেছেন ড. গ্যোপেলের কাছে। বলে রাখা ভালো, ইনি হিটলারের প্রোপাগান্ডা-মাস্টার ড. গ্যোবেলস্ নন। হুমবল্ট ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি। অতিশয় নিরীহ লোক। ততোধিক সাদাসিধে জামাকাপড় যতদূর সস্তা হতে পারে। মোটাসোটা মানুষ এবং হাসি হাসি মুখ। মিষ্টি সুরে এত নিচু গলায় কথা কন যে, টেবিলের এপারে এসে পৌঁছয় না। দেশে থাকতে এর সঙ্গেই পত্রালাপ ছিল। ইনিই প্রাঞ্জল জর্মনে জানিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সিট তৈরি; আমি এলেই হল। এখন বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ সেই মিষ্টি গলাতেই বললেন, অবশ্য একটা অত্যন্ত সরল মামুলি পরীক্ষা দিতে হবে যে, কলেজের লেকচার বোঝার মতো জর্মন ভাষায় ক খ গ ঘ আপনি জানেন।
বলে কী! পরীক্ষা দেব কী করে? ফেল মারব নিশ্চিত। পড়তে পারি– খানিকটা। কিন্তু কেউ কথা বললে সেটা বুঝতে তো পারিনে। না হলে চাটুয্যেকে দোভাষী বানিয়ে আনব কেন।
আর এত বড় বিদকুটে ব্যবস্থা! পড়াশুনোর পর পরীক্ষা দিতে রাজি আছি, কিন্তু এখানে বুঝি আগে পরীক্ষা, তার পর লেখাপড়ি আগে ফাঁসি তার পর বিচার। হটেনটটের রাজত্বেও তো এ রকম ধারা হয় না। হ্যাঁ, দার্শনিক শোপেনহাওয়ার নামকরা জর্মন লেখকদের ভাষাতে ব্যাকরণের ভুল দেখে একবার বলেছিলেন, শুধু জর্মন আর হটেনটটরাই আপন মাতৃভাষা নিয়ে এরকম ছিনিমিনি খেলে।
আমাদের রঙ কালো বলে মুখের ভাব পরিবর্তন ইয়োরোপীয়রা চট করে ধরতে পারে না। তাই তারা বলে, আমরা দুয়ে, অবোধ্য। আমার চেহারা কিন্তু তখন এমনি ফ্যাকাশে মেরে গিয়েছে, শুকনো গলাতালু থেকে এমনি চেরা বাঁশের শব্দে আওয়াজ বেরুচ্ছে যে, ভালো মানুষ ড. গ্যোপেল পর্যন্ত সেটা লক্ষ করে আমাকে দিলাশা-সান্ত্বনা দিতে আরম্ভ করেছেন। পরীক্ষাটা নাকি একেবারে কিসসুটি নয়, ছেলেখেলা, এলিমেন্টারি, ছ মাসের কোর্স, এখনও তিন সপ্তাহ রয়েছে, এন্তের সময় পড়ে আছে।
মানে?
অর্থাৎ বিদেশিদের জন্য জর্মন ভাষার ক্লাস হয়। ছ মাসের কোর্স। আর তিন সপ্তাহ বাদে পরীক্ষা। আপনি কাল থেকে ঢুকে যান– সব ঠিক হয়ে যাবে।
অর্থাৎ ছ মাসের কোর্স আমাকে তিন হপ্তায় শেষ করতে হবে। ওহ! কী সুখবর।
কিন্তু আমি আপত্তি জানাই কী করে? বৃত্তির জন্য দরখাস্ত পেশ করার সময় কবুল জানিয়েছি যে, আমি জর্মন জানি, প্রোফেসারের সার্টিফিকেটও সঙ্গে ছিল। এখন সেগুলো রদবদল করি কী প্রকারে?
গ্যোপেল মিষ্টি গলায় হাসিমুখে আমাকে আরও অনেক সান্ত্বনা দিলেন তার অল্প অল্প বুঝলুম। বাকিটা চাটুয্যে অনুবাদ করে দিলেন।
তার প্রত্যেকটি সান্ত্বনা-বচন আমার সর্বাঙ্গ কণ্টকিত করল। এ যেন ফাঁসির আসামিকে বলা হচ্ছে, দড়িটাকে মাখন মাখিয়ে মোলায়েম করা হয়েছে, যে টুলে দাঁড়াবে সেটা মখমলে মোড়া!
সায়েবের কথার ফাঁকে এটাও বেরিয়ে গেল যে, পরীক্ষায় ফেল মারলে ভর্তি হতে পারব না। আবার ভর্তি হওয়ার পালা ছ মাস পরে অর্থাৎ আমার জর্মন-বাসের শেষের ছ মাস কাটবে বিনা বৃত্তিতে অনাহারী। সায়েব সেটা অবশ্য বলেননি তিনি পইপই করে বোঝাচ্ছিলেন, ও পরীক্ষাতে ফেল মারে শতকরা একজন। কিন্তু সে একজন যে আমি হব না, তিনি জানেন কী করে? লটারিতে হই না, সে আমি জানি।
