গঙ্গারাম একগাল হেসে বলে, কপালের কথা কেউ কি কিছু বলতে পারে? ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন বটে, কিন্তু কেন তা তো বলতে পারব না!
গঙ্গারামের একবারও মনে হল না যে, তার ট্যাঁকে যে পাথরটা গোঁজা থাকে সেই পাথরই তার কপাল ফিরিয়ে দিয়েছে।
.
০২.
গঙ্গারামের মামাতো ভাই রঘুনাথ হাজত থেকে ছাড়া পেয়ে তার বাড়িতে আসার পথেই হলধরের দোকান থেকে মুড়ি কিনে খেতে খেতে গঙ্গারামের আশ্চর্য কপালের কথা শুনল। শুনে তার মনে হল, এটা কেমন করে হয়? হঠাৎ একটা লোকের ভাগ্য ফিরে যায় কী করে? এ ব্যাপারে একটু খোঁজখবর করতে হবে তো!
খিদে মিটিয়ে বাড়ি ফিরে এসে প্রথমেই তার বাপের কাছে মুখঝামটা খেতে হল রঘুনাথের। এ বাড়িতে তোর ঠাঁই হবে না, সোজা বলে দিলেন বাপ, তুই অন্য ব্যবস্থা দ্যাখ।
রঘুনাথ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে দেখল গঙ্গারাম মাঠ থেকে বাড়ি ফিরছে। কী দাদা, অ্যাদ্দিনে ছাড়া পেলে বুঝি? গঙ্গারাম জিজ্ঞেস করল রঘুনাথকে। কিন্তু বাপ তোমার উপর খাপ্পা হয়ে আছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করেছ?
করেছি, বলল রঘুনাথ। আমি এ বাড়িতে থাকার জন্যে আসিনি। আমার অন্য ডেরা আছে কেষ্টপুরে। আমি এসেছি একবার তোর সঙ্গে দেখা করে যাব বলে।
সে তো ভাল কথা, বলল গঙ্গারাম।
তোর সঙ্গে একটা কথা ছিল।
কী কথা?
তোর কপাল ফিরেছে বলে শুনলাম। ব্যাপারটা কী?
আমি আর কী বলব দাদা। যিনি মাথার উপর আছেন, তাঁর কখন কী মর্জি হয় তা কি আমরা বলতে পারি?
রঘুনাথ বুঝল যে গঙ্গারাম যা বলছে তা সরল মনেই বলছে। তার কাছ থেকে খুব বেশি কিছু জানা যাবে না। সে পোঁটলা কাঁধে আবার বেরিয়ে পড়ল। কেষ্টপুরে সত্যিই তার একটা ডেরা আছে। তার দলের যে পাণ্ডা, যাকে পেয়াদায় ধরতে পারেনি, সেই মহেশ থাকে কেষ্টপুরে। জেল খেটে রঘুনাথের এবার সৎপথে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু দুষ্কর্ম তার মজ্জায় ঢুকে গেছে, তাই তার পুরনো দল সে ছাড়তে চায় না।
তবে কেষ্টপুর যাবার আগে সে গেল হরিতাল, অঘোর গনতকারের কাছে। অঘোর শুধু গুনতে জানে না, সে নানারকম মন্তর-তন্তর জানে। লম্বা, চিমড়ে মানুষটা, গায়ের রঙ একেবারে আলকাতরার মতো, বয়স কত তা কেউ জানে না।
অঘোর রঘুনাথকে দেখেই বলল, কয়েদখানা থেকে ছাড়া পেলি? তবে তোর কিন্তু কপালে দুঃখু আছে, তোকে আবার হাজতে যেতে হবে। এই বেলা কুসঙ্গ পরিত্যাগ কর।
সে সব কথা থাক, বলল রঘুনাথ। আমি আমার পিসতুতো ভাইয়ের কথা জানতে এসেছি।
কে, গঙ্গারাম?
তার কপাল ফিরল কী করে বলতে পারেন?
দাঁড়া, একটু হিসেব করে দেখি।
অঘোর গনতকার তার তক্তপোশে বসে একটা খেরোর খাতায় খাগের কলম দিয়ে কয়েকটা নকশা এঁকে প্রায় মিনিট পাঁচেক ধরে সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। তারপর বলল, সে তো এখন বিস্তর ধনের মালিক।
ধন? কই, ধনদৌলত তো কিছু দেখতে পেলাম না।
কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি।
হঠাৎ তার কপাল ফিরল কেন? সে কি দেবতার বর পেল নাকি?
না। সে পেয়েছে একটা পাথর। পাথর?
হ্যাঁ, পাথর। তার জোরেই তার কপাল ফিরেছে। এই পাথরের নাম সাতশিরা। তার বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে। তবে সে নিজে তা বোঝে না। সে অতি সরল মানুষ।
তার ধন কোথায় আছে বলতে পারেন?
তার খাটের নীচে। তিন সহস্র স্বর্ণমুদ্রা।
রঘুনাথ গনতকারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সে সোজা গেল কেষ্টপুর। তার লক্ষ্য মহেশ চোরের বাড়ি।
মহেশের বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি, পাকানো শরীর, নাকের নীচে পুরু গোঁফ আর গালে গালপাট্টা।
দাদা! বলল রঘুনাথ মহেশের হাত ধরে, তিন সহস্র স্বর্ণমুদ্রা!
কী ব্যাপার?
রঘুনাথ তাকে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলল।
এই কথা? শুনে বলল মহেশ। খাটের তলায় আছে পেতলের ঘটি?
হ্যাঁ, দাদা! তুমি আনতে পারলে তিনের দুই ভাগ তোমার। এক ভাগ আমার।
তা বেশ, বলল মহেশ। পরশু অমাবস্যা। পরশু যাব।
মহেশের মতো চতুর চোর এ-তল্লাটে আর কেউ ছিল না। সে যে কতবার পেয়াদার চোখে ধুলো দিয়েছে তার হিসেব নেই। অমাবস্যার রাতে সিঁদকাঠি নিয়ে বৈকুণ্ঠগ্রামে গঙ্গারামের বাড়িতে এসে সে কাজ শুরু করে দিল। নিশুতি রাত, ফাঙ্গুন মাস, কিন্তু শীত এখনও পুরোপুরি যায়নি। মহেশ এসে পৌঁছেছে রাত তিনটেয়, যখন লোকের ঘুম হয় সবচেয়ে গভীর। এসেই প্রায় শব্দ না করে সে সিদ কাটতে শুরু করে দিয়েছে।
কিন্তু তাকে বেশিদূর এগোতে হল না। দুদিন হল বৃষ্টি হয়ে গেছে, শীতকালের লম্বা-ঘুম-ভাঙা এক কালসাপ ছিল কাছাকাছির মধ্যে, সেটা নিঃশব্দে এসে মহেশের গোঁড়ালিতে মারল একটা ছোবল। মহেশের হাত থেকে সিঁদকাঠি পড়ে গেল, আর দুমিনিটের মধ্যে তার নিষ্প্রাণ দেহ লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
পরদিন সকালে গঙ্গারামই দেখল প্রথমে চোরের মৃতদেহ। সে বুঝল কী হয়েছে, কিন্তু তার বাড়িতে চোর সিদ কাটতে আসবে কেন সেটা সে বুঝল না।
এদিকে মহেশের কী দশা হয়েছে সেটা রঘুনাথ জানতে পেরেছে। সে বুঝল তার পিসতুতো ভাইয়ের কী আশ্চর্য কপাল। এইভাবে চুরি করে তো তার কাছ থেকে টাকা আদায় করা যাবে না। অন্য কী পন্থা নেওয়া যায় সেই নিয়ে সে ভাবতে বসল।
এদিকে গঙ্গারামের যে কাল খুলেছে তার আরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার মামার বাত আপনা থেকেই অনেকটা ভাল হয়ে গেছে; মামার মেজাজটা ছিল খিটখিটে, আজকাল সেটাও বদলে গিয়ে অনেক নরম হয়ে গেছে। মামা বলছে গঙ্গারামের জন্য এবার একটা পাত্রী খুঁজতে হবে। গঙ্গারাম এটাকেও কপাল ফেরার লক্ষণ বলে মনে করে, কারণ বিয়েতে তার আপত্তি নেই। বেশ একজন সুখ-দুঃখের সাথী হবে, ঘরকন্নার কাজ করার লোক হবে, আর সে মেয়ে যদি ফুটফুটে হয় তা হলে তো কথাই নেই। ফুল যেমন সুন্দর, সকাল-সন্ধ্যার আকাশ যেমন সুন্দর, পাখির ডাক যেমন সুন্দর, তেমনই তার বউও সুন্দর হয় এটা গঙ্গারাম চায়।
