এই সময় একদিন এক হাটবারে হাটে ঢ্যাঁড়া শোনা গেল। বৈকুণ্ঠগ্রাম থেকে সাত ক্রোশ দূরে কনকপুর শহর, সেই শহর থেকে ঢ্যাঁড়া দিতে এসেছে। ঘোষণাটা এই–
কনকপুরের রাজকন্যার একটা সাতশিরা পাথর ছিল, সেটা একটা বাঁদর রাজবাড়ির অন্দরমহলে ঢুকে নিয়ে যায়। সেই থেকে রাজবাড়িতে নানা দুর্ঘটনা ঘটেছে। রাজকন্যার মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে, তার শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে। এই সাতশিরা পাথরে রামধনুর সাতটা রঙই শিরায় শিরায় ফুটে বেরোয়। সে পাথর যদি কারও কাছে থেকে থাকে তা হলে সেটা ফেরত দিলে রাজা সে-লোককে সহস্র স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেবে।
গঙ্গারাম শুনল ঘোষণাটা, তারপর একটা গাছের আড়ালে গিয়ে ট্যাঁক থেকে পাথরটা বার করে দেখল সেটার দিকে মন দিয়ে। হ্যাঁ, এতেও তো শিরায় শিরায় সাতটা রঙই দেখা যায়। এই কি তা হলে সাতশিরা পাথর?
গঙ্গারাম মনে মনে ঠিক করল সে কনকপুর যাবে, আর গিয়ে রাজাকে জিজ্ঞেস করবে এই পাথরই সেই পাথর কিনা। যদি তাই হয় তা হলে সে পাথরটা ফেরত দিয়ে দেবে। সেটা তার সাধের জিনিস সন্দেহ নেই, কিন্তু রাজকুমারীর অবস্থা শুনে তার মনে আঘাত লেগেছে। কারও দুঃখ গঙ্গারাম সইতে পারে না। সে দুঃখ দূর করার ক্ষমতা যদি তার থাকে তা হলে সে নিশ্চয়ই তা করবে।
এদিকে কেষ্টপুরেও এই একই ঢ্যাঁড়া পড়েছে, একই ঘোষণা হয়েছে, আর সেটা শুনেছে রঘুনাথ। তার মন বলল তার পিসতুতো ভাইটা যা বোকা, সে নিশ্চয়ই পাথর ফেরত দিতে কনকপুর যাবে। সে নিজে কনকপুরের রাস্তায় ঝোঁপের পিছনে লুকিয়ে থাকবে, আর ভাই এলেই তাকে ঘায়েল করে তার কাছ থেকে পাথরটা নিয়ে নেবে। নিয়ে সেটা সে নিজের কাছেই রাখবে, রাজাকে ফেরত দেবে না।
গঙ্গারাম পরদিন সক্কাল সক্কাল চাদরের খুঁটে মুড়ি বাতাসা বেঁধে নিয়ে দুগ্না বলে কনকপুর রওনা। দিল।
তিন ক্রোশ পথ যাবার কিছু পরে একটা বনের পাশ দিয়ে যাবার সময় একটা ঝোঁপের পিছন থেকে বেরিয়ে রঘুনাথ হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে ধেয়ে এল গঙ্গারামের দিকে। গঙ্গারাম কিছুই টের পায়নি, কারণ তার পিছন দিক দিয়ে নিঃশব্দে এসেছিল রঘুনাথ। কিন্তু হলে কী হবে? গঙ্গারামের ট্যাঁকে সাতশিরা পাথর। সে লাঠি তার মাথায় পড়তেই সেটা শোলার মতো মট করে ভেঙে গেল। কাণ্ড দেখে রঘুনাথ দিল চম্পট, কারণ সে জানে গঙ্গারামের সঙ্গে খালি হাতে সে পেরে উঠবে না।
কনকপুর পৌঁছতে গঙ্গারামের দুপুর পেরিয়ে গেল। রাজবাড়িটা অনেক দূর থেকেই দেখা যায়। সে সটান চলে গেল ফটকের সামনে। সেখানে প্রহরী তাকে রুখতে সে বলল, আমি রাজকন্যার জন্য সাতশিরা পাথর এনেছি।
প্রহরী পাথরটা দেখতে চাইলে গঙ্গারাম ট্যাঁক থেকে বার করে দেখাল। তাতে প্রহরী শুধু তার পথই ছেড়ে দিল না, আরেকজন প্রহরীকে বলে রাজার সঙ্গে দেখা করতে পাঠিয়ে দিল।
রাজা রাজসভায় যাননি, মন্ত্রী রাজকার্য চালাচ্ছেন, রাজা মনের দুঃখে অন্দরমহলে শয্যা নিয়েছেন।
গঙ্গারাম রাজার কাছে গিয়ে তাঁকে গড় করে বলল, মহারাজ, আমি একটা পাথর এনেছি, সেটা সাতশিরা কিনা যদি আপনি দেখে নেন।
রাজা উঠে বসলেন, তাঁর চোখে আশার ঝিলিক।
কই, দেখি তোমার পাথর।
গঙ্গারাম দেখাল।
রাজার দৃষ্টি উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। এই তো সেই পাথর। বলে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি।
তারপর রাজা গঙ্গারামের দিকে চেয়ে বললেন, তুমি দাঁড়াও। তোমার পাওনা পুরস্কারটা তোমাকে দিই; আর তোমার সঙ্গে লোক দিয়ে দিচ্ছি, সে তোমাকে ঘোড়ায় করে তোমার গ্রামে পৌঁছে দেবে। এ-টাকা সঙ্গে নিয়ে হেঁটে যাওয়া নিরাপদ নয়।
কোষাগার থেকে একজন কর্মচারী একটা মখমলের থলিতে এক সহস্র স্বর্ণমুদ্রা এনে গঙ্গারামকে দিল। গঙ্গারাম থলি খুলেই বলল, আরে, এ জিনিস তো আমার অনেক আছে–এর চেয়ে বেশি আছে। খেতে চাষ করতে গিয়ে মাটির তলা থেকে পেয়েছি। এ জিনিস আর আমার লাগবে না, যথেষ্ট আছে।
রাজা তো অবাক। এমন কথা তিনি কখনও শোনেননি। তিনি বললেন, এটা তোমার পুরস্কার, তোমার পাওনা। তোমায় নিতেই হবে।
তবে দিন। আপনি যখন এত করে বলছেন তখন না বলব না। কিন্তু একটা কথা বলার ছিল, রাজামশাই।
কী কথা?
যাকে এনে দিলাম সাতশিরা পাথর, সেই রাজকন্যাকে বড় দেখতে ইচ্ছা করছে। আমি কোনওদিন রাজকন্যা দেখিনি।
রাজা চোখ কপালে তুলে বললেন, এ কেমন কথা বললে তুমি! রাজকন্যাকে দেখা কি মুখের কথা? সে থাকে তার নিজের ঘরে; তার বিয়ের কথা হচ্ছে। সে তো আর খুকি নয়।
সে তো আমারও বিয়ের কথা হচ্ছে, রাজামশাই, বলল গঙ্গারাম। আমি বলি দেখতে দোষটা কী? একবার দেখেই আমি চলে যাব।
এমন সময় সকলকে অবাক করে দিয়ে রাজার ঘরে পর্দা সরিয়ে এক পরমাসুন্দরী মেয়ে এসে ঘরে ঢুকল।
এ কী, সুনয়না! রাজা অবাক হয়ে বলে উঠলেন।
যে আমার পাথর এনে দিয়েছে তাকে একবার দেখতে ইচ্ছা হল, বলল রাজকন্যা সুনয়না। এই পাথর যে হাতছাড়া করতে পারে সে তো যেমন তেমন লোক নয়। এমন পয়া পাথর তো আর হয় না। এতে মানুষের ভাগ্য ফিরে যায়।
গঙ্গারাম অবাক হয়ে রাজকন্যার দিকে চেয়ে বলল, এ কথা বোধহয় ঠিকই, কারণ এটা পাবার পর থেকেই আমার মতো গরিবের কপালও খুলে গিয়েছিল। এখন যখন পাথরটা চলে গেল–
তখন আবার যে-কে-সেই হয়ে যাবে তুমি, বলল রাজকন্যা। আমি এ পাথর ফেরত চাইনি, বাবাই জোর করে ঘোষণা করেছিলেন। আমাদের সত্যি করে কোনও অভাব নেই, অভাব তো তোমারই।
