নারায়ণবাবুর মুখে এই প্রথম হাসির রেখা ফুটে উঠল। তিনি বললেন, হানাবাড়ি বলে বলছেন তো? তা, ভূত যদি আসে তা হলে তো ভালই, একজন সঙ্গী পাওয়া যাবে।
আপনি বোধহয় আমাদের কথাটা সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না, বললেন হারু তালুকদার। কলকাতার এক ডাক্তার এখানে সপরিবারে এসেছিলেন। ভদ্রলোক নিজের চোখে দেখেছিলেন ভূত। আর সে নাকি বীভৎস ব্যাপার। প্রায় পনেরো মিনিট পরে জ্ঞান ফেরে ভদ্রলোকের। এখানে ভাল ডাকবাংলো আছে; ম্যানেজার আপনার খুব ভক্ত। বললে উনি নিজে সব ব্যবস্থা করে দেবেন। আপনি লিলি ভিলা ছাড়ুন।
এইবার নারায়ণ শর্মা একটা অদ্ভুত কথা বললেন।
আপনারা বোধহয় জানেন না যে, প্রেততত্ত্ব সম্বন্ধে আমি যতটা জানি ততটা খুব কম লোকেই জানে। আমার এখানকার লেখার বিষয়ও হচ্ছে ওই প্রেততত্ত্ব। সেই ডাক্তারের অবস্থায় আমাকে কোনওদিন পড়তে হবে না এটা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি। তিনি ভূতের বিরুদ্ধে কোনও প্রিকশন নেননি, কোনও ব্যবস্থা করেননি; আমি সেটা নেব এবং করব। ভূত আমার কিছু করতে পারবে না। আপনারা সদুদ্দেশ্য নিয়েই উপদেশ দিতে এসেছেন তা জানি, কিন্তু আমি এই লিলি ভিলাতে থেকেই কাজ করতে চাই। এ বাড়িতে আমি ছেলে বয়সে এসেছি। তখনকার অনেক স্মৃতি আমার এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ভূতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথাটা আমি এই প্রথম শুনলাম। কথাটা ভাল লাগল না। আর প্রেততত্ত্ব? ভূত নিয়েও তত্ত্ব হয় নাকি? এসব কী বলছেন নারায়ণ শর্মা?
অবিশ্যি এখন এসব ভেবে কোনও লাভ নেই। রাতটা আসুক; আপনা থেকেই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আমার বিশ্বাস।
তবে এই ব্যবস্থার কথাটা শুনে অবধি আমার মন বলছিল যে খবরটা একবার–অন্তত মজা দেখার জন্যও–ভীম নস্করকে জানানো উচিত। সে জ্যান্ত মানুষের ঘাড় মটকাবার কায়দা রপ্ত করেছে; না জানি সে এ খবর শুনে কী বলবে!
বেলা যতই বাড়তে লাগল ততই আমার ছটফটানিও বেড়ে চলল। শেষটায় আর না পেরে অদৃশ্য অবস্থায় মল্লিকদের দুশো বছরের পুরনো পোড়ো বাড়িটায় গিয়ে নস্করদার নাম ধরে ডাক দিলাম। সে দোতলার পুবদিকের ছাত ভাঙা ঘরটা থেকে হাওয়ায় ভেসে নীচে এসে বেশ কড়া সুরেই বলল, এই অসময়ে কেন?
আমি তাকে নারায়ণ শর্মার কথাটা বললাম। শুনে নস্করদা প্রচণ্ড কুটি করে বলল, বটে? বলি, ব্যবস্থা কি সে একাই করতে পারে? আমরা পারি না?
কী ব্যবস্থা করবে?ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি। আমি বুঝেছিলাম যে নস্করদার মাথায় ফন্দি খেলছে।
নস্করদা বলল, কেন? বেঁচে থাকতে বত্রিশ বছর ধরে ব্যায়াম করেছিলুম–ডন বৈঠক মুগুর ডামবেল চেস্ট-এক্সপান্ডার কিছুই বাদ দিইনি। নারায়ণ ছোঁকরার ঘাড় মটকাবার শক্তি কি আমার নেই?
ব্যায়াম যে সে করত সেটা ভীম নস্করকে দেখলেই বোঝা যায়। সে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল; তাতে তার দেহের কোনও বিকার ঘটেনি; তাই এখনও হাত পা নাড়লে শরীরে মাংসপেশি ঢেউ খেলে যায়। আমি বললাম, তা হলে?
আমি জানি যে আমার হৃৎপিণ্ড থাকলে তা এখন ধুকপুক করত।
তা হলে আর কিছুই না, বলল নস্করদা। আজ রাত বারোটায় নারায়ণ শর্মার আয়ু শেষ। ভূতের সঙ্গে চালাকি করলে আর যেই করুক, ভূত কখনও ক্ষমা করবে না।
বাকি দিনটা যে কীভাবে কাটল তা আমিই জানি। এদিকে নারায়ণ শর্মা সারাদিন তাঁর ঘরে বসে লিখেছেন। বিকেলে সূর্য ডোবার বেশ কিছু আগে ভদ্রলোক ঘর থেকে বেরিয়ে উত্তরের রাস্তাটা ধরে বেশ খানিক হেঁটে আকাশে সন্ধেতারাটা বেরোবার কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ি ফিরলেন। আজ অমাবস্যা, তাই চাঁদ নেই।
আমি আমার ডেরা থেকে সবই লক্ষ করে যাচ্ছি। এবার নারায়ণ শর্মাকে দেখলাম একটা অদ্ভুত জিনিস করতে। সুটকেস খুলে একটা থলে বার করে তার থেকে একটা গুঁড়ো জিনিসের এক মুঠো নিয়ে একটা ধুনুচির মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে তাতে আগুন দিয়ে ধুনুচিটা ঘরের দরজার চৌকাঠের বাইরে রেখে দিলেন। সেই ধুনুচি থেকে গলগল করে ধোঁয়া উঠতে লাগল, আর দক্ষিণের হাওয়া সেই ধোঁয়াকে সোজা এনে ফেলল আমার ডেরায়।
বাপ্ রে–এ কী ব্যবস্থা! ভূতেরা কোনও গন্ধ পায় না, কিন্তু এ গন্ধ দেখছি নাকের মধ্যে দিয়ে একেবারে ব্রহ্মতালুতে পৌঁছে গেছে। এ কী সর্বনাশ! এ অবস্থায় নস্করদাও এই বাড়ির ত্রিসীমানায় আসতে পারবে না।
আর সত্যিই তাই হল। মাঝরাত্তির নাগাদ আমার ঘরের পিছনের পাঁচিলের ওদিক থেকে চাপা গোঙানি শুনলাম–সুধন্য! ও সুধন্য!
সুধন্য আমার নাম।
বাইরে বেরিয়ে দেখি রাস্তার ধারে ঘাসের উপর নাক টিপে বসে আছে ভীম নস্কর। নাকিসুরেই কথা বলল সে
একুশ বছর হল গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটেছে আমার, আর এই প্রথম জ্যান্ত লোকের কাছে হার মানতে হল। মানুষ যে এত কল করতে পারে সে তো আমার জানা ছিল না।
ও লোকটা পড়াশুনা করে, নস্করদা। ও অনেক কিছু জানে।
ও হো হো!–এমন একটা লোকের ঘাড় মটকাতে পারলে কী সুখ হত বল দিকিনি।
সে যে আর হবার নয় সে তো বুঝতেই পারছ।
তা পারছি। আজ আসি। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা হল বটে!
নস্করদা চলে গেল, আর আমিও নিজের ঘরে ফিরে এলাম। আর তার পরেই বুঝতে পারলাম যে আমার ঘুম পাচ্ছে। ভূতের চোখে ঘুম–এ যে অভাবনীয়, অবিশ্বাস্য ব্যাপার! কিন্তু তা হলে কী হবে–ওই ধোঁয়াতে এমন জিনিস আছে যে, ভূতকেও ঘুম পাড়ায়। অথচ রাতই হল ভূতের চরে বেড়াবার সময়।
