আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, দেখতে ইচ্ছা করেনি।
কেন দেখতে ইচ্ছা করেনি?
আমি তাজমহল সম্পর্কে এত শুনেছি যে দেখতে ইচ্ছা করে না। আমার নিজের কল্পনায় একটা তাজমহল আছে–সেই তাজমহল বাস্তবের চেয়ে সুন্দর বলে আমার ধারণা।
বুড়ি বলল, খুব ভুল বললে। বাস্তবের তাজমহল তোমার কল্পনার চেয়ে অনেক সুন্দর!
আমি বললাম, কি করে বলছ–আমার কল্পনার তাজমহল তো তুমি দেখনি! ।
আমি অনুমান করতে পারি। তুমি আমার উপদেশ শোন–একবার দেখে এসো।
আচ্ছা, সময় পেলে এবং সুযোগ পেলে যাব।
.
সময় সুযোগ দুই-ই পেয়েছিলাম–দেখতে ইচ্ছা করল না। দু’বার খুব কাছ থেকে (দিল্লী) ঘুরে এসেছি। ট্রেনে চেপে ঘন্টা দু-একের মধ্যে আগ্রা যাওয়া যায়–যেতে ইচ্ছা করল না। আমি আমার কল্পনা নষ্ট করতে চাই না। কল্পনা নষ্ট হলে আঘাত পেতে হয়। চীনের মহাপ্রাচীর দেখে এই কষ্ট পেয়েছিলাম। কল্পনায় ভয়াবহ কিছু ভেবে রেখেছিলাম–কাছে গিয়ে মন খারাপ হল। মনে হল–মানুষের ক্ষমতার কি বিপুল অপচয়!
তাজমহল তৈরির কাহিনীও আমাকে কষ্ট দেয়। সম্রাট শা-জাহান যে মূল্যে যমুনার তীরে এ সমাধি সৌধ তৈরি করলেন–সেই মূল্যে প্রেমের সৌধ তৈরি করা যায় না। কিংবদন্তী বলে, ওস্তাদ ইসা আফেন্দি ছিলেন মূল স্থাপত্যবিদ। তিনি কুড়ি হাজার শ্রমিক। নিয়ে বাইশ বছরে শেষ করলেন তাজমহল। সম্রাট দেখলেন। তাঁর কাছে মনে হল–সম্রাটের প্রেমের যথাযথ রূপ দেয়া হয়েছে। তিনি খুশি হলেন–এবং ওস্তাদ ইসা খা আফেন্দির মৃত্যুদণ্ডের হুকুম দিলেন। যেন এই ওস্তাদ দ্বিতীয় কোন তাজ তৈরি করতে না পারেন। শুধু তাই না–তিনি হুকুম দিলেন ক্যালিগ্রাফারদের চোখ উপড়ে ফেলতে–যেন তাজের ক্যালিগ্রাফির মত ক্যালিগ্রাফি আর না হয়। স্থাপত্য বিভাগের সব। প্রধানদেরই মৃত্যুদণ্ডাদেশ হল। যারা মর্মর পাথর কাটত তিনি তাদের হাত কেটে ফেলার হুকুমও দিলেন। একটি মহান শিল্পকর্মের জন্যে এই ছিল তাদের পুরস্কার।
তাজ নিয়ে প্রচলিত এই কিংবদন্তী আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। প্রথমত, শা-জাহান একজন প্রেমিক মানুষ। পত্নী বিয়োগ-ব্যথায় কাতর। এমন একজন মানুষ–এত নিষ্ঠুর হতে পারেন না। তার চেয়েও বড় যুক্তি হচ্ছে–শাজাহান যমুনার অপর তীরে একটি কালো তাজমহল বানানোর পরিকল্পনাও করেছিলেন। যা হবে মূল তাজমহলের হুবহু ছবি–শুধু তা করা হবে কালো পাথরে। স্থপতিদের তিনি যদি হত্যা করেন তাহলে কারা বানাবে ‘কৃষ্ণতাজ’?
অবশ্যি সম্রাটরা তো সাধারণ মানুষদের মত না। আমাদের কাছে যা নিষ্ঠুরতা তাদের কাছে তা হয়ত না। সম্রাট হুমায়ুনের মত দরদী সম্রাটকেও তো দেখি কত সহজে তার বিদ্রোহী ছোটভাই মীর্জা কামরানের চোখ উপড়ে ফেলার হুকুম দেন। চোখ উপড়ে ফেলার পর সেই অক্ষিগহ্বরে লেবুর রস ঢেলে দেয়া হয়। মীর্জা কামরানের চিৎকারে দিল্লীর পশুপাখি কাঁদতে থাকে। কিন্তু দিল্লীর বাদশাহ হুমায়ূন বিচলিত হন না। তিনি শান্তমুখে তাঁর প্রিয় লাইব্রেরীতে পড়াশোনা করতে চলে যান।
যাই হোক, এই বহু-বিতর্কিত তাজমহল দেখতে যাবার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত করলাম। তিন কন্যা এবং স্ত্রীকে নিয়ে এক বিকেলে উপস্থিত হলাম তাজের সামনে–।
বিস্ময়ে আমার কথা বন্ধ হয়ে গেল। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করল না–মানুষের হাত এই জিনিস তৈরি করেছে। মহান শিল্পকর্মের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালে হৃদয়ে প্রবল হাহাকার তৈরি হয়। চোখে জল আসে। আমার চোখ জলে ভরে গেল। জলভরা চোখে দেখলাম–সম্রাটের স্বপ্ন–মানুষের হাতে তৈরি শ্বেতপদ্ম। আমার কল্পনা। কখনো এর কাছাকাছি যেতে পারেনি।
সমুদ্র দর্শন
তেত্রিশ বছর আগের কথা।
ক্লাস সিক্সে পড়ি। স্কুলের নাম চিটাগাং কলেজিয়েট স্কুল। ক্লাস টিচারের নাম মুখলেসুর রহমান, যদিও সবাই তাকে চেনে দেড় ব্যাটারী নামে। দেড় ব্যাটারী নামকরণের উৎস জানি না। সম্ভবত শারীরিক উচ্চতার সঙ্গে এই নাম সম্পর্কিত। স্যার হলেন বেঁটেখাট মানুষ, ভারিক্কি গড়ন, মিলিটারীর প্যারেডের ভঙ্গিতে হাঁটেন। তাঁর শারীরিক কোন সমস্যা আছে, খানিকক্ষণ পরপর মাথা দুলিয়ে বিচিত্র এক ঋকি দেন। আমরা হাসতে গিয়েও হাসি না। হাসি গিলে ফেলি, কারণ দেড়-ব্যাটারী স্যারের ধমক স্কুল-বিখ্যাত। তার ধমকে প্রতি বছরই নিচের ক্লাসের ভীতু টাইপের কিছু ছাত্র প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলে। স্যার নিজেই এদের স্কুলের বারান্দায় নিয়ে গোসল করিয়ে দেন। বিরক্ত গলায় বলেন, এত ভয় পাস কেন রে গাধা? আমি তো শুধু ধমকই দেই। কখনো কি মারি? আমার হাতে কখনো বেত দেখেছিস?
মজার ব্যাপার হচ্ছে স্যারের মারও স্কুল-বিখ্যাত। কি-চড়, কানে মলা, পেনসিলের ডলা, ডাস্টারের বাড়ি–শাস্তির প্রতিটি শাখাতেই তাঁর যথেষ্ট সুনাম আছে, তবে বেত না। স্যারের হাতে বেত আমরা আসলেই দেখিনি।
তেত্রিশ বছর আগে শারীরিক শাস্তি শিক্ষাব্যবস্থার অংগ হিসেবে ধরা হত। বছরের শুরুতে স্কুলের জন্যে চক ডাস্টারের সঙ্গে সঙ্গে নানান ধরনের বেত কেনা হত। স্যাররা ক্লাসে ঢুকতেন ডাস্টার এবং বেত নিয়ে। পড়া শুরু করার আগে শরীর গরম করে। নেয়ার কায়দায় শাস্তি চলত। বাবা-মা’রা এতে কিছু মনে করতেন না। বরং খুশি হতেন, ছেলে ঠিক জায়গায় আছে। শরীরের যেসব জায়গায় বেতের দাগ পড়বে সেইসব জায়গা বেহেশতে যাবে, এমন কথাও শোনা যেত।
