আমি নিজেও এক জায়গায় বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করে একটি চিঠি পাঠিয়েছি ৬ নম্বর সেক্টরের সালেহ চৌধুরীকে (দৈনিক বাংলার সালেহ চৌধুরী)। তিনি তখন ভাটি অঞ্চলে প্রবল। প্রতাপে মুক্তিবাহিনী নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি আমার চিঠির জবাব দিলেন না। এটা অবশ্যি আমার জন্যে ভালই হয়েছে। মনের দিক থেকে আমি চাচ্ছি না জবাব আসুক। জবাব এলেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে হবে, এবং অবধারিতভাবে মিলিটারীর গুলি। খেয়ে মরতে হবে। এত তাড়াতাড়ি মৃত্যুকে স্বীকার করে নেবার মত মানসিক প্রস্তুতি আমার ছিল না। আমি ভীতু হয়ে জন্মেছি।
কাজেই চলে এলাম ঢাকায়, উঠলাম হলে। বলা চলে, হাঁপ ছেড়ে বাচলাম। আমার অতি প্রিয়জন–আনিস ভাইও দেখি হলেই আছেন। আমার পাশের ঘরে থাকেন। ফিজিক্সে পড়াশোনা বাদ দিয়ে তিনি তখন সিনেমা নিয়ে পড়াশোনা করেন, একটা চিত্রনাট্যও তৈরি করেছেন। তার একটা দামী ট্রানজিস্টার রেডিও আছে। সেই ট্রানজিস্টার রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা শোনা হয়। রাত যখন গম্ভীর হয় তখন আমরা চলে যাই ছ’তলায়। সেখানে দুটি ছেলে আছে (দু’ভাই)। তারা প্ল্যানচেটের বিষয়ে না-কি বিশেষজ্ঞ। তারা প্ল্যানচেটে ভূত নামায়। ভূতের মারফতে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। কবে দেশ স্বাধীন হবে, এইসব। প্ল্যানচেটে দেশী বিদেশী সবধরনের ভূত আসে। দেশী ভূতদের মধ্যে সবাই আবার ভুবন বিখ্যাত। তাদের ভূত না বলে আত্মা বলা উচিত। নয়ত তাদের অসম্মান হবে। যেমন রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, শেরে বাংলা। এঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ খুবই মিশুক প্রকৃতির, ডাকলেই চলে আসেন। দেশ কবে স্বাধীন হবে জানতে চাইলে বলেন–ধৈর্য ধর। ধৈর্য ধরতে শেখ। দু থেকে তিন বছরের মধ্যেই স্বাধীনতা পাবে।
রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার উপর আমাদের আস্থা কম ছিল বলেই বোধহয় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকেও এক রাতে আনা হয়। তিনি এসেই আমাদের স্টুপিড, ননসেন্স বলে গালাগালি করতে থাকেন।
মোটের উপর আমাদের সময়টা ভাল কাটে। ভূত বিশেষজ্ঞ দুই ভাই পরকাল, আত্মা, সৃষ্টিকর্তা বিষয়ে নানান জ্ঞান দেয়, শুনতে মন্দ লাগে না। সবচে’ বড় কথা–মিলিটারী এসে ধরে নিয়ে মেরে ফেলবে, এই সার্বক্ষণিক ভয়ের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি যার আনন্দ কম নয়। কষ্ট একটাই, খাওয়ার কষ্ট। রোজার সময় বলেই সব দোকান বন্ধ। হোটেল তো বন্ধই, চায়ের দোকানও বন্ধ। হলের মেসও বন্ধ। ধর্মীয় কারণে নয়, নিতান্ত বাধ্য হয়েই হলের অনেকেই রোজা রাখছে। সেখানেও বিপদ আছে। বিকেলে ইফতারী কিনতে নিউমার্কেট গিয়ে একজন মিলিশিয়ার হাতে বেধড়ক মার খেল। মিলিশিয়ার বক্তব্য–রোজার দিনে এই ছাত্র নাকি ‘ছোলা ভাজা খাচ্ছিল।
আমি নিজে ক্ষুধা সহ্য করতে পারি না। খিদে পেলেই চোখে অন্ধকার দেখি। অল্প বয়সের ছেলেমেয়েরা প্রথম এবং শেষ রোজা রেখে রোজা বেঁধে ফেলার যে প্রক্রিয়া করে, আমি তা-ও পারি না। প্রথম রোজাটা রাখি–শেষটা রাখি না, সম্ভব হয় না।
আমি মহাবিপদে পড়লাম। দুপুরে চিনি দিয়ে পাউরুটি খাই–খিদে যায় না। সারাক্ষণ খিদে লেগে থাকে। একদিন দোকান থেকে একটা হিটার কিনে আনলাম, টিনের বাটিতে কিছু চাল ফুটিয়ে নিলাম। ডিম ভাজলাম। লবণ কেনা হয়নি–লবণহীন ডিম ভাজা দিয়ে ভাত খেলাম। অমৃতের মত লাগল। আনিস ভাই এসে আমার সঙ্গে যোগ দিলেন। পরের দিন ভূত বিশেষজ্ঞ দুই ভাই এসে উপস্থিত। তারা জানতে চায়, তাদের কাছে এলুমিনিয়ামের একটা বড় সসপ্যান আছে, আমরা সেটা চাই কি-না।
আমি বললাম, অবশ্যই চাই।
তখন দুই ভাই মাথা চুলকে বলল, তারা কি আমার সঙ্গে খেতে পারবে? খরচ যা লাগবে দেবে। তারাও নাকি দুপুরে পাউরুটি খেয়ে আছে।
আমি বললাম–অবশ্যই খেতে পারবে।
চতুর্থ দিনে আমাদের সদস্য সংখ্যা হল দশ। অতি সস্তায় দুপুরের খাওয়া। ভাত ডাল এবং ডিম ভাজি। সবাই খুব মজা পেয়ে গেল। আসলে কারোরই তখন কিছু করার নেই। বিশ্ববিদ্যালয় নামে মাত্র খোলা, কেউ সেখানে যায় না। সবাইকে হলে বন্দী থাকবে হয়। বন্দি জীবনে বৈচিত্র্য হল এই রান্নাবান্না খেলা। আমরা একদিন একটা বড়
ফুলস্কেপ কাগজে লিখলাম–
আহমেদিয়া ভাতের
হোটেল ভাত এক টাকা। ডাল আট আনা। ডিম এক টাকা।
হোটেলের নিয়মাবলী :
১. যাহারা খাদ্য গ্রহণ করিবেন, তাঁহারা সকাল দশটার মধ্যে নাম এন্ট্রি করাইবেন।
২ খাওয়ার সময় ভাত নরম না শক্ত এই বিষয়ে কোন মতামত দিতে পারিবেন না।
ফুলস্কেপ কাগজে আমার ঘরের দরজায় আঠা দিয়ে সেঁটে দেয়া হল।
এক রোববারে ইমপ্রুভ ডায়েটের ব্যবস্থা হল। ভূনা খিচুড়ি এবং ডিম ভাজা। ভূনা খিচুড়ি কি করে রাখতে হয় তখন জানি না। ভূত বিশেষজ্ঞ দুই ভাই বলল, তারা জানে–খিচুড়ি তারা বঁধবে। এই বিষয়ে কাউকে কোন চিন্তা করতে হবে না। শুধু খিচুড়ি না–তারা নাকি ‘কলিজিও ব্রাধবে।
সকাল থেকে রান্নার আয়োজন শুরু হল। সদস্যদের আগ্রহের সীমা নেই। রান্না শেষ হতে হতে দুটো বেজে গেল। আমরা খেতে বসব, তখন হঠাৎ একজন ছুটে এসে বলল, মিলিটারী হল ঘেরাও করে ফেলেছে। আমরা হতভম্ব। হল কেন ঘেরাও করবে? হল তো খুব নিরাপদ হবার কথা। দেখতে দেখতে হলে মিলিটারী ঢুকে পড়ল। ভেড়ার পালের মত আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেল নিচে। সবাইকে লাইন বেঁধে দাঁড় করালো। আমরা আতংকে জমে গেলাম। কি হচ্ছে এসব? সব মিলে চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ জন ছাত্র। হলের কিছু কর্মচারী। হলের সামনে সাক্ষাত মৃত্যুদূতের মত একটি মিলিটারি জীপ, একটি ট্রাক এবং মুড়ির টিন জাতীয় গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মুড়ির টিন গাড়িটির দরজা-জানালা সব বন্ধ। তবে ভেতরে লোক আছে। কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। গাড়ির একটি ছোট্ট জানালা আধখোলা। জানালার ওপাশে কেউ একজন বসে আছে। বাইরে থেকে আমরা তাকে দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের বলা হল লাইন বেঁধে সেই জানালার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে। জানালার সামনে দিয়ে যাবার সময়–গাড়ির ভেতরে বসা কেউ একজন হঠাৎ বলে বসে–একে আলাদা কর। তাকে আলাদা করা হয়। এইভাবে চারজনকে আলাদা করা হল। তিন জন ছাত্র। একজন হলের কর্মচারী। তিনজন ছাত্রের মধ্যে একজন আমি।
