আরো একটি কুকুরের কথা বলি। প্রায় তেইশ বছর আগের কথা। আমার বাবার তখন কুমিল্লায় পোস্টিং। আমাদের বাসা ঠাকুরপাড়ায়। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ছুটিছাটায় কুমিল্লা যাই। ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফিরে আসি। সেবারও তা-ই গিয়েছি। ছুটির পুরো সময়টা আমি বাসাতেই থাকিবই পড়ে এবং গান শুনে সময় কাটাই। গান শোনার রোগ তখন খুব মাথাচাড়া দিয়েছে। বাবা একটি রেকর্ড প্লেয়ার কিনে দিয়েছেন। দিনরাত সেটা বাজে। সবার কান ঝালাপালী।
কুমিল্লায় তখন একটাই রেকর্ডের দোকান। 78 RPM-এর ডিস্ক পাওয়া যায়। একদিন ওই দোকানে গিয়ে রেকর্ড খুঁজছি, বাজিয়ে বাজিয়ে দেখছি, কোনটা নেওয়া যায়। কোনো গানই মনে ধরছে না। হঠাৎ লক্ষ করলাম, দোকানের বাইরে কালো রঙের একটা কুকুর বসে বসে গান শুনছে। হিজ মাস্টারস ভয়েস রেকর্ডের কুকুরের সঙ্গে এই কুকুরটির খুব মিল। বসেও আছে ঠিক সেই ভঙ্গিতে। আমি দোকানদারকে বললাম, এই কুকুরটি কি প্রায়ই আপনার দোকানে গান শুনতে আসে? দোকানদার মহাবিরক্ত হয়ে বলল, কুকুর গান শুনতে আসবে কেন? কী বলেন এইসব? দোকানদারের বিরক্তির প্রধান কারণ হচ্ছে–আমি শুধু তার রেকর্ড বাজিয়ে যাচ্ছি, কিনছি না। তা ছাড়া গান শুনতে কুকুর আসে–এই বাক্যটি বোধহয় তাকে আহত করল। রেকর্ডের দোকানের কর্মচারীদের মান-অপমান বোধ তীব্র হয়।
যা-ই হোক, দোকান থেকে বের হয়ে আমি কুকুরটাকে বললাম, গান শুনতে চাইলে আমার সঙ্গে চল। সে আমাকে বিস্মিত করে আমার সঙ্গে রওনা হলো। আমি বাসায় এসে ঘোষণা করলাম, সংগীতপ্রেমিক এক কুকুর নিয়ে এসেছি। গান শুনলে সে পাগল হয়ে যায়। কেউ তেমন উৎসাহ বোধ করল না। আমার ছোটবোন বলল, এমন নোংরা কুকুর সে নাকি তার জীবনে দ্বিতীয়টি দেখে নি। আমি বললাম, লাইফবয় দিয়ে একটা গোসল দিলেই চেহারা ফিরে যাবে। রেকর্ড প্লেয়ার বাজালে দেখবি কী কাণ্ড ঘটে! সংগীতের সে বিরাট সমঝদার।
লাইফবয় সাবান কিনে এনে তাকে গোসল দেওয়া হলো। সে কোনোরকম আপত্তি করলো না। খেতে দেওয়া হলো। খুব অনাগ্রহের সঙ্গে খেল। যেন খাওয়াটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। বেশ আয়োজন করে রেকর্ড প্লেয়ারে গান দেওয়া হলো। দেখা গেল গানের প্রতি তার কোনো আগ্রহই নেই। সে হাই তুলে কুণ্ডুলি পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। আমার ছোটবোন বলল, আধুনিক গান বোধহয় সে পছন্দ করছে। না। ক্লাসিক্যাল বেইজ-এর কিছু বাজাও। অনেক কিছুই বাজানো হলো। আধুনিক, হিন্দি, গজল, রবীন্দ্রসংগীত। অবস্থার উনিশ—বিশ হলো না। সংগীত-রসিক হিসেবে বাড়িতে ঢুকে সে স্থান করে নিল বেরসিক হিসেবে। তার সব কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রইল খাওয়া এবং ঘুমে। অন্য কিছুই করে না। কুকুর সম্প্রদায়ের প্রধান যে দায়িত্ব-অপরিচিত কেউ এলে ঘেউ ঘেউ করা–সেই সামান্য দায়িত্ব পালনেও তার ঘোর অনীহা। অপরিচিত কেউ এলে সে যা করে–তা হচ্ছে মাথা উঁচু করে খানিকক্ষণ দেখে, তারপর এক দৌড়ে বাড়ির ভেতরে বারান্দায় চলে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। শুধু পালিয়ে বেড়ায় বলেই তার নাম হলো পলা। [এই পলার উল্লেখ আমার প্রথম গ্রন্থ নন্দিত নরক-এ আছে। রুনু বলছে দাদা, আমাদের পলার নাকটা এত ঠান্ডা কেন?]
খেয়ে খেয়ে এবং ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পলার চেহারা ফিরে গেল কিন্তু সাহস বাড়ল। বরং সাহস কমে গেল–সে বিড়াল দেখলে ভয় পায়, ইঁদুর দেখলে ভয় পায়। মায়ের পোষা মোরগ নিয়মিত তাকে ঠোকর দিয়ে যায়। সে বিরক্ত হয়, কিন্তু রাগ করে না। ঘোঁৎ জাতীয় শব্দ করে, যার মানে হচ্ছে–কেন বিরক্ত করছ? দেখছ না ঘুমুচ্ছি? আমাদের একসময় ধারণা হলো–বেশি খাবার খেয়ে এর এই দশা হয়েছে। পেটে খিদে থাকলে এদের শরীরে রাগ আসে–ঘেউ ঘেউ করে। পলাকে পুরো একদিন উপোস রাখা হলো। তাতে সে মোটেই বিচলিত হলো না। খাবারের সন্ধানে বাইরে কোথাও গেল না। তার মুখের ভাব দেখে মনে হলো–নিয়তিকে সে গ্রহণ করেছে সহজভাবেই। কে জানে সে হয়তো কুকুর সম্প্রদায়ের অতি উঁচু স্তরের একজন সাধু।
পলা নাম বদলে তার নতুন নামকরণ হলো–দি সেইন্ট। ছুটি কাটিয়ে আমি ঢাকায় ফিরে এলাম। গরমের ছুটিতে আবার গেলাম। এই তিনমাসে দি সেইন্টের, স্বাস্থ্যের অনেক উন্নতি হয়েছে, তবে সাহসের কোনো উন্নতি হয় নি। বাইরের কেউ এলে আগের মতো দৌড়ে ভেতরে চলে আসে। তবে নিজের অধিকার সম্পর্কে সে দেখলাম এবার বেশ সজাগ। যথাসময়ে খাবার না দিলে রান্নাঘরে ঢুকে মা’র শাড়ির আঁচল কামড়ে ধরে। তবে নিজ থেকে কখনো কোনো খাবারে মুখ দেয় না।
সবচেয়ে যা দুঃখজনক তা হলো, গান বাজালে তার ঘুমের অসুবিধা হয় বলে সে বড় বিরক্ত হয়। উঠে চলে যায়।
একদিন এক কাণ্ড হলো। মুরগি কাটা হচ্ছে। দি সেইন্ট থাবা মেলে মা’র মুরগি কাটা গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখছে। এমন সময় টেলিফোন ধরার জন্যে মা মুরগি রেখে ভেতরে গেলেন। ফিরে এসে দেখেন দি সেইন্ট ঠিক আগের মতোই থাবা মেলে বসে আছে। কোত্থেকে এক বিড়াল এসে কাটা মুরগি কামড়াচ্ছে। দি সেইন্ট কিছুই বলছে না। সম্ভবত তার ভদ্রতায় বাধছে। মা আমাকে ডেকে বললেন, তুই এই যমের অরুচিকে যেখান থেকে এনেছিস সেখানে ছেড়ে দিয়ে আয়।
আমি মার মতোই রাগলাম এবং দি সেইন্টের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললাম, ফাজিলের ফাজিল–তুমি বিদায় হয়ে যাও। আর কোনোদিন যেন তোমার ছায়া না দেখি। অপদার্থ কোথাকার!
