এখানে এসেই জগন্ময়বাবু তাঁর দিনের রুটিন ঠিক করে নিয়েছিলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে চা খেয়ে হাঁটতে বেরোন, ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট। তারপর বাংলোর বারান্দায় বা সামনের কম্পাউন্ডে বসে ম্যাগাজিন পাঠ–খান পঁচিশেক রিডারস ডাইজেস্ট নিয়ে এসেছেন তিনি বোনের বাড়ি থেকে,–তারপর স্নান-খাওয়া সেরে দিবানিদ্রা। বিকেলে চায়ের পর আবার পদব্রজে ভ্রমণ। রাত্রে সাড়ে আটটার মধ্যে খাওয়া শেষ করে ঘুম।
আজ সকালে বেড়িয়ে ফিরে এসেই চৌকিদার বনোয়ারিকে জিজ্ঞেস করলেন বিষফুলের কথা। অবিশ্যি প্রথমেই ফুলের কথাটা না-জিজ্ঞেস করে সেদিকে অগ্রসর হবার একটা রাস্তা তৈরি করে নিলেন।
ভগওয়ান বলে কোনও ছেলেকে চেনো?
হাঁ বাবু। ভিখুয়াকা লড়কা।
ভিখুয়া কে?
চৌকিদার বলল ভিখুয়া কাঠের মজুরি করে। চৌধুরীবাবুদের কাঠের গোলা আছে এই কাঠকুমরিতেই, সেখানে কাজ করে।
ভগওয়ানের বাড়ির দিকে রাস্তার ধারে একরকম ফুলের গাছ আছে। সে-গাছ নাকি বাতাসে বিষ ছড়ায়।–জানো?
হাঁ বাবু।
কথাটা সত্যি?
মর জাতা হ্যায়…সাঁপ, চুহা, বিচ্ছু-উচ্ছু…
বনোয়ারি রুটি আর ডিমের অমলেট রেখে টি-পট আনতে গেল।
এখানে এক সাহেব এসেছিল বছর তিনেক আগে? বনোয়ারি ফিরে এলে পর জিজ্ঞেস করলেন জগন্ময়বাবু। বনোয়ারি বলল সাহেব এসে থেকেছে এখানে। এককালে মুর সাহেব গিন্নীকে নিয়ে নিজেই আসতেন প্রতি শীতকালে। তিন বছর আগে কোনও সাহেব এসেছিল কি না তা বনোয়ারির মনে নেই।
জগন্ময়বাবু ঠিক করলেন বিকেলে একবার বাজারের দিকে যাবেন। বাজার পান্নাহাটে–এখান থেকে মাইল দুয়েক। রেলস্টেশনও সেখানেই। এখানে আসতে হলে স্টেশন থেকে সাইকেল রিকশা নিতে হয়। পান্নাহাট থেকে ট্রেন ধরে সোজা ডালটনগঞ্জ যাওয়া যায়। প্রথম দিন এসেই জগন্ময়বাবু একবার বাজারের দিকে গিয়েছিলেন। দুজন বাঙালির সঙ্গে আলাপ হয়েছে। পোস্টমাস্টার নুটবিহারী মজুমদার, আর পবিত্রবাবু বলে এক ভদ্রলোক, যিনি রয়েল হোটেলে উঠেছেন। মিঠে পানের খোঁজ করতে গিয়ে ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ। বললেন আগেও এসেছেন কাঠকুমরি। মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভের কাজ করেন। রয়েল হোটেল নাকি নামেই হোটেল–বলতে পারেন থ্রি-স্টার সরাইখানা। মনে হল বেশ রসিক লোক। বয়স ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের বেশি না। আপনি উঠেছেন কোথায়? কাঠঝুমরিতে তো থাকবার জায়গাই নেই। চৌধুরী কম্পানির কারুর সঙ্গে চেনা আছে বুঝি?
আজ্ঞে না, আমি উঠেছি মূর সাহেবের বাংলোতে।
ও–ওই শিশু গাছে ঘেরা কটেজ বাড়িটা?
জগন্ময়বাবু বললেন যে গাছে ঘেরা ঠিকই, তবে শিশু কি না বলতে পারবেন না, দেখে তো বুড়ো বলেই মনে হয়–হে হে।–আমি মশাই সেন্ট পার্সেন্ট শহুরে। বড় জোর আম জাম কলা নারকেল আর বট-অশ্বখটা চিনতে পারি–তার বাইরে জিজ্ঞেস করলেই মুশকিল।
এই পবিত্রবাবু আর নুটবিহারীকে আজ একবার জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে। চৌকিদারের কনফারমেশন যথেষ্ট নয়। আসলে জগন্ময়বাবু কলকাতায় গিয়ে এই বিষফুলের বিষয় কিছু লিখতে চান। এখনও পর্যন্ত কেউ লেখেনি। এই একটা ব্যাপারে পায়োনিয়ার হবেন তিনি।
নুটবিহারীবাবুকে জিজ্ঞেস করে বিশেষ ফল হল না। বললেন, আমি মশাই সবে লাস্ট ইয়ারে বদলি হয়ে এখানে এসিচি। স্থানীয় সংবাদ বিশেষ আমার কাছে পাবেন না। আপনি বরং আর কাউকে জিজ্ঞেস করুন।
পোস্টাপিস থেকে জগন্ময়বাবু গেলেন বাজারের দিকে। পান কেনা আছে, আর যদি একটা এক্সসারসাইজ বুক পাওয়া যায় তো কাজের কাজ হবে। লেখার জন্য তৈরি হতে হবে তো। কলম আছে সঙ্গে, খাতা আনেননি।
পবিত্রবাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল একটা চায়ের দোকানের সামনে। বেঞ্চিতে বসে বাংলা খবরের কাগজ পড়ছেন। বললেন, আসুন, চা খান। ওহে ভরদ্বাজ–দু কাপ–একের জায়গায় দুই।
জগন্ময়বাবু সোজা আসল প্রশ্নে চলে গেলেন।
আপনি বিষফুলের নাম শুনেছেন?
পবিত্রবাবু কাগজটা ভাঁজ করে জগন্ময়বাবুর দিকে চোখ তুললেন। হলদে কমলা বেগনি? তালহার যাবার পথে ডানদিকে রয়েছে তো? একটা ঢিবির ওপরে?
আপনি তো সব জানেন দেখছি!
বললুম তো–চারবার ঘুরে গেছি এখানে। বছর দুই থেকে দেখছি ওটা। প্রথম যেদিন দেখি সেদিন ঢিবির পাশে একটা আস্ত শুয়োরছানা মরে পড়েছিল।
বলেন কী! তা এই নিয়ে আপনি কাউকে বলেননি কিছু? আপনি তো কলকাতার লোক কাগজে-টাগজে–?
পবিত্রবাবু উড়িয়ে দিলেন। বলবার কী আছে মশাই? প্রকৃতির খামখেয়াল কত রকম হয় সব নিয়ে কি আর কাগজে লেখে? আরও কত হাজার রকম বিষফুল বিষফল বিষপোকা বিষপাখি রয়েছে পৃথিবীতে কে জানে। আরে মশাই, কলকাতাতে বাস, সেখানে হাওয়াটাই বিষাক্ত। প্রতি নিশ্বাসে পাঁচ সেকেন্ড করে আয়ু কমে যাচ্ছে–সেদিন দেখলুম কোথায় জানি লিখেছে। সেখানে ফুলের বিষ নিয়ে কে মাথা ঘামাতে যাচ্ছে মশাই?
কিন্তু এখানকার লোক…এদের পক্ষে তো এটা একটা ডেঞ্জার মশাই?
কাছে না ঘেঁষলেই হল। পাঁচ-সাত হাত দূরে থাকলেই তো সেফ। সেকথা এখানে সবাই জানে।…
জগন্ময়বাবু চা খেয়েই উঠে পড়লেন। অক্টোবরের মাঝামাঝি; সুয্যি ডুবলেই ঝন্ করে ঠাণ্ডা পড়ে। সর্দিগর্মির রিস্কটা না নেওয়াই ভাল।
চায়ের দোকানের পাশেই একটা মনিহারি দোকান থেকে খাতা কিনে ভদ্রলোক যখন বাড়ি ফিরলেন তখন সোয়া ছটা। মনে বেশ একটা উত্তেজনা অনুভব করছেন তিনি। পাকা কনফারমেশন পাওয়া গেছে, এবার উনি স্বচ্ছন্দে লিখতে পারেন। লেখাটা কোনও উদ্ভিদবিজ্ঞানীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে একটা বড় কাজ হবে। কাঠকুমরির নামটাও লোকের জানা উচিত। ট্যুরিস্ট ডিপার্টমেন্ট জানে কি নামটা? মনে তো হয় না।
