রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে সে গান ভেসে পৌঁছে গেল রাজবাড়ির দোতলার অন্তঃপুরে। আর সবাই ঘুমে অচেতন, কেবল একজন জেগে আছে তার রেশমের বালিশে মাথা দিয়ে। রাজকুমারী লক্ষ্মী।
গানের কলি তার কানে যেতেই লক্ষ্মী চমকে উঠে মোহিত হয়ে গেল। এই সুরই তো সেই ছেলেটি বাঁশিতে বাজিয়েছিল সংক্রান্তির মেলায়! এটা কী করে হয়?
তারপর রাজকন্যার মনে পড়ল ঘোষণার কথা। উজলপুরের রাজার ঘোষণা দেশে দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এ কদিনের মধ্যে। যে এই দানবকে মারতে পারবে সে পাবে অর্ধেক রাজত্ব, আর সেইসঙ্গে রাজকন্যাকে। এই রাক্ষসই তো সেই দানবকে মেরেছে!
একি সত্যিই রাক্ষস?
এদিকে রতন গান গেয়েই চলেছে। রাজকন্যা লক্ষ্মীর চোখে ঘুম নেই। তার মাথায় অদ্ভুত সব চিন্তা এসে জড়ো হয়েছে। কাল সকালে সে বাবার সঙ্গে দেখা করবে। তার মন বলছে
না, এখনও কিছু বলছে না তার মন, কিন্তু তার মাথার মধ্যে সব গণ্ডগোল হয়ে গেছে। সে এই রহস্যের কোনও কিনারা করতে পারছে না।
শেষ পর্যন্ত লক্ষ্মীর চোখে ঘুম এল, আর ঘুমিয়ে সে স্বপ্ন দেখল সেই রাক্ষস তাকে বলছে, তুমি হ্যাঁ। বললেই আমার এ দশার শেষ হবে। তা ছাড়া আমার মুক্তি নেই।
পরদিন সকালে লক্ষ্মী তার বাবাকে ডেকে পাঠাল। রাজা তখন সবে নদীতে স্নান সেরে ফিরছেন। তিনি এসে বললেন, কী বলছ মা?
লক্ষ্মী সোজা বাপের দিকে চেয়ে বলল, আমি একবার রাক্ষসের সঙ্গে দেখা করতে চাই।
কেন মা? এমন ইচ্ছা কেন হল তোমার?
তুমি বলেছিলে, যে দানবকে মারবে তাকেই তুমি তোমার মেয়েকে আর অর্ধেক রাজত্ব দেবে। তুমি তো বলোনি যে সে যদি রাক্ষস হয় তা হলে দেবে না।
একি পাগলের মতো কথা বলছ তুমি? রাক্ষসের হাতে তুলে দেব তোমাকে আর অর্ধেক রাজত্ব?
কেন দেবে না? সে তো কোনও দোষ করেনি। তার চেহারাটাই যা খারাপ। কাল রাত্রে তার গান শুনেছি আমি। এমন আশ্চর্য সুন্দর গলা খুব কম মানুষের হয়।
তুমি তো মহা সমস্যায় ফেললে দেখছি!
বাবা। আমি ওকেই বিয়ে করব। একবার আমাকে ওর কাছে নিয়ে চলো।
যদি সে কিছু করে?
কিছু করবে না। আমার মন বলছে কিছু করবে না।
অগত্যা রাজা লক্ষ্মীকে নিয়ে গেলেন রাক্ষসের কাছে। আর সেখানে গিয়ে দেখলেন এক আশ্চর্য দৃশ্য।
এই সবে এক পক্ষকাল শেষ হল; আজ পূর্ণিমা। তাই রাক্ষসের গা থেকে লোম মিলিয়ে যাচ্ছে। তার নখ ছোট হয়ে যাচ্ছে, আর সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছোট হয়ে গিয়ে স্বাভাবিক মানুষের আকার নিচ্ছে, আর এ মানুষকে লক্ষ্মী চেনে।
সংক্রান্তির মেলায় একে দেখেছিল তার দিকে চেয়ে হাসতে।
আর এখন সেই হাসিই লেগে আছে রতনের ঠোঁটের কোণে।
রতন উঠে দাঁড়াল। তারপর মুখ খুলল। বলল, আমার নাম রতন।
আর আমার নাম লক্ষ্মী, বলল রাজকন্যা।
শোনো রতন, বললেন রাজা, আমি কথা দিয়েছি যে, যে দানবকে মারবে তাকে আমার অর্ধেক রাজত্ব, আর আমার মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেব।
সে তো ভাল কথা, বলল রতন।
কিন্তু তোমার এমন দশা হল কী করে? জিজ্ঞেস করল রাজকন্যা লক্ষ্মী।
রতন হাসল। তারপর বলল, সব বলব, আগে মণ্ডা মিঠাই আনো; বড় খিদে পেয়েছে।
নীলকমল লালকমল, ফাল্গুন ১৩৯২ (মার্চ ১৯৮৬)।
রতনবাবু আর সেই লোকটা
ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে নেমে এদিক ওদিক দেখে রতনবাবুর মনে একটা খুশির ভাব জেগে উঠল। জায়গাটা তত ভাল বলেই মনে হচ্ছে। স্টেশনের পিছনে শিরীষ গাছটা কেমন মাথা উঁচিয়ে রয়েছে, তার ডালে আবার একটা লাল ঘুড়ি আটকে রয়েছে। লোকজনের মধ্যে ব্যস্ততার ভাব নেই, বাতাসে কেমন একটা সোঁদা গন্ধ–সব মিলিয়ে দিব্যি মনোরম পরিবেশ।
সঙ্গে একটা ছোট হোন্ডল আর চামড়ার একটা ছোট সুটকেস। কুলির দরকার নেই; রতনবাবু সেগুলো দুহাতে তুলে নিয়ে স্টেশনের গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন।
বাইরে সাইকেল-রিকশা পেতে কোনও অসুবিধা হল না। ডোরাকাটা হাফপ্যান্ট পরা ছোঁকরা চালক জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবেন বাবু?
রতনবাবু বললেন, নিউ মহামায়া হোটেল–জানো?
ছোঁকরা ছোট্ট করে মাথা নেড়ে বলল, উঠুন।
ভ্রমণ জিনিসটা রতনবাবুর একটা বাতিক বলেই বলা যেতে পারে। সুযোগ পেলেই তিনি কলকাতার বাইরে কোথাও ঘুরে আসেন। অবিশ্যি সুযোগ যে সবসময় আসে তা নয়, কারণ রতনবাবুর একটা চাকরি আছে। কলকাতার জিয়োলজিকাল সার্ভের আপিসে তিনি একজন কেরানি। আজ চব্বিশ বচ্ছর ধরে তিনি এই চাকরি করছেন। তাই বাইরে বেড়িয়ে আসার মতো সুযোগ তাঁর বছরে একবারই আসে। পুজোর ছুটির সঙ্গে তাঁর বাৎসরিক পাওনা ছুটি জুড়ে নিয়ে তিনি প্রতি বছরই কোথাও না কোথাও ভ্রমণ করে আসেন।
এই বেড়ানোর ব্যাপারে রতনবাবু সঙ্গে আর কাউকে নেন না, বা নেবার ইচ্ছেটাও তাঁর মনে জাগে না। প্রথম প্রথম যে সঙ্গীর অভাব বোধ করতেন না তা নয়; তাঁর পাশের টেবিলের কেশববাবুর সঙ্গে এককালে তাঁর এই নিয়ে কথা হয়েছিল, মহালয়ার কয়েকদিন আগে। রতনবাবু তখন সবে ছুটির প্ল্যান করেছেন; তিনি বলেছিলেন, আপনিও তো মশাই একা মানুষ চলুন না এবার পুজোয় দুজনে একসঙ্গে কোথাও ঘুরেটুরে আসি।
কেশববাবু তাঁর কলমটা কানে গুঁজে হাত দুটোকে জড়ো করে তাঁর দিকে চেয়ে মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বলেছিলেন, আপনার পছন্দর সঙ্গে আমার পছন্দ কি মিলবে? আপনি যাবেন সব উদ্ভট নাম-না-জানা জায়গায়। সেখানে না আছে দেখবার কিছু না আছে থাকা-খাওয়ার সুবিধে। আমায় মাফ করবেন। আমি যাচ্ছি হরিনাভিতে আমার ভায়রাভাইয়ের কাছে।
