দেড় ব্যাটারী স্যার প্রচলিত প্রথার ব্যতিক্রম ছিলেন না, তবে একটি বিষয়ে অন্য স্যারদের সঙ্গে তার ঘোরতর অমিল ছিল। ছাত্রকে শাস্তি দেয়ার পর তার মন খারাপ হত। তীব্র অনুশোচনায় কাতর হতেন। প্রায়ই এমন হয়েছে যে শাস্তি প্রদানের পর তার রাগ পড়ে গেছে। ছাত্র ব্যথায় কাঁদছে, তিনিও অনুশোচনায় কাঁদছেন। বড়ই মজার দৃশ্য। এর মধ্যেই নানান কাণ্ড ঘটে যেত।
অস্বস্তির সঙ্গে বলছি–ছাত্র পড়ানো ছাড়া অন্য সব কাজ তিনি খুব চমৎকার পারতেন। সম্ভবত এই কারণে তাকে জটিল কোন ক্লাস দেয়া হত না। তিনি ড্রয়িং ক্লাস নিতেন, লাইব্রেরী ক্লাস নিতেন। ড্রীল করাতেন, অন্য স্যারদের অনুপস্থিতিতে হঠাৎ যদি তাকে অংক বা ভূগোল ক্লাসে আসতে হত–তিনি খুব বিমর্ষ বোধ করতেন। অংক ক্লাসে তিনি আমাদের নামতা ধরতেন। “বল দেখি তিন সাতে কত? না পারলে আজ কিন্তু কিয়ামত। অংক কিছু না, আসল জিনিস নামতা।” ভূগোল ক্লাসে ঢুকতেন একটা গ্লোব নিয়ে। করুণ চোখে গ্লোবটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তিনি সময় পার করে দিতেন।
আমরা এই স্যারকে নানাবিধ কারণে খুব পছন্দ করতাম। প্রথম কারণ, তিনি ক্লাসে কিছু পড়াতেন না এবং পড়া ধরতেন না। বাড়ির কাজ দিতেন, তবে দেখতেন না। দ্বিতীয় কারণ, তিনি আমাদের প্রত্যেকের নামে দু লাইন থেকে চার লাইনের ছড়া বলতেন। উদাহরণ দিয়ে বলি–আমার নাম হুমায়ুন। আমাকে দেখলেই বলতেন,
হুমায়ুন
তোমার নেই কোন গুণ।
আমাদের ক্লাসের ছাত্র হামিদ রেজা খানকে দেখলেই বলতেন–
হামিদ রেজা খান
রাখবে দেশের মান।
আমাদের স্কুলের দপ্তরী রাসমোহন। তাকে দেখলেও বলতেন–
রাসমোহন
তুমি আছ কেমন?
স্যারকে পছন্দ করার তৃতীয় কারণ হল–তিনি ছিলেন আমাদের সংগীত শিক্ষক। আমরা সব ছাত্র তাঁর লেখা এবং তার সুর দেয়া গান সমবেতভাবে গাইতাম, স্যার বিমলানন্দ উপভোগ করতেন। এইসব সংগীতের সবই গণসংগীত। একটা ছিল ছাদ পিটানো গান। আমরা বেঞ্চিতে দু’হাতে ছাদ পিটাবার মত করে থাবা দিতে দিতে গাইতাম–
ঘড়িতে দশটা বাজে
পাঁচটা কেন বাজে না বাবুজী।
বেঞ্চিতে হাত দিয়ে পরপর তিনবার শব্দ–ধপ, ধপ, ধপ]।
ঘড়িতে ১১টা বাজে।
পাঁচটা কেন বাজে না বাবুজী।
[ ধপ, ধপ, ধপ ]
ঘড়িতে ১২টা বাজে
পাঁচটা কেন বাজে না বাবুজী।
[ ধপ, ধপ, ধপ ]
এইভাবে ঘড়িতে পঁচটা বাজলে গান শেষ হত।
স্যারের নিয়ম ছিল ক্লাসে একজন অপরাধ করলে সবার শাস্তি পেতে হত। গণসংঙ্গিতের মতই গণশাস্তি। সে শাস্তিও খুব মজার। সবাইকে বেঞ্চির উপর উঠে দাঁড়াতে বলা হত। আমরা উঠে দাঁড়াতাম। স্যার বলতেন ওয়ান-টু-থ্রী …
আমরা এক সঙ্গে গানের সুরে বলতাম,
“অপরাধ করেছি।”
স্যার বলতেন থ্রী-টু-ওয়ান। আমরা বলতাম,
“ক্ষমা চাই।”
স্যার বলতেন–যা, ক্ষমা করলাম।
এমন একজন বিচিত্র মানুষকে পছন্দ না করার কোন কারণ নেই। সবচে বড় কথা হল–তিনিই ছিলেন একমাত্র শিক্ষক যিনি বলতেন–পড়াশোনাটা কোন বড় ব্যাপার না রে গাধা। ফার্স্ট সেকেন্ড হওয়াটা কিছু না। যে কেউ নিয়মমত পড়লে ফার্স্ট সেকেন্ড হবে। বড় ব্যাপার হল …।
বড় ব্যাপার কি তা স্যার বলতেন না। চিন্তিত মুখে আমাদের দিকে তাকাতেন। নিজের মাথা চুলকাতেন, ভুরু কুঁচকাতেন। সম্ভবত কোটি বড় ব্যাপার তা তার নিজের কাছেও স্পষ্ট ছিল না।
সেবার আমাদের ক্লাসের সবাই ফাঁইন্যাল পরীক্ষায় পাস করে সেভেনে উঠেছি। শুধু ফেল করেছে জামাল-কামাল দুই ভাই। দু’জনেই মহাবিচ্ছু। একবার পকেটে করে গুই সাপ নিয়ে এসেছিল। আমরা সবাই ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠলাম–জামাল কামাল দুই ভাই পুরোনো ক্লাসে পড়ে রইল এবং চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। তাদের দুঃখে ব্যথিত হয়ে কাঁদতে লাগলেন মুখলেস স্যার। স্যারের কান্নায় দ্রবীভূত হয়েই আমাদের হেড স্যার জামাল কামালকে প্রমোশন দিয়ে দিলেন। আনন্দে সবচে বেশি লাফালাফি করতে লাগলেন আমাদের স্যার। সেই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হল স্যারের ঘোষণায়। স্যার আমাদের ডেকে বললেন–তিনি আমাদের রেজাল্টে অত্যন্ত খুশি। সেন্ট পারসেন্ট পাস, এরকম কখনো হয় না। কাজেই উপহারস্বরূপ তিনি আমাদের সমুদ্র দেখিয়ে আনবেন। কক্সবাজার নিয়ে যাবেন, দু’ টাকা করে চাদা।
কক্সবাজার কোন হাতের কাছের ব্যাপার নয়, একশ মাইল দূরের পথ। দু’ টাকায় এত দূর যাওয়া, এক রাত থেকে ফিরে আসা কি করে সম্ভব আমি জানি না–স্যার যখন বলেছিলেন কোন একটা ব্যবস্থা হবেই। আমরা চাঁদার টাকা জোগাড় করবার জন্য। প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে লাগলাম। আমাদের সময় বাবা-মা’র কাছ থেকে টাকা বের করা কঠিন ব্যাপার ছিল।
একদিন সত্যি সত্যি পঁয়ত্রিশ জন ছেলেকে নিয়ে স্যার কক্সবাজার রওনা হলেন। মুড়ির টিন জাতীয় বাস। সেই বাস দুলতে দুলতে চলেছে। কিছু দূর গিয়ে অনেকক্ষণ থেমে থাকে। যাত্রী জোগাড় করে আবার হেলতে দুলতে চলে। আজকাল তিন ঘণ্টায় কক্সবাজার পৌঁছা যায়। তখন সময়ের কোন হিসাব ছিল না। আমরা সকাল ন’টায় রওনা হয়ে রাত দশটায় পৌঁছলাম। স্যার আমাদের সমুদ্রে নিয়ে গেলেন না–এক স্কুল ঘরে নিয়ে তুললেন। মেঝেতে চাটাই পেতে দেয়া আছে। চাটাইয়ের উপর খড় বিছানো। সেই খড়ের উপর চাঁদর। আমরা খিচুড়ি খেয়ে ঘুমুতে গেলাম। স্থানীয় স্কুলের হেডমাস্টার সাহেব আমাদের জন্যে খিচুড়ির ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। স্যার বলে দিলেন খুব ভোরে উঠতে হবে। ভোরে আমাদের সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাবেন, তবে কেউ সমুদ্রে নামতে পারবে না। কেউ যদি সমুদ্রে নামে–মেরে তক্তা বানিয়ে দেবেন। এতগুলি ছেলের দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন। তিনি একা মানুষ, ইত্যাদি ইত্যাদি।
