তিনি ছিলেন ভারতীয় সমাজের বেসরকারি অনারারি পাবলিক রিলেশন অফিসার। তার অতিশয় অনিচ্ছাতে এ কর্ম স্কন্ধে এসে পড়েছিল বলে হিন্দুস্তান হৌসের টেলিফোন বাজলে তিনি ব্যস্তসমস্ত হয়ে হাত নেড়ে যে ফোনের কাছে বসে আছে তাকে বোঝাতেন যে তিনি অনুপস্থিত। অবশ্য বামাকণ্ঠ হলে শিভালরির খাতিরে মাঝে-মধ্যে ব্যত্যয় করা হত।
সোফার হাতায় ডান হাত ঠেস দিয়ে তারই উপর গাল রেখে দিনরাত চিন্তা করতেন। কী চিন্তা করতেন জানিনে– খোঁচাখুঁচি করেও বের করতে পারিনি।
হোটেলে বায়স-নিদ্রায় যামিনীযাপন করে পরদিন বেরোলুম বন্ধুর সন্ধানে। সে ঠিকানায় তিনি নেই। তার পর কলকাতার হিসেবে বলতে গেলে কখনও শেয়ালদা, কখনও আলিপুর, কখনও হাতিবাগান, কখনও টালিগঞ্জ করে করে বুঝলুম, বন্ধুর যে ঠিকানা আমার কাছে ছিল, সেটা অন্তত এক বছরের পুরনো এবং ইতোমধ্যে তিনি প্রায় প্রতি মাসে বাড়ি বদল করেছেন। পাওনাদারের ভীতি তাঁর নেই, তবে যে কেন তিনি এই বার্লিন প্রদেশটার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত অবধি চষেছেন পরে তাকে জিগ্যেস করেও জানতে পাইনি। ইতোমধ্যে আমি ভুল বাসে উঠে, ভুল জায়গায় নেমে, ট্রামের নম্বরের সঙ্গে বাসের নম্বর ঘুলিয়ে ফেলে, বিরাট বিরাট বাড়ির আগাপাশতলা ঠ্যাঙাতে ঠ্যাঙাতে শীতে জবুথবু হয়ে কঁকাতে কঁকাতে যখন নিতান্তই একটা বাড়ির সিঁড়িতে ভেঙে পড়লুম, তখন সন্ধান পেলুম সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর মশায়ের। তিনি নিয়ে গেলেন চাটুয্যের কাছে।
সেই শীতে আমি যেন মাঘের পানাপুকুরে চুবুনি খেয়ে দেখি সমুখের আঙিনায় খড়ের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। এক লহমায় সর্বাঙ্গ ওমে এলিয়ে পড়ল। দু লহমায় কুল্লে সমস্যার সমাধান হল। সাধে কি রাঢ়ভূমি বলে, মুখুয্যে কুটিল অতি, বন্দ্যো বটে সাদা, তার মাঝে বসে আছে চট্টেী মহারাজা!
পাঠান্তর প্রক্ষিপ্ত।*[* তুলনার জন্য সুশীল দের বাংলা প্রবাদ নং ২৮৬০ ও ৬৮২৩ দ্রষ্টব্য।]
আমাদের বটতলাতে বই বিক্রি হয়, কলকাতা-মাদ্রাসা অঞ্চলের নাম তালতলা। সেখানে আরবি, ফারসি, উর্দু বই বিক্রি হয়। এখানে লিভেনতলাতে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়। লিভেন মানে ইংরিজিতে লাইম, কিন্তু সে লাইম আমাদের নেবু নয়, তাহলে ওটাকে স্বচ্ছন্দে নেবুতলা বলা যেত। বাঙালিরা তৎসত্ত্বেও বলত।
আমাদের দেশ গরম। সেখানে না হয় পণ্ডিতমশাই অক্লেশে ক্লাস বসান। তারও বহু পূর্বে আরণ্যক হয়ে গিয়েছে। অরণ্যে পাঠ্য ব্রাহ্মণের অংশবিশেষ। কিন্তু শীতের দেশে গাছতলাতে ক্লাস বসবে কী করে? নেবুতলা নাম তা হলে নিতান্তই কাকতালীয়। যেমন বেনেরা বটগাছতলায় বসত বলে ফিরিঙ্গিরা বটগাছের নাম দিল বানয়ান ট্রি।
হিটলার যখন তার হাজার বছরের জন্য রাষ্ট্র গড়তে গিয়ে তার রাজধানী বার্লিন শহরের সংস্কার আরম্ভ করলেন, তখন প্রথমেই হুকুম দিলেন লিন্ডেন বা লাইমগাছগুলো কেটে ফেলতে। শত্রুপক্ষ রটালে, ইনি আবার আর্টিস্ট! আসলে কিন্তু তার দোষ নেই; গাছগুলো তখন অত্যন্ত বৃদ্ধ জরাজীর্ণ। সেগুলো কাটার ফলে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো বড্ড ক্যাটক্যাট করে চোখে পড়ল শত্রু-মিত্র-নিরপেক্ষ সবাই মিলে রাস্তাটার নতুন নামকরণ করলে উনটার ডেন লাটের্নে অর্থাৎ লণ্ঠনতলা! পরে অবশ্য হিটলার তামাম জর্মনি খুঁজে সবচেয়ে সেরা লিন্ডেন চারা সেখানে পুঁতেছিলেন।
.
দুশো বছরের পুরনো খানদানি রাজপথ। রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রায় এক মাইল অবধি গিয়ে ব্রান্ডেনবুর্গ গেট। বিরাট সুউচ্চ সেই তোরণের উপর রথাসহ বিজয়িনী বা ভিক্টোরিয়ার (ইংলন্ডের রানি না) ব্রোঞ্জ প্রতিমূর্তি। হিটলার এ রাস্তা বাড়িয়ে দিয়ে শার্লটেনবুর্গ পেরিয়ে বহুদূর অবধি টেনে নিয়ে তার নাম দিয়েছিলেন ইস্ট-ওয়েস্ট একসিস! তাঁর আত্মহত্যা করার কয়েক দিন পূর্বে এ রাস্তায় যান চলাচল যখন প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ তখন তাকে সাহায্য করার জন্য এখানে উড়োজাহাজ পর্যন্ত একাধিকবার ওঠা-নামা করেছিল। এ্যারপোর্টগুলো তখন মিত্রশক্তির কজাতে চলে গিয়েছে বলে যারা বিশ্বাস করেন। হিটলারের পালাবার কোনও উপায় ছিল না, তাঁদের বিরুদ্ধে অন্যপক্ষ এই ইস্ট-ওয়েস্ট একসিস দেখিয়ে দেন। আজ অর্থাৎ ১৯৫৯ সালে এ রাস্তার পূর্বার্ধ রাশার হাতে, পশ্চিমার্ধ মিত্রশক্তির। কিন্তু সে সব অনেক পরের কথা।
এ রাস্তায় দ্রুত জীবনের চরম গতিবেগের সঙ্গে শান্ত গ্রাম্য জীবনের সুষুপ্তির অদ্ভুত সমন্বয়। দু দিকে যান চলাচলের রাস্তা; মাঝখানে লাইমগাছের বিস্তীর্ণ এভিন চলেছে তো চলেছে, তার যেন শেষ নেই। এদিকে পেভমেন্টের উপর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে একাধিক লোক, বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, স্টপেজে ওটাতে চাপবে বলে, আর এদিকে এভিন্যুর উপর দিয়ে মা চলেছেন পেরাম্বুলেটর ঠেলে ঠেলে সপ্তপদী চলার গতিতে। দশ কদম যেতে না যেতে বসে পড়ছেন হেলানদার বেঞ্চিতে। সেখানে পেনশনার চোখ বন্ধ করে পাইপ টানছেন, যুদ্ধে বিকলাঙ্গ বেঞ্চির গায়ে ক্রাচ খাড়া করে দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছে, এ-বাড়ির আয়া ও-পাড়ার রুটিওলার সঙ্গে রসালাপ করছে, আর বেঞ্চির হেলানে মাথা দিয়ে হেথাহোথা সর্বত্র ঘুমুচ্ছে অনেক লোক। এক বেঞ্চিতে দুটি কলেজের ছোকরা মৃদুকণ্ঠে আলোচনা করছে। আরেক বেঞ্চে একজন আরেকজনের পড়া নিচ্ছে।
