এই ভিরমি দেবার ঘটনার পর থেকেই এ বাড়িতে আর কেউ আসে না, কারণ হানাবাড়ি বলে এটার একটা বদনাম রটে গেছে। আমার পক্ষে এটা লোকসান, কারণ বাড়িতে জ্যান্ত লোকজন থাকলে আমার বেশ ভালই লাগে। না হলে তো সেই একা একা দিন কাটানো। ভূত এ তল্লাটে আরও অনেক আছে, কিন্তু এ বাড়িতে তো নেই, কারণ এখানে আর কেউ কখনও অপঘাতে মরেনি। শহরের অন্য জায়গায় যে ভূত আছে তাদের সকলকে আমার পছন্দ নয়। কয়েকজন তো রীতিমতো মন্দ। যেমন নস্করদা, বা। ভীম নস্করের ভূত। ওর মতো কুচক্রী ফন্দিবাজ ভূত দুনিয়ায় দুটো হয় না। এই দেওঘরে কিছুদিন আগে লক্ষ্মণ ত্রিপাঠী বলে এক পোস্টমাস্টার ছিলেন। লক্ষ্মণের সঙ্গে সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিল স্টেট ব্যাঙ্কের কর্মচারী কান্তিভাই দুবের। এক সন্ধ্যায় লক্ষ্মণ ত্রিপাঠী পোস্টাপিস থেকে বাড়ি ফিরছেন; শাবাবুদের বাড়ি পেরিয়ে মাঠটার কাছে আসতেই ভীম নস্করের ভূত করল কি, ঝপ করে একটা তেঁতুল গাছ থেকে নেমে ত্রিপাঠী মশাইয়ের ঘাড়টা মটকে দিল। তারপর সে কী হই-হুল্লোড়!–থানা দারোগা কোর্ট কাঁচারি মামলা মকদ্দমা, সব শেষে ফাঁসি পর্যন্ত। কার ফাঁসি? লক্ষ্মণ ত্রিপাঠীর দুশমন কান্তিভাই দুবের। যে-খুনটা করল ভীম নস্করের ভূত, ঘটনাচক্রে সেই খুনের জন্য দায়ী হল কান্তিভাই দুবে। এই উদোর বোঝা যে বুধোর ঘাড়ে চাপবে সেটা জেনেশুনেই নস্করের ভূত করেছিল কাণ্ডটা। আমি বাধা দিয়ে নস্করদাকে বললাম যে তুমি কাজটা ভাল করোনি। ভূত হয়েছ বলেই যে জ্যান্ত মানুষের অপকার। করতে হবে এমন তো কোনও কথা নেই। তুমি তোমার রাজ্যে তোমার ধান্দা নিয়ে থাকো, আর জ্যান্তরা থাকুক তাদের ধান্দা নিয়ে। দুই জগতে ঠোকাঠুকি হলেই যত অনাসৃষ্টি।
আমি নিজে সজ্ঞানে কোনও জ্যান্ত মানুষের অনিষ্ট করতে যাইনি। বিশেষ করে যেদিন থেকে বুঝেছি যে আমার চেহারাটা মানুষের মনে আতঙ্ক জাগায়, সেদিন থেকে আমি একদম সাবধান। লিলি ভিলার পিছনে আম কাঁঠাল বনের একপাশে একটা পুরনো ভাঙা মালির ঘর আছে, সেইখানেই আমি পড়ে থাকি বেশির ভাগটা সময়। অবিশ্যি লিলি ভিলা এখন অনেকদিন থেকেই খালি; কিন্তু কাছেই চৌধুরী বাড়ি থেকে ছেলেরা এখানে লুকোচুরি খেলতে আসে। আশ্চর্য, এই ছেলেগুলোর একদম ভূতের ভয় নেই। কিংবা হয়তো ভূত আছে জেনেই তারা এখানে আসে। যাই হোক, সেই সময়টা আমাকে একদম অদৃশ্য থাকতে হয়। বড়রাই যদি আমাকে দেখে ভিরমি যায়, তা হলে ছোটদের কী অবস্থা হবে ভাবো তো! না; ওসবের মধ্যে আমি নেই।
তবে এটাও ঠিক যে, ভূতদেরও একা-একা লাগে। আমারই একটা গলতির জন্য লিলি ভিলা এখন। হানাবাড়ি। তাই এখানে কেউ এসে থাকতে চায় না; আর আমিও জ্যান্ত মানুষের গলার আওয়াজ, তাদের চলাফেরা কাজকর্ম হাসি-তামাশার শব্দ কিছুই পাই না। তাই মনটা এক-একসময় হু হু করে ওঠে। জ্যান্তরা যদি জানত যে ভূতরা তাদের সান্নিধ্য কত পছন্দ করে, তা হলে কি তারা ভূতকে এত ভয় পেত? কখনওই না।
কিন্তু লিলি ভিলাতেও শেষ পর্যন্ত লোক এসে হাজির হল। একদিন সকালে একটা সাইকেল রিকশার হর্ন শুনে ঘর থেকে গলা বাড়িয়ে দেখি রিকশা থেকে মাল নামছে। কজন লোক? দুজন। একজন বাবু, আর একটি চাকর। তাই সই। বেশি লোকের দরকার নেই আমার। নাই-মামার চেয়ে কানা মামা ভাল।
ভূতরা দূর থেকেই খুব স্পষ্ট দেখতে পায়, তাই বলছি–বাবুটির বয়স বছর পঞ্চাশের কাছাকাছি, বেঁটে, মাথায় টাক, খোঁচা খোঁচা গোঁফ, ঘন ভুরু, আর ভ্রুকুটি করা চোখ। বাড়িতে ঢুকেই চাকরটিকে বাবু বললেন, সব দেখেশুনে বুঝে নাও। আধঘণ্টার মধ্যে আমার চা চাই। তারপর আমি কাজে বসব।
এই কথাগুলো অবিশ্যি আমি মালির ঘর থেকেই শুনতে পেলাম। আমরা যেমন দেখি বেশি, তেমনই শুনিও বেশি। আমাদের চোখ কান দুটোই যেন দুরবিনের মতো কাজ করে।
চাকর আধঘণ্টার মধ্যেই বাবুকে চা বিস্কুট এনে দিল। বাবু তখন বাগানের দিকের ঘরটায় তাঁর বাক্স খুলে জিনিসপত্র বার করে গুছিয়ে রাখছেন। জানালার সামনে একটা টেবিল-চেয়ার। তার উপর দোয়াত কলম কাগজ সব রাখা হয়েছে।
ইনি তা হলে লেখক। খুব নামকরা লেখক কি?
হ্যাঁ, তাই।
ভদ্রলোক আসার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দেওঘরের জনা আষ্টেক বাঙালি এসে হাজির হল লিলি ভিলাতে। তখনই জানলাম ভদ্রলোকের নাম নারায়ণ শর্মা। আসল নাম না ছদ্ম তা জানি না, তবে এই নামেই সকলে তাঁকে ডাকে। বাঙালির দল নারায়ণবাবুকে দেওঘরে পেয়ে কৃতার্থ। এতবড় একজন কাউকে তো সবসময় পাওয়া যায় না। তাই, যদি ভদ্রলোকের আপত্তি না থাকে, তা হলে এখানকার সকলে তাঁকে একদিন সংবর্ধনা জানাতে ইচ্ছুক।
নারায়ণ শর্মা লোকটি দেখলাম বেশ কড়া। বললেন, এখানে নিরিবিলিতে কাজ করতে পারব বলে কলকাতা ছেড়ে এলাম, আর আসামাত্র আপনারা এসে সংবর্ধনার জন্য পীড়াপীড়ি করছেন?
একথায় অবিশ্যি সকলেই একটা কাঁচুমাচু ভাব করলেন। তাতে আবার নারায়ণ শর্মা নিজেই নরম হয়ে বললেন, বেশ, আমাকে দিন পাঁচেক একটু নির্বাটে কাজ করতে দিন, তারপর হবেখন সংবর্ধনা। বেশি বিব্রত করলে কিন্তু আমি আবার তল্পিতল্পা গুটিয়ে কলকাতা ফিরে যাব।
এই সময় ঘোষ বাড়ির কর্তা নিতাইবাবু হঠাৎ একটা প্রশ্ন করে বসলেন যেটা আমার মোটেই ভাল লাগল না। তিনি বললেন, এখানে এত বাড়ি থাকতে আপনি লিলি ভিলায় এসে উঠলেন কেন?
