এই ক মাসে হাত পেকেছে, তাই দুপুর আড়াইটার মধ্যে মেক-আপ হয়ে গেল। চিমটে কমণ্ডলু নতুন কেনা, তাই তাদেরও একটু মেক-আপ করে পুরনো করে নেওয়া হল। চারটের মধ্যে সম্পূর্ণ তৈরি নিকুঞ্জ সাহা ওরফে ঘনানন্দ মহারাজ। একটা নাম না দিলে চলে না, যদিও নিকুঞ্জ মাঝে মাঝে বম বম। ছাড়া কথা বলবে না বলেই স্থির করেছে। সাধুরা অন্য জগতের মানুষ; সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের কথা বলতে হবে এমন কোনও কথা নেই। নামটা দরকার হচ্ছে সন্তোষের জন্য। সেই বলেছে, নিকুঞ্জদা, তুমি যখন গাড়ি থেকে নামবে, লোকে তো ঘিরে ধরবেই। তখন যদি জিজ্ঞেস করে কে, তার জন্য একটা নামের দরকার। ঘনানন্দ দিব্যি গম্ভীর নাম। সন্তোষ এখন নিশ্চিন্ত।
সন্তোষ সচরাচর নিজেই গাড়ি চালায়। কিন্তু এবার সে একটা ড্রাইভার সঙ্গে নিল। বলল, আমাকে সাধুবাবার সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে হবে, গাড়িটা কিন্তু আপনার জিম্মায় থাকবে।
একটা কথা নিকুঞ্জ সন্তোষকে না বলে পারল না। ওখানে পৌঁছনোর পর আমি কিন্তু একা হয়ে যেতে চাই। আমার লক্ষ্য হবে কালিকানন্দ। তাঁর আশেপাশে আরও পাঁচজন সাধুবাবা কি থাকবে না? নিশ্চয়ই থাকবে। আমি সেই দলে গিয়ে ভিড়ব। তুই বরং আলগা থেকে ভক্তদের দলে গিয়ে বসে পড়িস।
তোমার কোনও চিন্তা নেই, নিকুঞ্জদা।
সন্তোষের গাড়ি যখন তারাপীঠ শ্মশানে পৌঁছল, তখন সূর্য ডুবতে আরও আধ ঘণ্টা বাকি। আর পাঁচটা পীঠস্থানের মতো এখানেও লোকের ভিড়, পাণ্ডার ভিড়, পথের দুধারে লাইন করা দোকানে গাঁদাফুল আবির কুমকুম বই ক্যালেন্ডার চা বিস্কুট তেলেভাজা মাছিবসা-জিলিপি ইত্যাদি সবই রয়েছে।
নিউ মহামায়া কেবিনের পর নিকুঞ্জর এখানে এসে এক আশ্চর্য নতুন অভিজ্ঞতা হল। গেরুয়া পরা লোক দেখলেই লোকের মনে যে কী করে ভক্তিভাব জেগে ওঠে সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। গাড়ি থেকে নামামাত্র নিকুঞ্জ দেখল যে, গড় করা শুরু হয়ে গেছে। ছেলেবুড়ো মেয়েপুরুষ কেউ বাদ নেই। আপনা থেকেই আশীর্বাদের ভঙ্গিতে নিকুঞ্জর হাতটা উঠে সামনের দিকে এগোতে শুরু করল। শেষে এমন হল যে, হাত টেনে নেওয়ারও অবসর নেই। পাশে সন্তোষ না থাকলে তাকে বোধহয় এক জায়গাতেই আটকে পড়তে হত। দাদা সরুন, মা পথ দিন, পথ দিন–এই করে সন্তোষ কোনওমতে একটা অপেক্ষাকৃত জনবিরল জায়গায় নিয়ে গিয়ে ফেলল নিকুঞ্জকে। এখানে চারদিকে সাধুর অভাব নেই, ফলে আলাদা করে নিকুঞ্জর দিকে লোকের দৃষ্টি পড়ার কোনও কারণ নেই।
এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে নিকুঞ্জ দেখল যে, কিছুদূরে একটা বটগাছের নীচে একটা ভিড় দেখা যাচ্ছে। গেরুয়া ছাড়াও অন্য রঙ রয়েছে সেখানে। সন্তোষ বলল, আপনি একটু দাঁড়ান, আমি দেখে আসছি ওইখেনেই কালিকানন্দ বসেছেন কিনা। ওঁর সামনে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে তবে আমার কাজ শেষ। আমি আপনাকে চোখে চোখে রাখব, তারপর যখন যাওয়ার ইচ্ছে হবে তখন আমাকে ইশারা করলেই আমি বুঝতে পারব।
সন্তোষ দেখে এসে ফিসফিস করে জানাল ওই ভিড়টা কালিকানন্দের জন্যই বটে! আপনি সোজা এগিয়ে যান নিকুঞ্জদা। কুছ পরোয়া নেই।
পরোয়া নিকুঞ্জর এমনিতেও নেই। সে এখানে এসে অবধি অত্যন্ত সহজ বোধ করছে। সেইসঙ্গে একটা পরম তৃপ্তির ভাব। মেক-আপে তার জুড়ি কেউ নেই সে বিশ্বাসটা তার মনে আজ পাকা হয়েছে।
নিকুঞ্জ এগিয়ে গেল ভিড়ের দিকে। পথে দু-একজন গড় করল। নিকুঞ্জ যথারীতি হাত বাড়িয়ে আশীর্বাদ করল।
উদাত্ত কণ্ঠে উচ্চারিত বাণী কিছুক্ষণ থেকেই শোনা যাচ্ছে; নিকুঞ্জ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে শব্দ ক্রমশ জোর হয়ে আসছে। আরেকটু এগিয়ে যেতেই সে দেখতে পেল কালিকানন্দকে। বাঘের মতো চেহারা বটে, এবং বাঘছালের উপরেই বসেছেন তিনি। তিনিই বাণী শোনাচ্ছেন ভক্তদের। সবই ঘেঁদো কথা, কিন্তু বলার ঢঙে বিশেষত্ব আছে। আর সেইসঙ্গে চোখের দৃষ্টিতেও। মণিকে ঘিরে যে সাদা অংশ সেটা সাদা নয়, গোলাপি। গাঁজা খাওয়ায় ফল কি? হতেও পারে।
ভক্তের সংখ্যা পঞ্চাশ-ষাটের বেশি নয়, তবে একজন দুজন করে ক্রমেই বাড়ছে। ওই তো ভুজঙ্গবাবু আর তাঁর স্ত্রী! তনয়বাবুও নিশ্চয়ই আছেন ভিড়ের মধ্যে। ভুজঙ্গবাবুরা মনে হয় বেশ সকাল সকাল এসেছেন, কারণ তাঁদের স্থান ভক্তদের একেবারে প্রথম সারিতে।
কালিকানন্দের দুপাশে এবং পিছনে দশ-বারোজন গেরুয়াধারী বসেছেন, তাঁদের সকলেরই গোঁফদাড়ি জটা, রুদ্রাক্ষের মালা, সর্বাঙ্গে ভস্ম। অর্থাৎ নিকুঞ্জর সঙ্গে তাঁদের চেহারার তফাত করা প্রায় অসম্ভব।
নিকুঞ্জ ভিড়ের পিছন দিয়ে এগিয়ে গেল সাধুদের দলের দিকে। কোত্থেকে যেন একটা গান ভেসে আসছে–
কে হরি বোল হরি বোল বলিতে যায়
যা রে মাধাই জেনে আয়
বুঝি গৌর যায় আর নিতাই যায়
যাদের সোনার নূপুর রাঙ্গা পায়–
হঠাৎ গানটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। কেন? কারণ আর কিছুই না কালিকানন্দের কথা থেমে গেছে।
নিকুঞ্জের দৃষ্টি গেল সাধুবাবার দিকে।
কালিকানন্দ তার দিকেই চেয়ে আছে। একদৃষ্টে। রাঙা চোখে।
নিকুঞ্জের হাঁটা থেমে গেছে।
অন্যান্য সাধু আর ভক্তদের দৃষ্টিও তার দিকে।
এবার কালিকানন্দের উদাত্ত কষ্টে প্রশ্ন এল, বাবাজির ভেক ধরা হয়েছে, অ্যাঁ? গেরুয়া পরলেই সাধু হয়? গলায় মালা পরলেই সাধু? গায়ে ছাই মাখলেই সাধু? অ্যাাঁ? তোর আস্পর্ধা তো কম না? তোর জটা ধরে যদি টান দিই, তখন কী হবে? কোথায় যাবে তোর সাধুগিরি?
