দুই সারি বেঞ্চির মাঝখান দিয়ে স্কিপ করতে করতে চলে যাচ্ছে একটি মেয়ে। পিছনে ঠাকুরদা চলেছেন ভ্যামটার চেয়েও মন্দ গতিতে। মেয়েটি উই– ওখানে এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্কিপ করছে; ঠাকুরদা গতিবেগ বাড়াবার প্রয়োজন বোধ করছেন না।
এরই এক পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়।
বেশি পুরনো দিনের নয়। একশো বছরের একটু বেশি। এর চেয়ে ঢের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় জর্মনিতে আছে। আসলে বার্লিন খুব সম্ভ্রান্ত শহর নয়। সে বাবদে রোম, প্যারিস, ভিয়েনা এমনকি প্রাগ;– যারা দেখেছেন তারা ইস্তাম্বুলেরও নাম করেন। বার্লিন অনেকটা লন্ডনের মতো; বেশিরভাগ জিনিসই নকল। তবে কি না বিজ্ঞান এ যুগের কামনার ধন। সেখানে বার্লিনের নাম আছে, আর আছে জর্মনির রাজধানীরূপে। তারই প্রায় কেন্দ্রভূমিতে অবস্থিত বলে ব্যবসা-বাণিজ্য এখানে প্রচুর। টোকিও না ওঠা পর্যন্ত বার্লিন পৃথিবীর তৃতীয় নগরী ছিল।
য়ুনিভার্সিটির সামনেই প্রতিষ্ঠাতা ভিলহেলম ফন হুমবল্টের প্রতিমূর্তি। গ্যোটের বিশিষ্ট বন্ধু।
হায়, সে সত্যযুগ গিয়েছে।
ভারতবর্ষ, গ্রিস, আরব ভূখণ্ডে একদা জ্ঞানী বললে বোঝাত সর্বজ্ঞানে জ্ঞানী। সর্ববিষয়ে সমান জ্ঞান থাকবে এমন কোনও কথা ছিল না, কিন্তু সর্ব জ্ঞানভাণ্ডার থেকে অল্পবিস্তর সঞ্চয় করে যিনি অখণ্ড সর্বাঙ্গসুন্দর বিশ্বদর্শনে উপনীত হতে পারতেন তাকেই বলা হত পণ্ডিত। এ তিন ভূখণ্ডে পাঠ্যনির্ঘণ্ট দেখলেই বোঝা যায়, আদর্শ ছিল মানবজীবনে পরিপূর্ণতায় পৌঁছানোর জন্য পরিপূর্ণ জ্ঞানের সন্ধান। একদিকে আয়ুর্বেদ অন্যদিকে যোগশাস্ত্র, একদিকে ব্যাকরণ অন্যদিকে অলঙ্কার, একদিকে রসায়ন অন্য দিকে দর্শন, সঙ্গে সঙ্গে কাব্যের প্রতি স্পর্শকাতরতা, নাট্যে প্রীতি, কৌটিল্যের কুটিলতার সঙ্গে অন্তরঙ্গ পরিচয়, বসন্তসেনার নৃত্যগীতসঙ্গীতের সম্মুখে সহৃদয় বিস্ময়।
বস্তুত, এ সবই বাহ্য। কিন্তু এদের সন্নিবেশের মাধ্যমে কোনও গুণী হঠাৎ পেয়ে যান অনির্বচনীয়ের সন্ধান। সে সন্ধান ভূয়োদর্শনের, ভূমানন্দের।
সবাই পেত তা নয়, কিন্তু না পেলেও তারা সাধকসমাজে সম্মানিত হতেন। সর্ববিষয়ে তাঁদের সহানুভূতি থাকত বলে তারা প্রাজ্ঞসমাজের পৃষ্ঠপোষক বলে খ্যাত হতেন। জর্মনিতে এ স্বর্ণযুগ আসে অষ্টাদশ শতকের শেষে ও ঊনবিংশ শতকের প্রারম্ভে। তার অন্যতম প্রতীক ভিলহেলম ফন হুমবন্ট।
আসলে ইনি কবি এবং আলঙ্কারিক রসশাস্ত্র সম্বন্ধে প্রামাণিক পুস্তক এবং গ্যোটের কাব্যালোচনা নিয়ে তিনি নামলেন আসরে। কিন্তু অল্পকাল যেতে-না-যেতেই তাঁর রাজনৈতিক প্রাখর্য ধরা পড়তেই তাঁকে ডাকা হল রাজসভায়। ওদিকে তিনি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করতেন–সর্বোচ্চ আদর্শ বলে ধরে তুলেছিলেন মানবচরিত্রের স্বাধীন এবং সর্বাঙ্গীণ বিকাশ সেই আদর্শ যাতে ক্ষুণ্ণ না হয় তাই তিনি আজ ভিয়েনা কাল লন্ডনের রাজদরবারে যেতেন, কিংবা পরশু বার্লিনের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে কাজ করে গেলেন। ওই সময়েই তিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গোড়াপত্তন করলেন।
সঙ্গে সঙ্গে স্পেনের বাসদের ভাষা নিয়ে আলোচনা করে দেখিয়ে দিলেন যে ভাষার মূলে ব্যাকরণ আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু ভাষার কাঠামো ভালো করে পরীক্ষা করলে পাওয়া যায় সে ভাষা-ভাষীর পরিপূর্ণ ইতিহাস। যে কোনও সমাজের সর্বাঙ্গীণ ইতিহাস লুকনো থাকে তার ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের মাঝখানে। তাই এক সমাজ যেমন অন্য সমাজ থেকে ভিন্ন ঠিক তেমনি এক ভাষা অন্য ভাষা থেকে। মূলে এক সমাজ হলেও তারা যদি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়, তবে তাদের ভিন্ন ভিন্ন বিবর্তন তাদের আপন আপন ভাষাতে প্রতিবিম্বিত হয়।
সেই সূত্রে তিনি উপনীত হলেন চরম মীমাংসায় মানুষের মননবৃত্তির শ্রেষ্ঠতম বিকাশ হয়েছে আর্য ভাষায়। মানব দেবতাত্মার পরিপূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় তার বাঙময় ভুবনে।
ভিলহেলম্ ফন হুমবল্ট ভাষাতত্ত্বের সর্বপ্রথম দার্শনিক।
তাঁর অনুজ আলেক্সান্ডার ফন হুমবল্টের পরিচয় দেওয়া আরও কঠিন। সে যুগের গুণীরা একবাক্যে স্বীকার করেছেন, নেপোলিয়ানের পরেই খ্যাতিতে এর স্থান। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন শাখা-প্রশাখা ছিল না যাতে তিনি বিচরণ করেননি। এদিকে ভূতত্ত্ব-উদ্ভিদতত্ত্ব, ওদিকে উত্তর মেরু থেকে আরম্ভ করে বিষুবরেখা অবধি চুম্বকের আকর্ষণশক্তি-বিবর্তন, মহাকাশে উল্কাপিণ্ডে বিশেষ দিনে প্রবলতর বর্ষণ–বিজ্ঞানের একাধিক নবীন ক্ষেত্র তিনি আবিষ্কার করলেন। মহাপুরুষ মুহম্মদ বলেছিলেন, জ্ঞানের সন্ধানে যদি বেরুতে হয় তবে চীনেও যেয়ো। আরবদের কাছে চীনই সবচেয়ে দূরের দেশ। এ মনীষী জর্মনি থেকে চীন, ওদিকে দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বত কিছুই বাদ দেননি। ষাট বছর বয়সে মানুষ যখন খ্যাতির মুকুট পরে সহাস্যবদনে জনগণের করতালিধ্বনি.শোনে, তখন হঠাৎ অর্থানুকূল্য পেয়ে বেরুলেন রাশিয়া ভ্রমণে আবিষ্কার করলেন উরালে হীরকচিহ্ন। অথচ প্রথম যৌবনে প্রকাশিত তাঁর দার্শনিক রহস্যতত্ত্ব ও মাংসপেশির স্নায়ু সম্বন্ধে রচনা তখনই পণ্ডিতমণ্ডলীর শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছিল।
তার কসমস বা সৃষ্টি এখনও আনন্দ ও উৎসাহের সঙ্গে পড়া যায়। এ ধরনের বই আজকাল আর লেখা হয় না। প্রাচীন দার্শনিক জ্ঞান ও সনাতন রসতত্ত্ব তিনি মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন সে যুগের নববিকশিত বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে এমন এক সংমিশ্রণে যাতে করে বিজ্ঞানের ক্ষুদ্রতম বিচ্ছিন্ন জ্ঞানবিন্দু ভূয়োদর্শনের অসীম সিন্ধুতে স্থান পায়। পক্ষান্তরে দার্শনিকের কল্পনাবিলাসের ব্রহ্মাণ্ড পরিক্রমা যেন বাস্তবের ধূলিকণাকে অবহেলা না করে।
