আর তা হবে নাই বা কেন। সে ঘর যে খালি! দড়ি কঙ্কাল, ছাপার যন্ত্র, সব হাওয়া!
আমাদের হতভম্ব ভাব দেখে কুরেশি হো হো করে হেসে উঠলে। তারপর এক অদ্ভুত প্রশ্ন করলে।
আপ্টের বাড়িতে চা ছাড়া কিছু খেয়েছ কখনও? প্র
শ্নটা অপ্রত্যাশিত হলেও বললুম, কই, না তো!
ওই তো! বললে কুরেশি। লোকটা হাড় কঞ্জুস। তা ছাড়া ওর আত্মম্ভরি ভাবটাও মাঝে মাঝে ইরিটেট করে আমাকে। তুমি বাজিটা ফেলে মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ করনি। তোমার নির্ঘাৎ হাজার টাকা খসত। তাই ভাবলাম কনওয়ে কালে যদি ভূতের ব্যবস্থা করতে পারি তা হলে তোমারও লাভ, উনিও জব্দ। তাই দুদিন সময় চেয়ে নিয়েছিলাম। কঙ্কালটা আমার বন্ধু আর্টিস্ট কুলকার্নির বাড়ি থেকে আনা। ট্রেড়ল মেশিনটা শিবাজী জব প্রেসের। প্রোপ্রাইটার মধুকর ঢেঢ়ির ছেলে আমার সঙ্গে ইস্কুলে পড়ত। ওটার জন্যে কিছু দক্ষিণা লাগবে; আর ওদেরই আপিসের এক ছোঁকরা অন্ধকারে ঘাপটি মেরে ছিল; সে-ই কলটা চালায়। বেচারা অনেক মশার কামড় খেয়েছে। তাকে কিছু বকশিস দিয়েছি–
আমি আর কথা বলতে দিলুম না কুরেশিকে। এক হিসেবে পুরো টাকাটাই ওর প্রাপ্য, কিন্তু পাঁচশোর বেশি কিছুতেই নিতে রাজি হল না।
প্যাসেজ থেকে বেরিয়ে যখন ল্যান্ডিং-এ এসেছি, তখন কুরেশি বললে, একবার দোতলায় যাবে নাকি? দেখবার জিনিস আছে কিন্তু। এলেই যখন…
কাঠের সিঁড়ি দিয়ে যুদ্ধের দামামার মতো শব্দ তুলে তিনজনে ওপরে হাজির হলুম। ল্যান্ডিং পেরিয়ে বৈঠকখানা। একটা শন্ শন্ মম্ মম্ শব্দ পাচ্ছিলুম, কিন্তু সেটা যে কী সেটা বুঝতে পারছিলুম না।
বৈঠকখানায় ঢুকে প্রচণ্ড চমক।
এ ঘর যে একেবারে আসবাবে ঠাসা। ভিক্টোরীয় যুগের সোফা, টেবিল, আয়না, মার্বেলের মুর্তি, দেয়ালের বাতি, কার্পেট, ঝাড়লণ্ঠন–কোনওটাই বাদ নেই। মনে হয় ঠিক যেমন ছিল তেমনিই আছে, তবে সব কিছুরই উপর আশি বছরের ধুলো জমে সেগুলোর আসল চেহারা বেমালুম ঢেকে দিয়েছে।
কিন্তু মোক্ষম চমকটা ঘরের মেঝে বা দেয়ালে নয়, সেটা হল সিলিং-এ।
সিলিং-এ দুলছে একটি বিশাল শতচ্ছিন্ন টানা পাখা, যার হাওয়া এই জুন মাসের ঘাম ছুটোনো গরমে আমাদের প্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু এই পাখা টানছে কে? আর টানছে কী ভাবে? কারণ পাখার কোনও দড়ি নেই।
অর্থাৎ সেটাকে টানার কোনও উপায় নেই।
ভূতের উৎপাত বলে এ ঘরে কেউ প্রবেশ করেনি, বলল কুরেশি। তাই জিনিসগুলোও নিলাম হয়নি। আমি ঘরটা আবিষ্কার করি ভুতের সব ব্যবস্থা করার পর। তারপর ভেবে মনে হল কঙ্কাল আর ট্রেল মেশিনে ব্যাপারটা আরও জমবে।
অবাক বিস্ময়ে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইলুম অশরীরী পাংখাবারদারের অদৃশ্য হাতে টানা পাখার দিকে। ভূত বলেই তার ক্লান্তি নেই ঘুম নেই, সাহেবের লাথিতে মৃত্যু নেই।
আমরা যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছি তখনও বেশ কিছুক্ষণ ধরে শুনতে পেলুম ওই টানাপাখার শব্দ।
কঙ্কাল আর ছাপার কলের ব্যাপারটা কুরেশির কারসাজি জেনে মনে একটা খচখচে গিল্টি ভাব জেগে উঠেছিল; এখন বুঝতে পারলুম দিব্যি নিশ্চিন্ত লাগছে।
সন্দেশ, বৈশাখ ১৩৮৯
কাগতাড়ুয়া
মৃগাঙ্কবাবুর সন্দেহটা যে অমূলক নয় সেটা প্রমাণ হল পানাগড়ের কাছাকাছি এসে। গাড়ির পেট্রল ফুরিয়ে গেল। পেট্রলের ইনডিকেটরটা কিছুকাল থেকেই গোলমাল করছে, সে কথা আজও বেরোবার মুখে ড্রাইভার সুধীরকে বলেছেন, কিন্তু সুধীর গা করেনি। আসলে কাঁটা যা বলছিল তার চেয়ে কম পেট্রল ছিল ট্যাঙ্কে।
এখন কী হবে? জিজ্ঞেস করলেন মৃগাঙ্কবাবু।
আমি পানাগড় চলে যাচ্ছি, বলল সুধীর, সেখান থেকে তেল নিয়ে আসব।
পানাগড় এখান থেকে কতদূর?
মাইল তিনেক হবে।
তার মানে তো দু-আড়াই ঘণ্টা। শুধু তোমার দোষেই এটা হল। এখন আমার অবস্থাটা কী হবে ভেবে দেখেছ?
মৃগাঙ্কবাবু ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ, ভৃত্যস্থানীয়দের উপর বিশেষ চোটপাট করেন না, কিন্তু আড়াই ঘণ্টা খোলা মাঠের মধ্যে একা গাড়িতে বসে থাকতে হবে জেনে মেজাজটা খিটখিটে হয়ে গিয়েছিল।
তা হলে আর দেরি কোরো না, বেরিয়ে পড়ো। আটটার মধ্যে কলকাতা ফিরতে পারবে তো? এখন সাড়ে তিনটে।
তা পারব বাবু।
এই নাও টাকা। আর ভবিষ্যতে এমন ভুলটি কোরো না কখনও। লং জার্নিতে এসব রিস্কের মধ্যে যাওয়া কখনওই উচিত নয়।
সুধীর টাকা নিয়ে চলে গেল পানাগড় অভিমুখে।
মৃগাঙ্কশেখর মুখোপাধ্যায় খ্যাতনামা জনপ্রিয় সাহিত্যিক। দুর্গাপুরে একটি ক্লাবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁকে ডাকা হয়েছিল মানপত্র দেওয়া হবে বলে। ট্রেনে রিজার্ভেশন পাওয়া যায়নি, তাই মোটরে যাত্রা। সকালে চা খেয়ে বেরিয়েছেন, আর ফেরার পথে এই দুর্যোগ। মৃগাঙ্কবাবু কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন না, পাঁজিতে দিনক্ষণ দেখে যাত্রা করাটা তাঁর মতে কুসংস্কার, কিন্তু আজ পাঁজিতে যাত্রা নিষিদ্ধ বললে তিনি অবাক হবেন না। আপাতত গাড়ি থেকে নেমে আড় ভেঙে একটা সিগারেট ধরিয়ে তিনি তাঁর চারদিকটা ঘুরে দেখে নিলেন।
মাঘ মাস, খেত থেকে ধান কাটা হয়ে গেছে, চারদিক ধু-ধু করছে মাঠ, দুরে, বেশ দূরে, একটিমাত্র কুঁড়েঘর একটি তেঁতুলগাছের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এ ছাড়া বসতির কোনও চিহ্ন নেই। আরও দুরে রয়েছে একসারি তালগাছ, আর সবকিছুর পিছনে জমাট বাঁধা বন। এই হল রাস্তার এক দিক, অর্থাৎ পুব দিকের দৃশ্য।
