দ্বিতীয়জন হলেন অসীমানন্দ স্বামী–এককালে স্বদেশি করে পরে সন্ন্যাসী হয়ে যান। ইনিও মারা গেছেন বছরখানেক হল। কাগজে ছবি বেরিয়েছিল, সুধীনের মনে আছে।
তৃতীয় ব্যক্তি হলেন এয়ার ইন্ডিয়ার বাঙালি পাইলট ক্যাপ্টেন চক্রবর্তী। লন্ডন যাওয়ার পথে বোয়িং দুর্ঘটনায় আড়াইশো যাত্রী সমেত এঁরও মৃত্যু হয় বছর তিনেক আগে। সুধীন যে শুধু ছবি থেকেই চিনল এঁকে তা নয়; একবার আপিসের কাজে রোম যাওয়ার পথে প্লেনের ককপিটে এঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল।
সুধীন একটা প্রশ্ন না করে পারল না।
এঁরা কি শুধুই পোট্রেট করানোর উদ্দেশ্যে এসেছিলেন? সে ছবি নিজেরা নেননি কখনও?
গগন চৌধুরীকে এই প্রথম গলা ছেড়ে হাসতে শুনল সুধীন।
না, মিস্টার সরকার, পোট্রেট এঁদের কোনও প্রয়োজন ছিল না। এ শুধু আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্য আঁকা।
আপনি কি বলতে চান রোজই কেউ না কেউ এসে আপনাকে সিটিং দেন?
সেটা আর একটুক্ষণ থাকলেই দেখতে পাবেন। আজও লোক আসবে।
সুধীনের মাথা ক্রমেই গুলিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এঁদের সঙ্গে যোগাযোগটা কীভাবে–?
দাঁড়ান, আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। আমার সিস্টেমটা একটু আলাদা।
তাক থেকে একটা বেশ বড় খাতা নামিয়ে সুধীনের দিকে নিয়ে এলেন গগন চৌধুরী।
এটা খুলে দেখুন এতে কী আছে।
আলোর তলায় নিয়ে গিয়ে খাতাটা খুলল সুধীন।
খাতার পাতার পর পাতায় আঠা দিয়ে সাঁটা রয়েছে খবরের কাগজের পৃষ্ঠা থেকে কাটা মৃত্যুসংবাদ। অনেকগুলো খবরের সঙ্গে ছবিও রয়েছে। সুধীন দেখল যে, কিছু কিছু কাটিং-এর পাশে পেনসিল দিয়ে চিকে দেওয়া রয়েছে।
পেনসিলের দাগ হলে বুঝতে হবে তাদের ছবি আঁকা হয়ে গেছে, বললেন গগন চৌধুরী।
কিন্তু যোগাযযাগটা করেন কী করে সেটা তো—
গগন চৌধুরী সুধীনের হাত থেকে খাতাটা নিয়ে আবার সেটা তাকে রেখে দিলেন। তারপর ঘুরে এগিয়ে এসে বললেন, ওটা সকলে পারে না, আমি পারি। এটা চিঠি বা টেলিফোনের কম্ম নয়। এঁরা যেখানে আছেন সেখানে তো আর টেলিফোন নেই বা ডাক বিলির ব্যবস্থাও নেই। এঁদের জন্য অন্য উপায়ের প্রয়োজন হয়।
সুধীনের হাত পা ঠাণ্ডা, গলা শুকিয়ে কাঠ। তাও একটা প্রশ্ন না করলেই নয়!
আপনি কি বলতে চান এইসব লোকের পোট্রেট করা হয়েছে এঁদের মৃত্যুর পর?
মৃত্যুর আগে এঁদের খবর পাব কী করে সুধীনবাবু? আমি আর কলকাতার কটা লোককে চিনি? মৃত্যু না হলে তো তাঁরা আর তাঁদের গণ্ডির বাইরে বেরোতে পারেন না। একমাত্র মৃত ব্যক্তিই তো সম্পূর্ণ মুক্ত, সম্পূর্ণ স্বাধীন। তাঁদের সময়েরও অভাব নেই, ধৈর্যেরও অভাব নেই। ছবি যতক্ষণ না নিখুঁত হচ্ছে ততক্ষণে ঠায় বসে থাকবেন ওই চেয়ারে।
ঢং-ঢং-ঢং—
রাত্রের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে একটা ঘড়ি বেজে উঠল। সিঁড়ির পাশে যে ঘড়িটা দেখেছিল সুধীন সেটাই বোধহয়।
বারোটা, বললেন গগন চৌধুরী। এইবার আসবেন।
কে?–সুধীনের গলার স্বর অস্বাভাবিক রকম চাপা ও রুক্ষ। তার মাথা ঝিমঝিম করছে।
আজকে যিনি বসবেন তিনি। ওই তাঁর পায়ের শব্দ।
সুধীন শ্রবণশক্তিটা এখনও হারায়নি, তাই সে স্পষ্ট শুনতে পেল বাইরে নীচ থেকে জুতোর শব্দ।
এসে দেখুন।–গগন চৌধুরী এগিয়ে গেছেন পাশের একটা জানলার দিকে। আমার কথা বিশ্বাস হয় এসে দেখুন।
এও কি সেই সম্মোহনী শক্তি? যন্ত্রচালিতের মতো এগিয়ে গিয়ে সুধীন গগন চৌধুরীর পাশে দাঁড়িয়ে নীচের দিকে দৃষ্টি দিল। তারপর তার অজান্তেই একটা আর্তস্বর বেরিয়ে এল তার গলা দিয়ে—
একে যে চিনি!
সেই দৃপ্ত মিলিটারি ভঙ্গি, সেই দীর্ঘ গড়ন, সেই ছেয়ে রঙের সাফারি সুট।
ইনিই ছিলেন সুধীনের বস–নগেন্দ্র কাপুর।
সুধীনের মাথা ঘুরছে। টাল সামলানোর জন্য সে ইজেলটাকে জাপটে ধরে ফেলল।
সিঁড়ি দিয়ে পায়ের আওয়াজ উপরে উঠে আসছে। কাঠের সিঁড়িতে জুতোর ক্রমবর্ধমান শব্দে সমস্ত বাড়ি গমগম করছে।
এবার আওয়াজ থামল।
নৈঃশব্দ্যের মধ্যে গগন চৌধুরী মুখ খুললেন আবার।
যোগস্থাপনের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন না, সুধীনবাবু? ভেরি সিম্পল–এইভাবে হাতছানি দিলেই চলে আসে!
সুধীন বিস্ফারিত চোখে দেখল দোরোখা শালের ভিতর থেকে গগন চৌধুরীর ডান হাতটা বেরিয়ে সামনে প্রসারিত। সে হাতে মাংস, চামড়া কিছুই নেই–খালি হাড়।
যে হাতে ডাকা, সে হাতেই আঁকা!
সংজ্ঞা হারাবার আগের মুহূর্তে সুধীন শুনল স্টুডিওর বন্ধ দরজার বাইরে থেকে টোকা পড়ছে—
খট খট খট–খট খট খট—
.
খট খট খট–খট খট খট—
দাদাবাবু! দাদাবাবু।
এক ঝটকায় ঘুমটা ভেঙে গিয়ে দিনের আলোয় সুধীনকে আবার তখনই চোখটা কুঁচকে বন্ধ করে নিতে হল। বাপরে কী ভয়ংকর স্বপ্ন।
দরজা খুলুন! দাদাবাবু!
চাকর অধীরের গলা।
দাঁড়া, এক মিনিট।
সুধীন বিছানা ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে দিল। অধীরের মুখে গভীর উদ্বেগ।
আপনি এত বেলা অবধি—
জানি। ঘুমটা একটু বেশি হয়ে গেছে।
এত হইহল্লা বাড়ির সামনে, কিছুই টের পেলেন না?
হইহল্লা?
চৌধুরীবাড়ির বড়বাবু যে মারা গেলেন কাল রাত্তিরে। গগনবাবু। চৌরাশি বছর বয়স হয়েছেল। ভুগছিলেন তো অনেকদিন। ঘরে বাতি জ্বালা থাকত রাত্তিরে দেখেননি?
তুই জানতিস ওঁর অসুখ?
জানব না? ওনার চাকর ভগীরথ–তার সঙ্গে তো দেখা হয় রোজ বাজারে।
বোঝো!
সন্দেশ, পৌষ ১৩৯০
গঙ্গারামের কপাল
নদীর ধারে খোলামকুচি দিয়ে ব্যাঙবাজি খেলতে খেলতে হঠাৎ গঙ্গারামের চোখে পড়ল পাথরটা। এ নদীতে জল নেই বেশি; যেখানে সবচেয়ে গভীর সেখানেও হাঁটু ডোবে না। জলটা কাঁচের মতো স্বচ্ছ, তাই তার নীচে লাল নীল সবুজ হলদে খয়েরি অনেক রকম পাথর দেখা যায়। কিন্তু এমন পাথর গঙ্গারাম এর আগে কোনওদিন দেখেনি। যতরকম রঙ হয় রামধনুতে, সব রঙ আছে এই পাথরে। আকারে একটা পায়রার ডিমের মতো। গঙ্গারাম জল থেকে পাথরটা তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে সেটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। বাঃ, কী সুন্দর! আপনা থেকেই বেরিয়ে পড়ল তার মুখ থেকে। তারপর সেটাকে সে। ট্যাঁকে খুঁজে নিয়ে বাড়িমুখো রওনা হল।
