আমি প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে বললাম, এখন তো ঢাকা হয়েছে শিল্প-সাহিত্যের কেন্দ্র। ঢাকা থেকে এত দূরে আছেন, আপনার অসুবিধা হয় না?
না। দূরেই ভাল আছি। কোলাহল ভাল লাগে না। এখানে প্রবল শান্তি অনুভব করি। ফার ফ্রম দি মেডিং ক্রাউড।
আপনার রুটিন কি? সময় কাটান কি করে?
বেশির ভাগ সময় বাগানে বসে বসে ভাবি।
কি ভাবেন?
সুলতান সাহেব হাসলেন। তিনি কি ভাবেন তা হয়ত কাউকে জানতে দিতে চান। আমি বললাম, আপনি কি আনন্দে আছেন?
হ্যাঁ, আনন্দে আছি। খুব আনন্দে আছি। একদল ছেলেমেয়ে আমার কাছে ছবি আঁকা শিখতে আসে। এরা মনের আনন্দে কাগজে রঙ লাগায়–দেখে খুব আনন্দ পাই। নৌকা তৈরি শেষ হলে ওদের নিয়ে বের হয়ে পড়ব।
কোথায় যাবেন?
সমুদ্রের দিকে যাব। আপনি কি লক্ষ্য করেছেন নৌকায় অনেক জানালা?
লক্ষ্য করেছি।
বাচ্চারা বসবে জানালার পাশে। যা দেখবে তার ছবি আঁকবে। ভাবতেই ভাল লাগছে।
আমারও ভাবতে ভাল লাগছে।
আমি বললাম, আজ উঠি।
সুলতান সাহেব বললেন, আরো খানিকক্ষণ বসুন।
বসলাম আরো কিছুক্ষণ। লক্ষ্য করলাম সুলতান সাহেবের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তিনি এই শারীরিক কষ্ট অগ্রাহ্য করার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। মনটা খুব খারাপ হল।
বিদায় নেবার আগে সুলতান সাহেবের স্টুডিওতে ঢুকলাম। মাটি থেকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু বিশাল এক ক্যানভাস। ছবি অনেকখানি আঁকা হয়েছে। একদল পেশীবহুল নারী পুরুষ কাজ করছে। কি অপূর্ব ছবি! শিল্পী সুলতান তাঁর নিজের স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়েছেন ক্যানভাসে। ক’জন মানুষ তা পারে?
শ্বেতপদ্ম
আমাদের ছোটবেলায় নাপিতের দোকানে কিছু ‘অতি আবশ্যকীয় চিত্রকলা সাজানো থাকতো। এমন কোন নাপিতের দোকান ছিল না যেখানে (১) তীরবিদ্ধ বোররাকের ছবি, (২) ক্ষুদিরামের ফাঁসির ছবি, (৩) তাজমহলের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি না ঝুলতো। এই তিন ছবির সঙ্গে চুল কাটার কি সম্পর্ক আমি জানি না–নাপিতরা হয়ত জানেন। তাঁদের জিজ্ঞেস করা হয়নি।
এই তিন ছবির একটি, তাজমহলের প্রচার অনেক বেশি ছিল। প্রায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বসার ঘরে ফ্রেমে বাঁধানো সূচিকর্ম হিসেবে তাজমহল থাকত। তার সঙ্গে থাকত দু’লাইনের কবিতা–
ভেতরে তাহার মমতাজ নারী
বাহিরেতে শাহজাহান।
সবার শেষে থাকত সৃচি শিল্পীর নাম এবং তারিখ। তারিখের শেষে ইং অর্থাৎ ইংরেজি সন কিংবা বাং অর্থাৎ বাংলা সন। সেই সময়ে বিয়ে নামক ইন্সটিটিউশনে ঢোকার আগে মেয়েদের অবশ্য শিক্ষণীয় কর্মকাণ্ডের একটি ছিল–সেলাইয়ের কাজ। সেলাইয়ের কাজের অনেকগুলি ধাপ ছিল। জরীর তাজমহল হচ্ছে সর্বশেষ ধাপ। সঁচকর্মের এম.ফিল. ডিগ্রীর মত। মেয়ে দেখতে এসে মুরব্বিরা এক পর্যায়ে বলতেন–কই, তাজমহলটা দেখি?
রূপালী জরীর একটি তাজমহল আমার মাও বানিয়েছিলেন (কবিতা সহ)। সেই তাজমহল দীর্ঘদিন আমাদের বসার ঘরে রবীন্দ্রনাথের ছবির পাশে শোভা পেয়েছে। মা’র তাজমহল দেখে আমি তাজমহলের প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলি। এটাকে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য কেন বলা হয় কিছুতেই বুঝতে পারি না। মসজিদের মত একটা দালান, সুন্দর হলেই বা কতটা সুন্দর হবে? যেমন মস্কোর ঘণ্টা। এটিও সপ্তম আশ্চর্যের এক আশ্চর্য। ব্যাপার হচ্ছে একটা ঘণ্টা বড় হলেও সেটা ঘণ্টাই। তার সামনে গিয়ে হা করে দাঁড়িয়ে থাকার কি থাকতে পারে? এরচে’ ব্যবিলনের শূন্যোদ্যানকে অনেক আকর্ষণীয় মনে হয়। নাম শুনলেই মনে হয়–চমৎকার একটা বাগান আকাশে ঝুলছে। ব্যবিলনের শূন্যোদ্যান দেখতে যাওয়া যেতে পারে কিন্তু তাজমহল না।
লেবু কচলে তিতা বানানোর ব্যাপার তাজমহলের ক্ষেত্রে ঘটেছে। ছবি এঁকে, কবিতা লিখে, গান লিখে তাজমহলকে শুধু যে তিতা বানানো হয়েছে তাই না–যক্ষতিতা বানানো হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে–অধিকাংশ কবি তাজমহল নিয়ে কবিতা লিখেছেন তাজমহল না দেখে। এর মধ্যে আছেন কবি রবীন্দ্রনাথ। তাজমহল না দেখেই তিনি যে কবিতা লিখলেন–তার নাম ‘তাজমহল’। তবে তাঁর অতি বিখ্যাত কবিতা ‘শা-জাহান’ অবশ্যি তাজমহল দেখার পরে লেখা পূর্ণেন্দু পত্রী ও সাহিত্যের তাজমহল।]
কবিদের তাজমহল নিয়ে এত যে উচ্ছ্বাস, এত যে লেখালেখি তার সবটাই প্রেম বিরহ নিয়ে। তাজমহলের সৌন্দর্য নিয়ে কাউকে তেমন মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি। তাজমহলের সৌন্দর্য হয়ত তাঁদের আকৃষ্ট করেনি–তাজমহলে প্রেমের মীথটাই তাঁদের আকৃষ্ট করেছে। যাঁরা তাজমহল দেখেছেন তাঁরা সবাই যে মুগ্ধ হয়ে আহা-উঁহু করেছেন তা না। অনেকের কাছেই ভাল লাগেনি। অনেকের মধ্যে একজন হলেন রুডইয়ার্ড কিপলিং (নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কথাশিল্পী)। অন্যজনও অতি বিখ্যাত মানুষ। এলডুস হাক্সলি। তিনি বললেন -”The Taj was a disappointment.
তারপরও প্রতিবছর পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এসে জড় হয়। তারা ফিরে যায়। তাদের মধ্যে একদল আবার আসে। অনেকের নেশা ধরে যায়। ঘুরে ঘুরে আসতেই থাকে। এমন একজন হলেন–নর্থ ডাকোটায় আমি যে বাড়িতে থাকতাম, তার বাড়িউলী। মহিলার বয়স আশির উপরে। তিনি এ পর্যন্ত চারবার ‘তাজ’ দেখেছেন–আবারো যাবার ইচ্ছা। আমি ‘তাজের’ এত কাছাকাছি থেকেও তাজ দেখিনি শুনে তিনি এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যেন আমি প্রস্তরযুগের একজন মানুষ–‘পিকিংম্যান’। তিনি প্রায় ধমক দেয়ার মত বললেন, দেখনি কেন?
