ভদ্রলোক এখনও একদৃষ্টে চেয়ে আছেন সুধীনের দিকে। এই ঘরের কি কোনও আলোই জ্বলে না নাকি?
অগত্যা সুধীনই আবার মুখ খুলল। ব্যাপারটাকে আরেকটু পরিষ্কার করা দরকার।
আমি যদি জানলা বন্ধ করি তা হলেও আলো আসবে না ঠিকই, কিন্তু দক্ষিণের জানলা তো, তাই…
আপনার জানলা বন্ধ করতে হবে না।
আজ্ঞে?
আমিই করব।
হঠাৎ যেন একট বিরাট ভার নেমে গেল সুধীনের বুক থেকে।
ওঃ, তা হলে তো কথাই নেই! অনেক ধন্যবাদ।
আপনি উঠছেন?
সুধীন ওঠার উদ্যোগ করছিল ঠিকই, কিন্তু এই প্রশ্নে একটু অবাক হয়েই আবার বসে পড়ল–রাত হল তো! আর আপনিও নিশ্চয়ই শুতে যাবেন।
আমি রাত্রে ঘুমোই না।
ভদ্রলোকের দৃষ্টি সুধীনের দিক থেকে একচুল নড়েনি।
লেখাপড়া করেন বুঝি? সুধীন ধরা গলায় প্রশ্ন করল। এই পরিবেশে গগন চৌধুরীর সান্নিধ্য যে খুব স্বস্তিকর নয়, সেটা স্বীকার করতেই হবে।
না।
তবে?
ছবি আঁকি।
সুধীনের মনে পড়ে গেল বাইনোকুলার দিয়ে ঘরের দেওয়ালে পেন্টিং দেখে মনে হয়েছিল সেটা চিত্রকরের স্টুডিও হতে পারে। নাগমশাইও বলেছিলেন ইনি এককালে ছবি আঁকতেন।
তার মানে ওই ঘরটা আপনার স্টুডিও?
ঠিকই ধরেছেন।
কিন্তু সে কথা বোধহয় পাড়ার বিশেষ কেউ জানে না?
গগন চৌধুরী একটা শুকনো হাসি হাসলেন।
আপনার সময় আছে?
সময়, মানে…
তা হলে কতগুলো কথা বলি। অনেকদিনের জমে থাকা কথা। কাউকে বলার সুযোগ হয়নি কখনও।
সুধীন অনুভব করল, ভদ্রলোকের অনুরোধ অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা তার নেই।
বলুন।
পাড়ার লোকে জানে না, কারণ জানার আগ্রহ নেই। একটা লোক সারাটা জীবন শিল্পচর্চা করে গেল, কিন্তু সে সম্বন্ধে কারুরও কোনও কৌতূহল নেই। এককালে যখন এগজিবিশন করেছি, তখন কেউ কেউ এসে দেখেছে, অল্পবিস্তর সুখ্যাতিও করেছে। কিন্তু যখন হাওয়া বদলাতে শুরু করল, মানুষের যে ছবি রক্তমাংসের মানুষ বলে চেনা যায় তার কদর আর যখন রইল না, তখন থেকে আমি গুটিয়ে নিয়েছি। নিজেকে। নতুনের ঝাণ্ডা উড়িয়ে চলতে আমি শিখিনি। মনে মনে দা ভিঞ্চিকে গুরু বলে মেনেছিলাম; এখনও তিনিই আমার গুরু।
কিন্তু…আপনি কীসের ছবি আঁকেন?
মানুষের।
মানুষের?
পোট্রেট।
মন থেকে?
না। সেটা আমি পারি না। শিখিনি। আমার সামনে কেউ এসে না বসলে আমি ছবি আঁকতে পারি না।
এই মাঝরাত্তিরে–?
আসে। মডেল আসে। সিটিং দেয়। রোজই আসে।
সুধীন কিছুক্ষণের জন্য হতভম্ব হয়ে বসে রইল। এ কেমনতরো কথাবার্তা বলছেন ভদ্রলোক? এ যে। পাগলের প্রলাপের মতো শোনাচ্ছে!
বিশ্বাস হচ্ছে না! গগন চৌধুরীর ঠোঁটের কোণে এই প্রথম একটা পরিষ্কার হাসির আভাস দেখা গেল। সুধীন কী বলবে বুঝতে পারল না।
আসুন আমার সঙ্গে।
সুধীন এ আদেশ অমান্য করতে পারল না। ভদ্রলোকের চোখে এবং কথায় একটা সম্মোহনী শক্তি আছে, সেটা মানতেই হবে। তার নিজেরও যে কৌতূহল হচ্ছে না তা নয়। কেমন ছবি আঁকেন ভদ্রলোক? কারা আসে সিটিং দিতে মাঝরাত্তিরে? কীভাবে তাদের জোগাড় করা হয়?
এক আমার স্টুডিওতে ছাড়া বাড়ির আর কোথাও ইলেকট্রিসিটি নেই, কেরোসিন ল্যাম্পের আবছা হলদে আলোয় কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে বললেন ভদ্রলোক।–বাকি সব কানেকশন কেটে দিয়েছি।
আশ্চর্য এই যে, ল্যান্ডিং-এ, সিঁড়ির দেওয়ালে, বৈঠকখানায়–কোথাও একটিও পেন্টিং নেই। সবই কি তা হলে স্টুডিওতে জড়ো করে রেখেছেন ভদ্রলোক?
তিনতলায় উঠে বাঁয়ে ঘুরেই সামনে একটা দরজা। সেই ঘরে সুধীনকে নিয়ে ঢুকে দরজা আবার বন্ধ করে দিয়ে বাঁয়ে দেওয়ালে একট সুইচ টিপতেই উজ্জ্বল আলোতে ঘরটা ভরে গেল।
এটাই যে স্টুডিও সেটা আর বলে দিতে হয় না। আঁকার সব সরঞ্জামই রয়েছে এখানে। ঘরের এক পাশে আলোর ঠিক নীচে ইজেলে একটা সাদা ক্যানভাস খাটানো রয়েছে। তাতে নতুন ছবি শুরু হবে সেটা বোঝাই যাচ্ছে।
সরঞ্জামের বাইরে যেটা আছে সেটা হল দেওয়ালে টাঙানো এবং মেঝেতে ডাঁই করে রাখা পোট্রেট। কমপক্ষে একশো তো হবেই। মেঝেরগুলো এগিয়ে গিয়ে হাতে তুলে না ধরলে বোঝা যাবে না। যেগুলো চোখের সামনে জলজ্যান্ত সে হল দেওয়ালে টাঙানো পোট্রেটগুলো। অধিকাংশই পুরুষের ছবি। সুধীন তার তৈরি চোখে বুঝে নিল সাবেকি ঢঙে আঁকা পেন্টিংগুলোতে যথেষ্ট মুনশিয়ানার পরিচয় আছে। এখানেও সুধীনের মনে হল যে, সে যেন অনেক জ্যান্ত মানুষের ভিড়ে এসে পড়েছে এবং সবাই চেয়ে আছে তারই দিকে কমপক্ষে পঞ্চাশ জোড়া চোখ!
কিন্তু এরা সব কারা? দু-একটা মুখ চেনা-চেনা মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু—
কেমন লাগছে? প্রশ্ন করলেন গগন চৌধুরী।
উঁচুদরের কাজ, স্বীকার করতে বাধ্য হল সুধীন।
অথচ অয়েল পেন্টিং-এ পোট্রেট আঁকার রেওয়াজটাই লোপ পেয়ে গেছে। সেখানে আমাদের মতো শিল্পীদের কী দশা হয় ভেবে দেখেছেন?
কিন্তু এ ঘরে এসে তো মনে হচ্ছে না যে, আপনার কাজের অভাব আছে।
কী বলছেন! সে তো এখন! এককালে পনেরো বছর ধরে সমানে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে গেছি একটি লোকও সাড়া দেয়নি। শেষটায় বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দিই।
তারপর? আবার আঁকা শুরু হল কী করে?
অবস্থার পরিবর্তনের ফলে।
সুধীন আর কিছু বলল না, কারণ তার সমস্ত মন এখন ছবির দিকে। ইতিমধ্যে সে তিনজনকে চিনতে পেরেছে। একজন মাস চারেক হল মারা গেছেন। বিখ্যাত গায়ক অনন্তলাল নিয়োগী। সুধীন আসরে বসে তাঁর গান শুনেছে বছর আষ্টেক আগে।
