দি সেইন্ট খোলা গেট দিয়ে গম্ভীর মুখে বের হয়ে গেল। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললাম, আপদ বিদেয় হয়েছে। বাঁচা গেছে। ছোট বোন বলল, আপদ মোটেই বিদেয় হয় নি। আপদ হাওয়া খেতে গেছে। হাওয়া খেয়ে ফিরবে। পল ফিরল না। সন্ধ্যার পর থেকে আমাদের খারাপ লাগতে লাগল। আমার মা বললেন, আহা, বেচারা বোকাসোকা–কোথায় আছে কে জানে? আমি বললাম, যাবে কোথায়, খিদে লাগলে নিজেই আসবে।
দি সেইন্ট এল না। পরদিন আমরা খুঁজতে বেরুলাম। কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। সম্ভব-অসম্ভব সব জায়গা দেখা হলো। সে নেই। একটি সামান্য কুকুর আমার কঠিন কথায় মর্মাহত হতে পারে তা আমার ধারণার বাইরে ছিল। আমার নিজেরও খুব মন খারাপ হলো। ত্রিশ টাকা খরচ করে কুমিল্লা শহরে মাইক দিয়ে ঘোষণা দেওয়া হলো একটি কালো রঙের দেশি কুকুর হারানো গিয়াছে। কুকুরটার ডান কান সাদা। সে আমলে ত্রিশ টাকা অনেক টাকা। সামান্য কুকুরের জন্যে ত্রিশ টাকা খরচ করার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। তবু খরচ করা হলো। তাতেও লাভ হলো না।
প্রায় এক বছর পর দি সেইন্ট এল। তবে একা না। তার সঙ্গে চারটি ফুটফুটে বাচ্চা। বাচ্চাগুলো কী যে সুন্দর–শুধু তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছা করে। আমি তখন ঢাকায়। আমাকে টেলিগ্রাম করা হলো–আমি ক্লাস বাদ দিয়ে কুমিল্লায় চলে এলাম। পলার সামনে দাঁড়িয়ে আন্তরিকভাবেই বললাম, পলা, তুমি যে তোমার বাচ্চাদের নিয়ে এসেছ এতে আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি। আমি আমার ব্যবহারের জন্যে লজ্জিত। যতদিন ইচ্ছা তুমি এ বাড়িতে থাকতে পার।
পলা উঠে এসে আমার পায়ের কাছে শুয়ে পড়ল। ঘেউ ঘেউ করে সে তার বাচ্চাগুলোকে কী যেন বলল, বাচ্চারা চোখ বড় বড় করে আমাকে দেখতে লাগল। হয়ত তার মা বলেছে মানুষটাকে দেখে রাখ। একে যতটা খারাপ ভাবা গিয়েছিল–এ ততটা খারাপ না।
পলা তার বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের বাসাতেই থেকে গেল। তার বাচ্চারা মার মতো হয় নি। এরা সবাই দুর্দান্ত সাহসী। অপরিচিত কেউ আমাদের বাসায় বাচ্চাগুলোর জন্যে ঢুকতে পারত না। তারা একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ত। সে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য! তার চেয়েও অবিশ্বাস্য দৃশ্য হচ্ছে–গান বাজলেই সব কটা বাচ্চা এক সঙ্গে ছুটে এসে হিজ মাস্টারস ভয়েসের কুকুরের মতো গম্ভীর ভঙ্গিতে কান উঁচু করে বসে থাকত। তাদের চোখের পলক পড়ত না। যতক্ষণ গান বাজতো ততক্ষণ এরা কেউ নড়তো না।
একজীবনে কত অদ্ভুত দৃশ্যই না দেখলাম!
হোটেল আহমেদিয়া
আমি একবার একটা ভাতের হোটেল দিয়েছিলাম। নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে হোটেলের নাম–আহমেদিয়া হোটেল। আসুন, আপনাদের সেই হোটেলের গল্প বলি।
১৯৭১ সনের কথা। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়। রোজার মাস। থাকি মহসিন হলে ৫৬৪ নম্বর রুমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলি তখন ছাত্রদের জন্যে নিরাপদ বলে ভাবা হত। কারণ যারা এই সময়ে হলে থাকবে তারা অবশ্যই পাকিস্তান অনুরাগী। হলে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করছে। এরা সবাই শান্ত এবং সুবোধ ছেলে। মুক্তিবাহিনীতে না গিয়ে পড়াশোনা করছে। আমার তখন কোথাও থাকার জায়গা নেই। নানার বাড়ি মোহনগঞ্জে অনেক দিন লুকিয়ে ছিলাম। আর থাকা যাচ্ছে না। আমার নানাজান। দীর্ঘদিনের মুসলিম লীগ কর্মী। তখন শান্তি কমিটির সভাপতি হয়েছেন। নানাজানের শান্তি কমিটিতে যোগ দেবার ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করছি। আমি আমার নানাজনের জন্যে সাফাই গাইছি না। আমার সাফাইয়ের তাঁর প্রয়োজন নেই। তবু সুযোগ যখন পাওয়া গেল বলি। চারদিকে তখন ভয়ংকর দুঃসময়। আমার বাবাকে পাকিস্তানী মিলিটারী গুলি করে হত্যা করেছে। নানাজান আমাদের সুদূর বরিশালের গ্রাম থেকে উদ্ধার করে নিজের কাছে নিয়ে এসেছেন। তাও এক দফায় পারেননি। কাজটি করতে হয়েছে দু’বারে। তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাকে শান্তি কমিটির সভাপতি করা হল। তিনি না বলতে পারলেন না। না বলা মানেই আমাদের দু ভাইয়ের জীবন সংশয়। আমাদের আশ্রয় সুরক্ষিত করার জন্যেই মিলিটারীদের সঙ্গে ভাব রাখা তিনি প্রয়োজন মনে করেছিলেন। তার পরেও আমার মা এবং আমার মামারা নানাজানের এই ব্যাপারটি সমর্থন করতে পারেননি। যদিও নানাজানকে পরামর্শ দিতে কেউ এগিয়ে আসেননি। সেই সাহস তাদের ছিল না। তারা নিজেদের সমর্পণ করেছিলেন নিয়তির হাতে। শান্তি কমিটিতে থাকার কারণে মিলিটারীদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কত মানুষের জীবন তিনি রক্ষা করেছেন সেই ইতিহাস আমি জানি এবং যারা আজ বেঁচে আছেন তাঁরা জানেন। গুলির মুখ থেকে নানাজানের কারণে ফিরে-আসা কিছু মানুষই পরবর্তী সময়ে তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁকে মরতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। তাঁর মত অসাধারণ একজন মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মারা গেলেন, এই দুঃখ আমার রাখার জায়গা। নেই!
মিলিটারীরা নানাজানকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি। হঠাৎ হঠাৎ অদ্ভুত সময়ে তার বাড়িতে উপস্থিত হয়। বাড়ি ঘুরেফিরে দেখে। একদিন তারা আমাদের দেখে ফেলল। ভুরু কুঁচকে বলল, এরা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র? দেখে তো সে রকমই মনে হয়। এরা বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে ঘরে বসে আছে কেন? নানাজান কোন সদুত্তর দিতে পারলেন না। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, ঢাকায় পাঠাতে ভরসা পাচ্ছি না বলে আটকে রেখেছি। তবে শিগগিরই ঢাকা পাঠাব।
