ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাণী হিসেবে কুকুর গ্রহণযোগ্য না, বিড়াল গ্রহণযোগ্য। ছোটবেলায় নানীজান বলতেন, খবরদার, বিড়ালের গায়ে হাত তুলবি না। বিড়াল নবীজির খুব পেয়ারা জানোয়ার। নবীজি বেড়ালের গায়ে হাত বুলাতেন। ধর্মীয় ট্যাবু সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে কিন্তু কুকুরের আদর বিড়ালের চেয়ে বেশি।
গ্রামের একটি প্রচলিত গল্পে তার প্রমাণ মেলে। গল্পটি হলো, কুকুর সব সময় প্রার্থনা করে গৃহস্থের সাত ছেলে হোক। সাত সাতটা ছেলে হলে তারা ফেলে-ছড়িয়ে ভাত খাবে! সেখান থেকে সে ভাগ পাবে। আর বিড়াল বলে, গৃহস্থ অন্ধ হোক। অন্ধ হলে গৃহস্থ বুঝবে না–কোন খাবার কোথায়। এই ফাঁকে সে খেয়ে যাবে।
কুকুর প্রাণীটির প্রতি আমার তেমন কোনো মমতা নেই। র্যাবিজ ক্যারিয়ার হিসেবেই আমি কুকুরকে দেখি। বগুড়ায় আমি জলাতঙ্কের এক রোগীকে দেখেছিলাম। না দেখলেই ভালো ছিল। ভয়াবহ দৃশ্য! রোগীর কষ্টের বর্ণনা দিচ্ছি না। দেওয়া সম্ভবও না। মনে আছে রোগীর বাবা কাঁদতে কাঁদতে সবাইকে বলছিলেন, আপনারা দোয়া করেন যেন আমার ছেলেটা তাড়াতাড়ি মরে যায়।
পঁচিশ বছর আগের দেখা ছবি এখনো দুঃস্বপ্নের মতো মনে পড়ে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। যে প্রাণী এই ভয়াবহ ব্যাধির ভাইরাস বহন করে তার প্রতি মমতা থাকার কথাও না। তারপরেও কিছু গোপন ভালোবাসা এই প্রাণীটির প্রতি আমার আছে। আমার সবচেয়ে ছোট ভাইটির জীবন একটি কুকুর তার নিজের জীবনের বিনিময়ে বাঁচিয়েছিল। সেই স্মৃতি ভোলা বা ভোলার চেষ্টা করা অন্যায়।
.
অরণ্যচারী মানুষের প্রথম সঙ্গী হলো কুকুর। মানব জাতির ঊষালগ্নে এই সাহসী পশু তার পাশে এসে দাঁড়াল, মানুষকে শক্তি ও সাহস দিল। মানুষকে বলল, আমি আছি। আমি তোমার পাশেই আছি। এখনো গভীর রাতে কোনো নিঃসঙ্গ মানুষ রাস্তায় হাঁটলে কোত্থেকে একটা কুকুর এসে তার পাশে পাশে চলতে থাকে।
কুকুর প্রসঙ্গে আমার নিজের অভিজ্ঞতার দুটি গল্প বলি :
শহীদুল্লাহ হলে থাকাকালীন ঘটনা। একদিন দুপুরবেলা ঠিক ভাত খাবার সময় কে যেন দরজা ধাক্কাতে লাগল। কলিংবেল টিপছে না, দরজা ধাক্কাচ্ছে–কাজেই ধরে নিলাম ভিক্ষুক। দুপুরবেলা ভাত ভিক্ষা চাওয়ার জন্যে খুব ভালো সময়। আমি দরজা খুলে দেখি বিশাল এক কুকুর। আমাদের দেশি কুকুর এত বড় হয় না। আমি কুকুটাকে কিছু খাবার দিতে বললাম। খাবার দেওয়া হলো। সে খাওয়াদাওয়া করে চলে গেল। পরদিন আবার এল–সেই দুপুরবেলা। আবারও খাবার দেওয়া হলো। তারপর সে আসতেই থাকল। আমার ছোট মেয়ে একদিন বলল, বাবা দেখ, কুকুটা ঠিক দুটোর সময় আসে।
কুকুরের নিশ্চয়ই হাতঘড়ি নেই। ঘণ্টা-মিনিট মিলিয়ে তার খেতে আসার কথা নয় দেখা গেল এই কুকুরটা তা-ই করছে। ঠিক দুটোর সময়ই আসছে। সময় সম্পর্কে প্রাণিজগতের নিশ্চয়ই সে রকম কোনো ঘড়ি আছে, যা ব্যবহার করে ঠিক দুটোর সময় চলে আসে।
এই অদ্ভুত ঘটনা কিছু নিমন্ত্রিত বন্ধু-বান্ধবকে দেখিয়ে তাদের চমৎকৃত করা হলো।
ব্যাপার এমন হলো–ঠিক দুটো বাজতেই আমরা অপেক্ষা করি–কখন সে আসবে। সবদিন আসেও না। মাঝে মাঝে এমন হয়েছে পর পর চার-পাঁচদিন দেখা নেই। তারপর একদিন সে উপস্থিত। দরজায় মাথা দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে। ঘড়িতে বাজছে দুটো। কোথায় সে থাকে–তা-ও জানি না। যেখানে থাকুক সে যে কষ্টে নেই তা বোঝা যায় তার স্বাস্থ্য দেখে। মনে হয় না সে কখনো ক্ষুধার্ত থাকে, কারণ প্রায়ই দেখা গেছে, দুপুরে সে আসছে ঠিকই কিন্তু কিছু মুখে দিচ্ছে না। যেন সে দেখা করার জন্যেই এসেছে। খাবার জন্যে আসে নি।
আমরা কুকুরটার একটা নাম দিলাম, দি ওয়ান্ডারার-পরিব্রাজক। কুকুরদের বাংলা নাম মানায় না বলেই ইংরেজি নাম। তারপর হঠাৎ একদিন দি ওয়ান্ডারার আসা বন্ধ করে দিল। দুপুর হলেই আমরা অপেক্ষা করি, সে আসে না। দুপুরে কেউ দরজা ধাক্কা দিলে আমার বাচ্চারা ছুটে যায়–না, দি ওয়ান্ডারার না–অন্য কেউ। নানা জল্পনা-কল্পনা হয়–কী হলো ওয়ান্ডারের? রাস্তায় গাড়িচাপা পড়ল? নাকি মিউনিসিপ্যালিটির লোকজন এসে তাকে ধরে নিয়ে গেল।
একদিন আমাদের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটল, দি ওয়ান্ডারার এসে উপস্থিত। তার চেহারা ভয়ংকর। মুখ দিয়ে লালা ঝরছে–চোখ রক্তবর্ণ, কিছুক্ষণ পরপর চাপা গর্জন। কালান্তক র্যাবিজ নিয়ে সে উপস্থিত। লোকজনের তাড়া খেয়ে সে ফিরে এসেছে পুরানো জায়গায় এবং আশ্চর্য, এসেছে ঠিক দুপুর দুটোয়। কুকুরের বুদ্ধি এবং কুকুরের আবেগ দিয়ে সে হয়ত ধারণা করেছে এই একটি বাড়িতে তার আশ্রয় আছে। এই বাড়ির লোকজন তাকে কিছু বলবে না। তাকে শান্তিতে মরতে দেবে।
আমরা দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে আছি। দরজার বাইরে দি ওয়ান্ডারার। মাঝে মাঝে তার চাপা হুংকার শোনা যাচ্ছে। সে দরজা আঁচড়াচ্ছে। পিপহোলে চোখ রাখলে। তার ভয়ংকর মূর্তি দেখা যায়। আমরা ঘরে আটকা পড়ে গেলাম। হলের দারোয়ানরা খবর পেয়ে লাঠি-সোটা নিয়ে ছুটে এল। দি ওয়ান্ডারারকে হলের সামনে পিটিয়ে মারা হলো–আমি আমার তিন কন্যাকে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে এই হত্যাদৃশ্য দেখলাম। দি ওয়ান্ডারার বারবারই তাকাচ্ছে আমাদের দিকে। তার চোখে ভয় নয়–তার চোখে রাজ্যের বিস্ময়। কিংবা কে জানে সবই হয়তো আমার কল্পনা–হয়তো কুকুররা বিস্মিত হয় না। মানুষদের নিষ্ঠুরতার সঙ্গে যুগ যুগ ধরেই তো তাদের পরিচয়। মানুষদের নিষ্ঠুরতায় তারা বিস্মিত হবে কেন?
