দরজা খুলুন! দাদাবাবু!
চাকর অধীরের গলা।
দাঁড়া, এক মিনিট।
সুধীন বিছানা ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে দিল। অধীরের মুখে গভীর উদ্বেগ।
আপনি এত বেলা অবধি—
জানি। ঘুমটা একটু বেশি হয়ে গেছে।
এত হইহল্লা বাড়ির সামনে, কিছুই টের পেলেন না?
হইহল্লা?
চৌধুরীবাড়ির বড়বাবু যে মারা গেলেন কাল রাত্তিরে। গগনবাবু। চৌরাশি বছর বয়স হয়েছেল। ভুগছিলেন তো অনেকদিন। ঘরে বাতি জ্বালা থাকত রাত্তিরে দেখেননি?
তুই জানতিস ওঁর অসুখ?
জানব না? ওনার চাকর ভগীরথ–তার সঙ্গে তো দেখা হয় রোজ বাজারে।
বোঝো!
সন্দেশ, পৌষ ১৩৯০
গঙ্গারামের কপাল
নদীর ধারে খোলামকুচি দিয়ে ব্যাঙবাজি খেলতে খেলতে হঠাৎ গঙ্গারামের চোখে পড়ল পাথরটা। এ নদীতে জল নেই বেশি; যেখানে সবচেয়ে গভীর সেখানেও হাঁটু ডোবে না। জলটা কাঁচের মতো স্বচ্ছ, তাই তার নীচে লাল নীল সবুজ হলদে খয়েরি অনেক রকম পাথর দেখা যায়। কিন্তু এমন পাথর গঙ্গারাম এর আগে কোনওদিন দেখেনি। যতরকম রঙ হয় রামধনুতে, সব রঙ আছে এই পাথরে। আকারে একটা পায়রার ডিমের মতো। গঙ্গারাম জল থেকে পাথরটা তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে সেটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। বাঃ, কী সুন্দর! আপনা থেকেই বেরিয়ে পড়ল তার মুখ থেকে। তারপর সেটাকে সে। ট্যাঁকে খুঁজে নিয়ে বাড়িমুখো রওনা হল।
গঙ্গারাম থাকে বৈকুণ্ঠ গ্রামে। তার বাপ-মা মড়কে মারা গেছে যখন, তখন গঙ্গারামের বয়স সাড়ে চার। সে তার মামা গোপীনাথের ঘরে মানুষ হয়েছে। এখন তার বয়স আঠারো। তাকে গ্রামের সকলেই ভালবাসে, কারণ কারও কোনও উপকারে আসতে পারলে গঙ্গারাম সবচেয়ে বেশি খুশি হয়। তাই সকলেই বলে গঙ্গরামের মতো এমন সরল সদাশয় ছেলে আর দুটি হয় না। এ ছাড়া গঙ্গারামের চেহারাটিও ভাল, গ্রামে যাত্রা হলে সে তাতে রাজপুত্ত্বর সাজে আর অভিনয়ও করে দিব্যি। গঙ্গারামের অবস্থা যে ভাল তা নয় মোটেই। মামার চাষের জমি আছে কিছুটা, সেটা সে এখন নিজে চষতে পারে
বাতের জন্য, তাই খেতের কাজ গঙ্গারামকেই করতে হয়। যা ফসল হয় তাতে তাদের কোনওমতে চলে যায়। গঙ্গারামের একটা মামাতো ভাই আছে তার চেয়ে তিন বছরের বড়, নাম রঘুনাথ। রঘুনাথ কুসঙ্গে পড়ে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়, তাতে তার শাস্তি হয় তিন বছরের হাজতবাস। সেই তিন বছর কাটতে আর তিন মাস বাকি। বাবা গোপীনাথ বলেছে ছেলেকে আর বাড়িতে ফিরিয়ে নেবে না।
নদীর ঘাটে খেলা সেরে বাড়ি ফেরার পথে গঙ্গারাম একবার সুবলকাকার বাড়ি হয়ে গেল। সুবলকাকার কদিন থেকে সর্দিজ্বর। তার একটা পা খোঁড়া, তাই সে লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারে না। গঙ্গারাম তাকে এসে দেখার জন্য শশী কবিরাজকে খবর দেয়, শশী রুগি দেখে ঔষধ বলে দিয়ে যায় চাকুলে পাতার রস। সে পাতাও গঙ্গারাম বনবাদাড়ে ঘুরে ঘুরে বিছুটির কামড় খেয়ে জোগাড় করে এনে দেয়।
আজ গঙ্গারাম দেখল সুবলকাকা অনেকটা ভাল। একবার মোদা বুড়ির বাড়িতেও যাবার ইচ্ছা ছিল, বুড়ি গ্রামের একপ্রান্তে একা থাকে সেইজন্য, কিন্তু সুবলকাকার বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখল আকাশে মেঘের ঘনঘটা।
গঙ্গারাম পা চালিয়ে বাড়িমুখো চললেও বৃষ্টি এড়াতে পারল না। অবিশ্যি বৃষ্টিতে ভিজতে তার ভালই লাগে, কিন্তু ও মা–আজ যে জলের সঙ্গে শিল পড়তে শুরু করল। আর এমন শিল গঙ্গারাম তার বাপের জন্মে দেখেনি। একেকটা শিল যেন একেকটা তাল। ফটাস ফটাস করে রাস্তায় পড়ছে আর ফেটে চৌচির হয়ে বরফ ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। যদি একটা মাথায় পড়ে?
মাথায় পড়ল ঠিকই, তবে সেটা গঙ্গারামের নয়। শ্রীনিবাস-ময়রার বুড়ো বাপ ভুজঙ্গ লাঠি হাতে ঠক ঠ করে যাচ্ছিল রাস্তা দিয়ে, সোজা তার মাথায় একটা শিল পড়ে গঙ্গারামের চোখের সামনে বুড়ো মাথা ফেটে অক্কা পেল। আর তারপর গাঁয়ের কেলো কুকুরটাও মরল মাথায় ওই রাবুণে শিল পড়ে। গঙ্গারাম ভেবেছিল তেলিপাড়ার বুড়ো অশ্বত্থ গাছটার তলায় আশ্রয় নেবে, কিন্তু সেইসঙ্গে শিল কুড়িয়ে নিয়ে তাতে কামড় দেবার লোভটাও সামলাতে পারল না। অথচ গাঁয়ের সব লোক হয় গাছতলায় না হয় বাড়ির দাওয়ায় আশ্রয় নিয়েছে। দুএকজন গঙ্গারামকে রাস্তায় দেখে চেঁচিয়ে তাকে সাবধান করে দিল, কিন্তু গঙ্গারাম তাদের কথায় কান দিল না। আর এও ঠিক যে, তার চতুর্দিকে শিল পড়লেও তার গায়ে পড়েনি। গঙ্গারামের কপাল মন্দ বলেই সকলে জানত–যদিও গঙ্গারাম কোনওদিন নিজেকে দুঃখী বলে মনে করেনি–কিন্তু আজ যে ঘটনা ঘটল তাতে বলতেই হয় যে, তার কপাল খুলে গেছে।
এই ঘটনার তিনদিন পরে খেতে জমি চষতে গিয়ে গঙ্গারামের লাঙলে খটাং করে মাটির তলায় কী যেন একটা লাগল। গঙ্গারাম মাটি খুঁড়ে দেখল সেটা একটা পিতলের কলসি, তার মুখটা একটা পিতলের ঢাকনা দিয়ে বন্ধ, আর সেই ঢাকনা একটা লাল কাপড় জড়িয়ে তাকে গেরো দিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে সহজে না খোলে।
খেতে কাজ সেরে গঙ্গারাম কলসিটা বাড়িতে নিয়ে এল। বেশ ভারী কলসি; গঙ্গারামের গায়ে জোর আছে তাই সে বইতে পারল, না হলে দুজন লোক লাগত।
বাড়িতে এসে কাপড়ের গেরো খুলে ঢাকনা তুলে গঙ্গারাম দেখল কলসিটার ভিতর অনেকগুলো গোল গোল হলদে চাকতি রয়েছে, যেগুলো দিনের আলোতে ঝলমল করছে। গঙ্গারাম চোখে কখনও মোহর দেখেনি, নইলে সে বুঝত যে, সেগুলো সবই মোহর। এই এক কলসির মধ্যে যত স্বর্ণমুদ্রা ছিল তাতে একটা প্রাসাদ বানানো যায়। কিন্তু গঙ্গারাম ভাবলনা জানি এগুলো কীসের চাকতি। যেইভাবে ছিল সেইভাবেই পড়ে থাক।
