মাল সঁপে দিয়ে রাস্তায় নামলুম।
দেখিনি, কিছুই দেখিনি। রাস্তা, বাড়ি, দোকান, গাড়ি, কিছুই দেখিনি। আমি ভাবছি, যাই কোথায়?
হুদো হুদো কড়ি থাকলে কিছুটি ভাবনা নেই। ট্যাক্সি এবং হোটেল এ দুটি শব্দের প্রসাদাৎ শুটনিক সহযোগে চন্দ্রলোকে নেমে আশ্রয় মেলে। কিন্তু আমার বটুয়াতে তখন ছুঁচোর কেত্তন। স্কলারশিপের প্রথম কিস্তি না পাওয়া পর্যন্ত মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে। তখনও অবশ্য জানতুম না, মাটি পেতে হলে পাথর ঢাকা বার্লিন থেকে অন্তত বারো মাইল দূরে যেতে হয়।
হঠাৎ শুনি, শুট আবেন্ট! তার পর গুড় ইভনিং, তার পর ব সোয়ার। তাকিয়ে দেখি, আমার চেয়ে দু মাথা উঁচু এক পুলিশম্যান কিংবা সেপাইও হতে পারে।
পরিষ্কার ইংরিজিতে শুধালে, আপনার কি কোনও সাহায্যের প্রয়োজন।
ম্যাট্রিক ফেল বঙ্গসন্তান দু শো টাকার চাকরি পেলেও বোধহয় অতখানি খুশি হয় না।
আমি ক্ষীণকণ্ঠে বললুম, হোটেল।
লোকটা আমুদে। চলতে চলতে বললে, এ শব্দটা তো ইন্টারন্যাশনাল। আপনি অত অসহায় বোধ করছিলেন কেন?
সত্যি কথা বলে দেব? প্রথম পরিচয়ের প্রথম জর্মনকে? বলেই ফেলি।
লোকটি দরদীও বটে। দাঁড়িয়ে বললে, সে তো অত্যন্ত স্বাভাবিক। স্টুডেন্ট মানুষ। পয়সা থাকার তো কথা নয়। তা হলে হসপিৎসে চলুন।
আমি শুধালুম, সে আবার কী?
ও! হসপিস! ওটা তো ইংরেজিতেও চলে।
হায় রে কপাল। শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রনাথ, অ্যান্ড্রজ, কলিনসের কাছ থেকে পাঁচ বছর ইংরেজি শিখেও যা জানিনে, জর্মন পুলিশ সেটাও জানে। কলকাতার ভোজপুরি পুলিশ তা হলে একদিন আমাকে আরবি শেখাবে।
হোটেলেরই মতো। তবে বার, ব্যুফে, ডান্স হল, কাবারে নেই। খাবারদাবার সাদাসিধে, ঘন্টি বাজালেই ওয়েটার আসে না। তাই সস্তা পড়ে।
অর্থাৎ হোটেল জিনিসটি দ্য লুক্স–হসপিস তারই গার্হস্থ্য সংস্করণ। ডাকবাংলো আর চট্টিতে যে তফাৎ তাই।
এতদিন পরও আমার স্পষ্ট মনে আছে লোকটি সঙ্গে যেতে যেতে তার মনের দুঃখ আমাকে বলেছিল। তার ছেলেটি ম্যাট্রিক পাস করেছে, কিন্তু পয়সার অভাব বলে কলেজে ঢুকতে পারেনি।
আমি তো অবাক। তিন-তিনটে ভাষা জানে। শিক্ষিত লোক বলেই মনে হচ্ছে। ফিটফাট ইউনিফর্ম না হয় সরকারই দিয়েছে, কিন্তু তেমন কিছু গরিব বলে তো মনে হচ্ছে না। তবে কি এদেশেও গরিব লোক আছে।
বাকি কথা পরে হয়েছিল। হসপি কাছেই। পৌঁছে গিয়েছি।
পুলিশ মোকামে পৌঁছে দিল এই তো বিস্তর। কিন্তু এ লোকটি শক্ৰমিত্রে তফাৎ করে না। শত্রুর শেষ করতে হয়– শাস্ত্রে বলে– এ লোকটি মিত্রেরও শেষ ব্যবস্থা দেখে যেতে চায়। হোটেলওলার সঙ্গে আলাপচারী করে সুব্যবস্থা করে দিল। আমি ভাবলুম, এবারে বোধহয় আমার খাটের পাশে বসে ঘুমপাড়ানিয়া গান গাইবে।
যাবার সময় আমি বললুম, আপনার নাম কী?
একখানা ভিজিটিং কার্ড বের করে দিলে।
পুলিশম্যানেরও ভিজিটিং কার্ড!
আমি শুধালুম, এদেশের সব পুলিশই কি ইংরেজি-ফরাসি বলতে পারে?
বললে, আদপেই না। তার পর একটা ব্যাজ দেখিয়ে বললে, যাদের গায়ে এই ব্যাজ থাকে তারা একাধিক ভাষা বলতে পারে। যার ব্যাজে যতটা ফুটকি, সে ততটা ভাষা জানে। আমার ব্যাজে তিনটে।
ধন্যবাদ দেবার মতো ভাষা খুঁজে পাইনি।
পরে জানলুম, একাধিক ভাষা জাননেওলা পুলিশ বিরল– আমার কপাল ভালো যে প্রথম ধাক্কাতেই তারই একজন জুটে গিয়েছিল।
.
চাটুয্যে অতিশয় সুদর্শন পুরুষ। সুন্দর ঢেউখেলানো চুল। বর্ণটি উজ্জ্বল শ্যাম। চোখ দুটি স্বপ্নালু ঘন আঁখিপল্লব যেন অরণ্যানীর স্নিগ্ধচ্ছায়া নির্মাণ করেছে। সাধারণ বাঙালির চেয়ে কাঁধ অনেক বেশি চওড়া বুকের পাটা রীতিমতো জোরদার। কোমরটি সরু– প্রায় মেয়েদের মতো। সেই চওড়া বুক নিয়ে পাখির চলনের মধ্যে যে একটা দ্বন্দ্ব থাকত তাকে দ্বন্দ্বমধুর বলা যেতে পারে।
কিন্তু বার্লিনের ভারতীয় মহল এবং তার রায়ত-প্রজাদের ভিতর সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল তার আহনুলম্বিত দুটি মোলায়েম আকুঞ্চিত জুলপি খ্যাতিতে হিন্ডেনবুর্গের গোপের সঙ্গে এরা তাবৎ বার্লিনে পাল্লা দিত। জর্মন ভাষায় জুলপিকে বলে কাটলেট। হিন্দুস্তান হৌস রেস্তোরাঁয় চাটুয্যে খাবার কাটলেটের অর্ডার দিলে আমাদের ঠিকে বামনী রঙ করে বলত, দুটো কাটলেটের জন্য একটা কাটলেট, প্লিজ! সেই বামনী থেকে আরম্ভ করে বার্লিন সমাজের মশাইমোড়ল সবাই তাঁর নামে অজ্ঞান। চেহারা ছাড়া তার আরও দুটো কারণ ছিল। অতিশয় নম এবং স্বল্পভাষী। হাঙ্গামহুজ্জত অপচ্ছন্দ করতেন বলে দিন-যামিনীর অধিকাংশ তার কাটত হিন্দুস্তান হৌসের সুদূরতম কোণের বৃহত্তম সোফার নিবিড়তম আশ্রয়ে। ব্যসনের মধ্যে ছিল অবরে-সবরে বিপ্লবী নলিনী গুপ্তের সঙ্গে এক গেলাস অতি পানসে বিয়ার পান। এ স্থলে বলে রাখা ভালো যে, বিয়ার পান বার্লিনে ব্যসন নয়। খাঁটি খানদানি বার্লিনবাসী ভিরমি গেলেও তার গলা দিয়ে জল গলানো যায় না, এবং মৃতজনের মুখে বিয়ার পাত্র ধরলে সে চুকুস চুকুস করে দিব্য চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আর চাটুয্যে ছিলেন মি, বার্লিন নম্বর ওয়ান।
খুব যে শক্তিশালী ছিলেন তা নয়, কিন্তু পরনে সবসময়ই সুরুচিসম্মত সুট-টাই। ফরাসি মহিলাদের সঙ্গে সেদিক দিয়ে তাঁর মিল ছিল। শুনেছি, ইংরেজ রমণীর নাকি ক্ষোভ, ফরাসিনী কী করে এত অল্প খরচে এত সুন্দর জামাকাপড় পরে। কাঁচা বউ যে রকম পাকা শাশুড়ির কম তেল-ঘিয়ে রান্না করা দেখে অবাক হয়।
