আধঘণ্টার মধ্যেই রতন ডম্বরি পাহাড়ের কাছে পৌঁছে গেল। পাহাড়ের চারিদিকে ঘিরে আছে ঘন বন। সেই বন ধরে এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের গায়ে এক জায়গায় একটা প্রকাণ্ড গুহা দেখতে পেল রতন। এটাই কি দানবের গুহা? হ্যাঁ, এটাই। কারণ তার প্রখর দৃষ্টিশক্তির জোরে সে দেখতে পেয়েছে যে, গুহাটার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে আছে অনেক মানুষের হাড়।
রতন একটা বটগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তার কান তাকে বলল যে, ঘোড়ার খুরের শব্দ এগিয়ে আসছে।
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছে রতন। একটা ঘোড়া নয়, অনেক ঘোড়া। তবে একটা ছাড়া আর সবগুলোই একটা জায়গাতেই এসে থেমে গেল। তাদের পিঠে রয়েছে বল্লমধারী সৈন্য। আর, যে ঘোড়াটা পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলল তার পিঠে আছে রাজকুমার চন্দ্রসেন।
রাজকুমার নির্ভয়ে পাহাড়ের গা দিয়ে উঠে গেল দানবের গুহা লক্ষ্য করে। গুহার মুখে এসে ঘোড়া থামাল সে। এবার সেনারা দামামা বাজিয়ে জানান দিল যে রাজকুমার উপস্থিত। এই শব্দেই দানবের বাইরে বেরোনো উচিত; এবার তার রাজকুমারের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
রতনকে আর অপেক্ষা করতে হল না। দামামা বাজানোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা বিকট হুঙ্কার দিয়ে দানব এক লাফে গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে এল–তার পায়ের চাপে কিছু বড় পাথর পাহাড়ের গা বেয়ে নীচের দিকে গড়িয়ে এল সশব্দে।
দানবটা যে কত বড় সেটা ঘোড়ার পিঠে রাজকুমারের পাশে তাকে দেখে বোঝা গেল। রতন প্রমাদ। গুণল। চন্দ্রসেন বিদ্যুদ্বেগে তীর ছুঁড়তে আরম্ভ করেছে দানবের দিকে, কিন্তু সে তীর দানবের পুরু চামড়া ভেদ করতে না পেরে চতুর্দিকে ছিটকে পড়ছে।
দানব যেন এটা উপভোগই করছে এমন ভাব করে কিছুক্ষণ বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আরেকটা হুঙ্কার দিয়ে সে ঘোড়ার পিঠে চন্দ্রসেনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ঠিক এই মুহূর্তেই রতন বুঝল যে, তার আর চুপ করে থাকা চলে না। সে বটগাছের পাশ থেকে বেরিয়ে কয়েকটা বিশাল লাফ দিয়ে পাহাড় বেয়ে পৌঁছে গেল দানবের পাশে। দানব তখন দুহাত দিয়ে ঘোড়াসমেত চন্দ্রসেনকে জাপটে ধরেছে, চন্দ্রসেনও ছটফট করছে এই নাগপাশ থেকে মুক্তি পাবার জন্য। এমন সময় এই নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীকে দেখতে পেয়ে দানব হঠাৎ হতভম্ব হয়ে ঘোড়াকে ছেড়ে দিল। তারপরেই সে ধেয়ে এল রতনের দিকে।
কিন্তু রতনের খাদ্য বন্য পশু আর দানবের খাদ্য মানুষ, দানব এই রাক্ষসের সঙ্গে পারবে কেন? দানবকে দুহাতে জাপটে নিয়ে তাকে মাথার উপর তুলে রতন প্রথম বুঝল তার নিজের শরীরে কত শক্তি হয়েছে। সেই অবস্থা থেকে সে পাহাড়ের গায়ে একটা প্রকাণ্ড পাথরের উপর দানবকে আছড়ে ফেলল। দানবের জানও কম কড়া নয়; সে সেই অবস্থা থেকে দাঁড়িয়ে উঠে আবার রতনের দিকে ধেয়ে এল। রতন আবার তাকে দুহাতে জড়িয়ে এবার আর ছুঁড়ে না ফেলে শুধু চাপের জোরে তাকে শেষ করার চেষ্টা করল।
সে চাপ যেন সহস্ৰ অজগরের চাপ। দানব হাত পা ছুঁড়তে চেষ্টা করেও পারল না। তার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। তার মুখ হাঁ করে জিভ বেরিয়ে গেছে, আর সেই মুখের মধ্যে দিয়ে রতনের চাপের চোটে দানবের শেষ নিশ্বাস বেরিয়ে এল। এবার রতন হাত আলগা দিতেই দানবের নিষ্প্রাণ দেহ পাহাড়ের গা দিয়ে গড়িয়ে একেবারে নীচে গিয়ে পড়ল। এমন সময় কোলাহল শোনা গেল। সৈন্যদের কোলাহল। উজলপুরেও ঝলসির বনের রাক্ষসের খবর পৌঁছে গেছিল, এখন সেই রাক্ষস এখানে হাজির দেখে একশো সেনা তাদের বল্লম উঁচিয়ে ধেয়ে এল রতনের দিকে।
এইবারে দুটো ব্যাপার ঘটল: রতন কোনওরকম আক্রোশ দেখাল না। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল গুহার সামনে। আর চন্দ্রসেন সৈন্যদের দিকে হাত তুলে বলল, এ রাক্ষসই হোক আর যাই হোক, এ আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে, আর দানবের সংহার এ-ই করেছে; আমার দ্বারা এ কাজ হত না। কাজেই একে তোমরা রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাও; দেখো যেন এর অনিষ্ট না হয়। ৫১০
রতনকে নিয়ে সৈন্যদের কোনও বেগই পেতে হল না; তারা তাকে নিয়ে রাজপ্রাসাদের দিকে চলল, আর রতনও সে ব্যাপারে কোনও আপত্তি করল না।
রাজপ্রাসাদের কয়েদখানা রতনের পক্ষে যথেষ্ট বড় নয় বলে তাকে প্রাসাদের পিছনে একটা অশ্বত্থা গাছের সঙ্গে চারগাছা দড়ি দিয়ে বেঁধে দশজন সশস্ত্র প্রহরী পাহারা রেখে দেওয়া হল।
এবার রাজা নিজে এলেন রাক্ষসকে দেখতে। বন্য পশু খেয়ে রাক্ষস যে এমন শান্তশিষ্ট হতে পারে এটা রাজা ভাবতেই পারেননি।
আর আরেকজন তাকে দেখল প্রাসাদের দোতলার একটা জানালা থেকে, সে হল রাজকন্যা লক্ষ্মী। এমন কদাকার বিশাল একটা প্রাণী এমন নিরীহ ভাবে বসে থাকতে পারে তাদের দেশের এত বড় একটা শত্রুর প্রাণ সংহার করে, এটা লক্ষ্মীর কেমন যেন অদ্ভুত লাগল। এ কি সত্যিই রাক্ষস, না অন্য কিছু?
ক্রমে দিন ফুরিয়ে রাত এসে পড়ল। রতন এতই নির্জীব হয়ে পড়েছিল যে পেয়াদারা তাদের কাজে একটু একটু ঢিলে দিয়ে কেউ কেউ ঘুমিয়েই পড়েছিল। রতনের তাতে তাপ-উত্তাপ নেই; সে শুধু একজনের মন পাবার আশায় বসে আছে। এমন চেহারা নিয়ে যদিও সে আশা দুরাশা, কিন্তু রতন তবুও হাল ছাড়তে পারে না।
আকাশে চাঁদ দেখে, রাজবাড়ির বাগান থেকে ফুলের গন্ধ পেয়ে রতনের মনে একটা উদাস ভাব এল। চারিদিক নিঝুম হয়ে আছে। তার মধ্যেই রতনের মাথায় একটা গানেব কলি এল। তারপরেই সেই গান তার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল। প্রহরীদের মধ্যে যারা জেগে ছিল তারা অবাক হয়ে রাক্ষসের দিকে চাইল। এই রাক্ষস গান গায়? আর এত সুন্দর গলায়?
