ভোরবেলায় সমুদ্র দেখতে গেলাম। সমুদ্র দেখে হকচকিয়ে গেলাম। আকাশের মত বিশাল কিন্তু নিঃস্তব্ধ নয়–প্রাণময়। এমন বিশাল এবং প্রায় জীবন্ত কিছু যে পৃথিবীতে থাকতে পারে তা ছেলেমানুষী কল্পনায় এর আগে কখনো আসেনি। সমুদ্রের তীব্র আকর্ষণী ক্ষমতা আছে। সে সারাক্ষণ ডাকে, আয় আয়–কাছে আয়। সেই আকর্ষণ অগ্রাহ্য করা সম্ভব হল না। স্যারের কঠিন নিষেধ ভুলে গিয়ে জুতা পায়ে ছুটে গেলাম–প্রায় হাঁটু পানিতে। স্যার এসে ঘাড় ধরে শূন্যে ঝুলিয়ে আমাকে নিয়ে এলেন। তারপর শুরু হল মার। কঠিন মার। সমগ্র স্কুল জীবনে আমি প্রচুর শাস্তি পেয়েছি–এমন কঠিন শাস্তি কখনো পাইনি। শারীরিক দুঃখের চেয়েও গভীর অপমানবোধ আমাকে আচ্ছন্ন করল। স্যার বললেন, এইখানে বসে থাকবি। সমুদ্রের দিকে তাকাবি না–উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়ে বোস। এখান থেকে এক পা নড়লে টান দিয়ে মাথা ছিঁড়ে ফেলব।
আমি সমুদ্রের কাছে এসে, সমুদ্রের উল্টোদিকে মুখ হয়ে বসে রইলাম, আমার বন্ধুরা মহানন্দে সমুদ্র দেখতে লাগল। দুপুর দশটায় বাসে করে চিটাগাং রওনা হব। সবাই বাসে উঠেছি। বাস ছাড়ার আগে আগে স্যার গিয়ে বাস ড্রাইভারের কানে কানে কি বললেন। তারপর এলেন আমার কাছে। আগের মতই হুংকার দিয়ে বললেন, নাম বাস থেকে। নাম বলছি।
আমি নামলাম। মনে হল শাস্তিপর্ব শেষ হয়নি। স্যার আমাকে সমুদ্রের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, খোল জুতা। জুতা খুলোম। স্যার আমার হাত ধরে হঠাৎ অসম্ভব কোমল গলায় বললেন–চল যাই সমুদ্রে। একবার ভাবলাম অভিমান দেখিয়ে বলি–‘না’। কিন্তু ইচ্ছা করল না। স্যারের হাত ধরে সমুদ্রে নামলাম। তিনি বললেন–ব্যাটা আমার উপর রাগ করিস না। একদল ছেলেকে নিয়ে এসেছি। এদের কেউ সমুদ্রে ভেসে গেলে সমস্যা না? তোকে শাস্তি দেয়া অন্যায় হয়েছে। ভুল হয়েছে। আমি মানুষ। আমি তো ভুল করবই। আমি কি ফেরেশতা যে আমার ভুল হবে না? তোর যতক্ষণ ইচ্ছা সমুদ্রে হাঁটাহাঁটি কর। আর আমার উপর রাগ খুব বেশি হলে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সমুদ্রে ফেলে দে। দেখি তোর কেমন শক্তি।
আমি স্যারের দিকে তাকিয়ে দেখি, স্যার তাঁর পুরোনো অভ্যাসমত কঁদতে শুরু করেছেন।
আমরা টাকা-পয়সা খরচ করে দূরের সমুদ্র দেখতে যাই, অথচ আমাদের আশেপাশের মানুষরাই বুকে সমুদ্র ধারণ করে ঘুরে বেড়ান। সেই সমুদ্র আমাদের চোখে পড়ে না।
.
পঁচিশ বছর পর স্যারের সঙ্গে আবার দেখা। তিনি আজিমপুর কবরস্থানের পাশের রাস্তা দিয়ে হনহন করে যাচ্ছেন। আগের মতই আছেন, শুধু আকাশের শাদা মেঘ ভর করেছে তার মাথার চুলে। তিনিই প্রথম আমাকে দেখলেন–চেঁচিয়ে ডাকলেন, হুমায়ূন না? হুমায়ূন, তোর নেই কো কোন গুণ। আরে গাধা, তুই কেমন আছিস?
সমুদ্র দেখলে সমুদ্রের জল স্পর্শ করতে হয়। আমি কদমবুছি করবার জন্যে নিচু হলাম। স্যার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। লক্ষ্য করলাম বয়সজনিত কারণে স্যারের কিছু পরিবর্তন হয়েছে। আগে আমাদের শাস্তি দিয়ে কাঁদতেন। এখন কাঁদছেন কোন শাস্তি না দিয়েই।
আমি বললাম, কেমন আছেন স্যার?
স্যার চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ভাল আছি রে ব্যাটা। ভাল আছি। প্রেসিডেন্ট মেডেল পেয়েছি, বুঝলি? বেস্ট টিচার হিসেবে প্রেসিডেন্ট মেডেল। কি হাস্যকর কথা। আমি নাকি বেস্ট টিচার! হা হা হা। তিনি হাসছেন। কিন্তু তার চোখ ভেজা।
সে
এরশাদ সাহেবের সময়কার কথা। সরকারি পর্যায়ে শিলাইদহে রবীন্দ্রজয়ন্তী হবে। আমার কাছে জানতে চাওয়া হল আমি সেই উৎসবে যোগ দেব কি-না।
আমি বললাম, রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে যে কোন নিমন্ত্রণে আমি আছি। এরশাদ সাহেবের উদ্যোগে অনুষ্ঠান হচ্ছে, হোক না, আমি কোন সমস্যা দেখছি না। রবীন্দ্রনাথকে ভালবাসার অধিকার সবারই আছে।
যথাসময়ে শিলাইদহে উপস্থিত হলাম। কুঠিবাড়িতে পা দিয়ে গায়ে রোমাঞ্চ হল। মনে হল পবিত্র তীর্থস্থানে এসেছি। এক ধরনের অস্বস্তিও হতে লাগল, মনে হল–এই যে নিজের মনে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। চারদিকে রবীন্দ্রনাথের পায়ের ধুলা ছড়িয়ে আছে। কবির কত স্মৃতি, কত আনন্দ-বেদনা মিশে আছে প্রতি ধূলিকণায়। সেই ধূলার উপর দিয়ে আমি হেঁটে যাব, তা কি হয়? এত স্পর্ধা কি আমার মত অভাজনের থাকা উচিত?
নিজের মনে ঘুরে বেড়াতে এত ভাল লাগছে! কুঠিবাড়ির একটা ঘরে দেখলাম কবির লেখার চেয়ার টেবিল। এই চেয়ারে বসেই কবি কত-না বিখ্যাত গল্প লিখেছেন। কুঠিবাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখে পড়ল কবির প্রিয় নদী প্রমত্তা পদ্মা। ১২৯৮ সনের এক ফাগুনে এই পদ্মার দুলুনি খেতে খেতে বজরায় আধশোয়া হয়ে বসে কবি লিখলেন,
শ্রাবণ গগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।
একদিকে উৎসব হচ্ছে, গান, কবিতা আলোচনা, অন্যদিকে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি নিজের মনে। সন্ধ্যাবেলা কুঠিবাড়িতে গানের অনুষ্ঠানে আমি নিমন্ত্রিত অতিথি, উপস্থিত না থাকলে ভাল দেখায় না বলে প্যান্ডেলের নিচে গিয়ে বসেছি। শুরু হল বৃষ্টি, ভয়াবহ বৃষ্টি। সেই সঙ্গে দমকা বাতাস। বাতাসে সরকারি প্যান্ডেলের অর্ধেক উড়ে গেল। আমি রওনা হলাম পদ্মার দিকে। এমন ঝমঝমে বৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথও নিশ্চয়ই ভিজতেন। আমি যদি না ভিজি তাহলে কবির প্রতি অসম্মান করা হবে।
