বাট এ স্কেলিটন ইজ নট এ গোস্ট।
ঠিকই বলেছেন মিঃ আপ্টে। এবং তিনিও যেমন দিব্যি স্বাভাবিক ভাবে বললেন কথাটা, তাতে তাঁর নার্ভের তারিফ না করে পারা যায় না।
সরি বললে কুরেশি, হঠাৎ সামনে কঙ্কালটা দেখে একটু বেসামাল হয়ে পড়েছিলাম।
কিন্তু ওটা কী?
প্রশ্নটা করলেন আগাশে। তাঁর টর্চের আলো এখন সিলিং থেকে নীচের দিকে নেমেছে।
ঘরের কোণে ধুলো আর মাকড়সার জালে মুড়ি দেওয়া কীসের জানি একটা স্তূপ।
আলোটা ভাল করে ধরতে বুঝতে পারলুম জিনিসটা কী, আর পেরে একেবারে তাজ্জব বনে গেলুম।
এ যে দেখছি ট্রেডল মেশিন! এখানে ছাপার যন্ত্র কী করছে?
আগাশে ব্যাপারটার একটা খুব সহজ এক্সপ্ল্যানেশন দিয়ে দিলেন। বললেন, এটা যদি সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটি হয়ে থাকে তা হলে ছাপার কল থাকা অস্বাভাবিক নয়। এক নম্বর—তাদের মুখপত্র লুকিয়ে ছাপবার জন্যে কলের দরকার হত; দুই সন্ত্রাসবাদীরা টাকার প্রয়োজনে নোট জাল করেছে এও অনেক শোনা গেছে।
রাধানাথ এ কথায় সায় দিল।
মাথার উপর ঝুলন্ত কঙ্কাল আর তার নীচে নির্জীব যন্ত্রটা অদ্ভুত ভাবে যেন এক অতীত যুগের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে কি? প্রশ্ন করলেন মিঃ আপ্টে।
আমরা সকলেই বললাম যে যখন এসেছি তখন সারা বাড়িটা না দেখে ফিরব না। আমিই অবিশ্যি কথাটায় সবচেয়ে বেশি জোর দিলাম। কঙ্কাল হল মৃতব্যক্তির দেহের পরিণাম। তার আত্মা কী অবস্থায় আছে তা কে বলতে পারে?
প্যাসেজ দিয়ে যখন উলটোমুখে অর্ধেক পথ এসেছি তখন শুনতে পেলাম সেন্ট মেরি চার্চের ঘড়িতে ঢং ঢং করে বারোটা বাজল। ঘণ্টার রেশ মিলিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা শব্দ শুরু হল যেটা আমাদের হাঁটা বন্ধ করে দিল।
যে ঘর থেকে এলাম, সে ঘর থেকেই আসছে শব্দটা।
ট্রেডল মেশিন চলতে শুরু করেছে, আর তার শব্দে সারা কনওয়ে কাসল গম্ গম্ করছে। সেই সঙ্গে মাথার উপর ডানার ঝটপটানি শুরু হয়েছে, কারণ ঘুলঘুলির বাসিন্দা পায়রাগুলোর ঘুম ভেঙে গেছে প্রেসের শব্দে।
আমরা ছজনে রুদ্ধশ্বাসে শব্দটা শুনছি। দ্বিতীয়বার ওই ঘরের দিকে যাবার কোনও মানে নেই, কারণ জানি সে ঘরে যন্ত্র চালানোর মতো কোনও লোক নেই। হয়তো ওই আচরেকারই এককালে যন্ত্রটা চালিয়েছে। তারপর এক সময়ে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে লাঞ্ছনা এড়াবার জন্য গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে। আর সেই থেকে প্রতিদিন মাঝরাত্তিরে তার প্রেতাত্মা ওই ট্রেড়ল মেশিন চালিয়ে এসেছে। তার মানে হেলমারের রেকর্ডারে যে শব্দটা উঠেছিল সেটা এটারই শব্দ।
কনওয়ে কালের বাইরে বেরোবার পর বেশ কিছুক্ষণ কারুর মুখে কথা নেই। হরিহরণ অসুস্থ বোধ করছে, সে গিয়ে তার গাড়িতে উঠে পড়ল। কথা ছিল আপ্টে তার গাড়িতে আমাদের বাড়ি পৌঁছে দেবে। তার ডজ সিডানে ওঠার আগে সে আমার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বলল, টেন হানড্রেডরুপি নোট্রস-গুনে নাও।
আমার তখন রীতিমতো অসোয়াস্তি লাগছে। তবে এ তো আর এলেবেলে খেলা নয়–এ বেট ইজ এ বেট।
খাম থেকে নোটের গোছাটা বার করে রাস্তার আলোতে একবার দেখে নিলুম। দশখানাই আছে।
তিনদিন পরে এক শনিবারের সন্ধ্যায় নেপিয়ার হোটেলে ডিনার হল। আমিই খাওয়ালুম। তখনকার সস্তাগণ্ডার দিনে সাত জনের বিল হল একশো নব্বই টাকা। আজ হলে বড় হোটেলে সাত জনের ফাইভ-কোর্স ডিনার হাজার টাকায় হত কি না সন্দেহ।
গল্প শুনে ন্যাপলা বলল, তা হলে খুব দাঁও মারলেন বলুন।
খুড়ো উত্তর দিতে একটু সময় নিলেন, কারণ সদ্য আনা তৃতীয় কাপ চায়ে গলা ভেজানো আছে, তারপর বিড়ি ধরানো আছে।
তা বটে, অবশেষে বললেন খুড়ো, তবে ঘটনার শেষ এখানেই নয়।
আরও আছে? আমরা সকলেই প্রশ্ন করলাম। এর পরে আর কী থাকতে পারে সেটা ভেবে পাচ্ছিলাম না।
তারিণীখুড়ো বলে চললেন—
.
ঘটনার কদিন পরে এক সকালে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হল আমাদের আড্ডার সাংবাদিক আনওয়র কুরেশি। বললে, আমার গাড়ি আছে, তোমাদের একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। বিশ মিনিট স্পেয়ার করতে পারবে?
কৌতূহল হল। রাধানাথ আর আমি গিয়ে উঠলুম তার গাড়িতে। কুরেশি নিজেই ড্রাইভ করে। কিছুদুর যেতেই বুঝলাম গাড়ি চলেছে আবার সেই কনওয়ে কাসূলের দিকে। কেন যাচ্ছে সে কথা বললে না ছোরা, খালি বললে এ কদিনে সে নাকি আরও তথ্য আবিষ্কার করেছে কনওয়ে সাহেব সম্বন্ধে।
একটি খবর নাকি বিলিতি কাগজে ছাপেনি, দিশি কাগজে পেয়েছে সেটা কুরেশি। ব্রিগেডিয়ার কনওয়ে তাঁর এক পাংখাবরদারকে বুট দিয়ে লাথিয়ে মেরে ফেলেছিলেন। তাতে রাধানাথ বললে সেটা নাকি সে-যুগের একটা স্বাভাবিক ঘটনা। গরমকালে মাঝরাত্তিরে পাংখাবরদার পাখা টানতে টানতে ঘুমিয়ে পড়ত। মশার কামড়ে ঘুম ভেঙে যেত সাহেবের। আর তখন রাগে দিকবিদিকজ্ঞান হারিয়ে এমন প্রহার করত ভৃত্যকে যে সে বেচারা অনেক সময় মরেই যেত।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে গাড়ি গিয়ে থামল কনওয়ে কাসূলের গেটের সামনে।
কুরেশির পিছন পিছন আমরা গিয়ে ঢুকলাম কাসূলের ভেতর। দিনের বেলাও রীতিমতো অন্ধকার, ঢুকলে গা ছমছম করে।
আমরা কি আবার সেই ঘরেই যাচ্ছি?
রাধানাথের এ প্রশ্নের কোনও জবাব দিলে না কুরেশি। তবে তার লক্ষ্য যে ওই একই ঘরের দিকে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কী দেখব কে জানে। শিরার মধ্যে একটা চাঞ্চল্য অনুভব করছিলুম। কুরেশি ছোঁকরা নির্বিকার।
