চাঁদনি পাতার রস খাওয়াতে হবে, তা হলেই রোগ সারবে। সংস্কৃত নাম চন্দ্রায়ণী। আর রোগের নাম হল শুনাই।
চাঁদনি একটা গাছের নাম বুঝি? ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল কানাই।
নসু কবরেজ ওপর-নীচে মাথা নাড়লেন দুবার। কিন্তু তাঁর চোখ থেকে ভ্রুকুটি গেল না।
কিন্তু চাঁদনি তো যেখানে-সেখানে পাবে না বাপু, শেষটায় বললেন তিনি।
তবে?
বাদড়ার জঙ্গলে যেতে হবে। একটা পোডড়া মন্দির আছে মহাকালের। তার উত্তরদিকে পঁচিশ পা গেলেই দেখবে চাঁদনি গাছ। কিন্তু সে তো প্রায় পাঁচ ক্রোশ পথ; পারবে যেতে?
নিশ্চয়ই পারব, বলল কানাই। হাঁটতে আমার কোনও কষ্ট হয় না।
কথাটা বলেই কানাইয়ের আরেকটা প্রশ্ন মাথায় এল।
কিন্তু গাছ চিনব কী করে কবরেজমশাই?
ছোট ছোট ছুঁচলো বেগনে পাতা, হলদে ফুল আর মন-মাতানো গন্ধ। বিশ হাত দূর থেকে সে গন্ধ পাওয়া যায়। স্বর্গের পারিজাতকে হার মানায় সে গন্ধ। তিন-চার হাতের বেশি উঁচু নয় গাছ। একটি পাতা বেটে রস খাওয়ালেই আর দেখতে হবে না। ব্যারাম বাপ বাপ বলে পালাবে, আর শরীর দুদিনেই তাজা হয়ে যাবে। তবে সময় আছে আর মাত্র দশদিন। দশদিনের মধ্যে না খাওয়ালে…
নসু কবরেজ আর কথাটা শেষ করলেন না।
আমি কাল সক্কাল-সক্কাল বেরিয়ে পড়ব, কবরেজমশাই, বলল কানাই। গণেশখুড়োকে বলব আমি যখন থাকব না তখন যেন বাবাকে এসে দেখে যায়। খাওয়ানো তো যাবে না বোধ হয় কিছুই?
নসু কবরেজ মাথা নাড়লেন। সে চেষ্টা বৃথা। এ ব্যারামের লক্ষণই এই। পেটে কিছুই সহ্য হয় না, আর দিনে দিনে শরীর শুকিয়ে যেতে থাকে। তবে চাঁদনির রস এর অব্যর্থ ওষুধ। আর, ইয়ে, ব্যারাম সারবার পর বাকি কথা হবে…
পড়শি গণেশ সামন্তকে বাপের দিকে একটু নজর রাখার কথা বলে পরদিন ভোর থাকতে গুড়-চিড়ে গামছায় বেঁধে নিয়ে কানাই বেরিয়ে পড়ল বাদড়ার জঙ্গলের উদ্দেশে। পৌঁছতে পৌঁছতে সেই বিকেল হয়ে যাবে, কিন্তু কানাই পরোয়া করে না। বাপকে সে দেবতার মতো ভক্তি করে, আর বাপও ছেলেকে ভালবাসে প্রাণের চেয়েও বেশি। দিব্যি সুস্থ মানুষটার হঠাৎ যে কী হল!–দেখতে দেখতে শুকিয়ে আধখানা হয়ে গেল।
পথ জানা নেই, তাই একে তাকে জিজ্ঞেস করে করে চলতে হচ্ছে। বনের নাম শুনে সকলেই জিজ্ঞেস করে, কেন, সেখানে আবার কী? শুনে কানাই বুঝতে পারে বনটা খুব নিরাপদ নয়, কিন্তু তা হলে কী হবে? বাপের জন্য চাঁদনি পাতা জোগাড় করতে সে প্রাণ দিতে প্রস্তুত।
সূর্যি যখন লম্বা ছায়া ফেলতে শুরু করছে তখন একটা ধানখেতের ওপারে কানাই দেখল একটা গভীর বন দেখা যাচ্ছে। খেত থেকে এক কৃষক কাঁধে লাঙল নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। তাকে জিজ্ঞেস করে কানাই জানল ওটাই বাদড়ার বন। কানাই পা চালিয়ে এগিয়ে চলল।
শাল সেগুন শিমুলের সঙ্গে আর কত কী গাছ মেশানো ঘন বনে সুর্যের আলো ঢোকে না বললেই চলে। এই বিশাল বনে তিন-চার হাত উঁচু গাছ খুঁজে পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা? তবে কাছে মন্দির আছে, সেই একটা সুবিধে!
বিশ-পঁচিশ হাত ভিতরে ঢুকতেই একটা হরিণের পাল দেখতে পেল কানাই। তাকে দেখেই হরিণগুলো ছুটে পালালো। হরিণ তো ভাল, কিন্তু জাঁদরেল কোনও জানোয়ার যদি সামনে পড়ে? যাই হোক, সে ভেবে কোনও লাভ নেই। তার লক্ষ্য হবে এখন একটাই; প্রথমে মহাকালের মন্দির, তারপর চাঁদনি গাছ খুঁজে বার করা।
মন্দির দেখতে পাবার আগে কিন্তু গন্ধটা পেল কানাই। তত জোরালো নয়; মিহি একটা গন্ধ, কিন্তু তাতেই প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
এবার একটা মহুয়া গাছ পেরিয়ে পোডড়া মন্দিরটা চোখে পড়ল। দিন ফুরিয়ে এসেছে, তবে মন্দিরের চারপাশটায় গাছ একটু পাতলা বলে পড়ন্ত রোদ এখানে-ওখানে ছিটিয়ে পড়েছে।
তুই কে রে ব্যাটা?
প্রশ্নটা শুনে কানাই চমকে তিন হাত লাফিয়ে উঠেছিল। এখানে অন্য মানুষ থাকতে পারে এটা তার মাথাতেই আসেনি। এবার মুখ ঘুরিয়ে দেখল একটা গোলপাতার ছাউনির সামনে তিন হাত লম্বা সাদা দাড়িওয়ালা একটা লোক ভুরু কুঁচকে চেয়ে আছে তার দিকে।
তুই যা খুঁজছিস তা এখানে পাবি না, এবার বলল বুড়ো কয়েক পা এগিয়ে এসে। সে কি মনের কথা বুঝতে পারে নাকি?
কী খুঁজছি তা তুমি জানো? জিজ্ঞেস করল কানাই।
দাঁড়া দাঁড়া, একটু মনে করে দেখি। তোকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু এখন আবার মন থেকে হঠাৎ ফসূকে গেল। একশো ছাপ্পান্ন বছর বয়সে স্মরণশক্তি কি আর জোয়ান বয়সের মতো কাজ করে?
বুড়ো মাথা হেঁট করে ডান হাত দিয়ে গাল চুলকে হঠাৎ আবার মাথা সিধে করে বলল, মনে পড়েছে। চাঁদনি। তোর বাপের অসুখ, তার জন্য চাঁদনি পাতা নিতে এসেছিস তুই। ওই মন্দিরের উত্তর দিকটায় ছিল আজ দুপুর অবধি। কিন্তু সে তোর আর নেই! গিয়ে দেখ–শেকড় অবধি তুলে নিয়ে গেছে।
কানাইয়ের বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে গেছে। এতটা পরিশ্রম মাঠে মারা যাবে? সে মন্দির লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল। উত্তর দিক। উত্তর দিক কোষ্টা? হ্যাঁ, এইটে। ওই যে গর্ত। ওইখানে ছিল গাছ–শেকড় অবধি তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু কে?
কানাইয়ের চোখে জল। সে বুড়োর কাছে ফিরে এল।
কে নিল সে গাছ? কে নিল?
রূপসার মন্ত্রী সেপাই-সান্ত্রী নিয়ে এসে গাছ তুলে নিয়ে গেছে। রূপসার প্রজাদের ব্যারাম হয়েছে–শুখনাই ব্যারাম–বিশদিনে না খেয়ে হাত পা শুকিয়ে মরে যায় তাতে। একমাত্র ওষুধ হল চাঁদনি পাতার রস।
