অর্ধেন্দু হেসে উঠল।
এখানেই শেষ না, বলল কিরণ। আরও ব্যাপার আছে।
কী ব্যাপার?
ওঁর একটি ছেলে আছে। বাইশ বছর বয়স। ওঁর ছোট ছেলে। বি. কম. পাশ করেছে, কিন্তু চাকরি পায়নি এখনও। চেষ্টা করেও সুবিধা করতে পারছে না। প্রসন্ন স্যার বললেন, যদি তার জন্যে একটা কিছু করে দিতে পারি।
তুই কী বললি?
আমি বললাম, চেষ্টা করব। কী আর বলব বল!
ঠিক আছে। প্রসন্ন স্যারের ধারণাটা বজায় রাখতে হবে। নাহলে লোকটা মনে বড় কষ্ট পাবে। হাজার হোক, অভাবী লোক তো, তার উপরে অসুস্থ। আর এককালে ক্লাসে ভাল পড়াতেন সেটা বলতেই হবে। ওঁর কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি।
তা হলে কী করা যায় বল তো?
ওঁর ছেলেকে একটা চাকরি জোগাড় করে দিতে হবে। ছেলেটা লেখাপড়ায় কেমন?
বললেন তো ভাল, কিন্তু ব্যাকিং ছাড়া নাকি কিচ্ছু হচ্ছে না।
তা হলে এক কাজ কর।
ওঁর সঙ্গে দেখা করে বল, তোর আপিসে, অর্থাৎ আমার আপিসে গিয়ে দেখা করতে।
আমি চেষ্টা করে দেখি ওর জন্য কিছু করা যায় কিনা।
তাই বলব তো? তুই ঠিক বলছিস?
ঠিক বলছি। ওঁর ছেলের জন্য যদি কিছু করতে হয় তা হলে সানশাইনই করবে। মাকাল ফলের দ্বারা কিছু হবে না।
যাক, তুই আমাকে বাঁচালি!
তবে একটা কথা ভুলিস না।
কী?
প্রসন্ন স্যার এককালে তোর কী নাম দিয়েছিলেন, আর আজকাল তোর কী অবস্থা হয়েছে।
কিরণের মাথা হেঁট হয়ে গেল। সে বলল, বাবা মারা যাবার আগে ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন।
তা হলে?
তোর কথাটা মনে রাখব।
ঠিক তো?
ঠিক। কথা দিচ্ছি। কিরণ বিশ্বাস যে একেবারে শেষ হয়ে গেছে তা নয়।
.
পরদিন বিকেলে স্টেশন প্ল্যাটফর্মে আবার প্রসন্ন স্যারের সঙ্গে দেখা। বললেন, সানশাইন এখানে রয়েছে, জানিস তো?
জানি, কাল দেখা হয়েছে।
ছেলেটা একটুও বদলায়নি। বলল, আমার ছেলের জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে। তোকে আর দীপ্তেনের কথাটা বলিনি, কারণ জানি তোর দ্বারা কিছু হবে না।
আপনি ঠিক লোককেই ধরেছেন স্যার। আর আপনার নামকরণের কোনও তুলনা নেই!
শুকতারা, বৈশাখ ১৩৯৮
প্রোফেসর হিজিবিজবিজ
আমার ঘটনাটা কেউ বিশ্বাস করবে বলে বিশ্বাস হয় না। না করুক–তাতে কিছু এসে যায় না। নিজে চোখে না দেখা অবধি অনেকেই অনেক কিছু বিশ্বাস করে না। যেমন ভূত। আমি অবিশ্যি ভূতের কথা লিখতে বসিনি। সত্যি বলতে কি, এটাকে যে কীসের ঘটনা বলা চলে সেটা আমি নিজেই জানি না। কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছে, আর আমার জীবনেই ঘটেছে। তাই আমার কাছে সেটা সত্যি, আর তাই সেটার বিষয় লেখা আমার কাছে খুবই স্বাভাবিক।
আগেই বলে রাখি, যাঁকে নিয়ে এই ঘটনা তাঁর আসল নামটা আমি জানি না। তিনি বললেন তাঁর কোনও নামই নেই। শুধু তাই না, নাম নিয়ে একটা ছোটখাটো লেকচারই দিয়ে ফেললেন আমাকে। বললেন
নাম দিয়ে কী হবে মশাই? নাম একটা ছিল এককালে। সেটার আর প্রয়োজন নেই বলে বাদ দিয়ে দিয়েছি। আপনি এলেন, আলাপ করলেন, নিজের নামটা বললেন, তাই নামের প্রশ্নটা উঠছে। এমনিতে কেউ তো আসে না, আর তার মানে কারুর আমাকে নাম ধরে ডাকার প্রয়োজনও হয় না। চেনাশোনা কেউ নেই, কাউকে চিঠিপত্র লিখি না, কাগজে লেখা ছাপাই না, ব্যাঙ্কে চেক সই করি না কাজেই নামের প্রশ্নটাই আসে না। একটা চাকর আছে, সেটাও বোবা। বোবা না হলেও সে নাম ধরে ডাকত না; বলত বাবু। ব্যস ফুরিয়ে গেল। এখন কথা উঠতে পারে আপনি কী বলে ডাকবেন। এটা নিয়েই ভাবছেন তো?…
শেষটায় অবিশ্যি তাঁকে প্রোফেসর হিজিবিজবিজ বলে ডাকাই ঠিক হল। কেন, সেটা পরে সময়মতো বলছি। আগে একটু গোড়ার কথা বলে নেওয়া দরকার।
ঘটনাটা ঘটে গোপালপুরে। উড়িষ্যার গঞ্জম ডিসট্রিক্টে বহরমপুর স্টেশন থেকে দশ মাইল দূরে সমুদ্রের ধারে একটি ছোট্ট শহর গোপালপুর। গত তিন বছর আপিসের কাজের চাপে ছুটি নেওয়া হয়নি। এবার তিন সপ্তাহের ছুটি নিয়ে এই না-দেখা অথচ নাম-শোনা জায়গাটাতেই যাওয়া স্থির করলাম। আপিসের কাজের বাইরে আমার আরেকটা কাজ আছে, সেটা হল অনুবাদের কাজ। আজ পর্যন্ত আমার করা সাতখানা ইংরিজি রহস্য উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ বাজারে বেরিয়েছে। প্রকাশক বলেন বইগুলোর কাটতি ভাল। কতকটা তাঁরই চাপে নিতে হয়েছে ছুটিটা। এই তিন সপ্তাহের মধ্যে একটা গোটা বই অনুবাদ করার দায়িত্ব আমার স্কন্ধে রয়েছে।
গোপালপুরে আগে কখনও আসিনি। বাছাইটা যে ভালই হয়েছে সেটা প্রথম দিন এসেই বুঝেছি। এমন নিরিবিলি অথচ মনোরম জায়গা কমই দেখেছি। নিরিবিলি আরও এইজন্য যে, এটা হল অফ সীজন–এপ্রিল মাস। হাওয়া বদলের দল এখনও এসে পৌঁছয়নি। যে হোটেলে এসে উঠেছি, তাতে আমি ছাড়া আছেন আর একটিমাত্র প্রাণী–এক বৃদ্ধ আর্মেনিয়ান–নাম মিস্টার অ্যারাটুন। তিনি থাকেন হোটেলের পশ্চিম প্রান্তের ঘরে, আর আমি থাকি পূর্ব প্রান্তে। হোটেলের লম্বা বারান্দায় ঠিক নীচ থেকেই শুরু হয়েছে বালি; একশো গজের মধ্যেই সমুদ্রের ঢেউ এসে সেই বালির উপর আছড়ে পড়ছে। লাল কাঁকড়াগুলো মাঝে মাঝে বারান্দায় উঠে এসে ঘোরাফেরা করে। আমি ডেক-চেয়ারে বসে দৃশ্য উপভোগ করি আর লেখার কাজ করি। সন্ধ্যায় ঘণ্টা দুয়েকের জন্য কাজ বন্ধ রেখে বালির ওপর হাঁটতে বেরোই।
প্রথম দুদিন সমুদ্রের তীর ধরে পশ্চিম দিকটায় গেছি; তৃতীয় দিন মনে হল একবার পুব দিকটাতেও যাওয়া দরকার; বালির ওপর আদ্যিকালের নোনাধরা পোড়া বাড়িগুলো ভারী অদ্ভুত লাগে। মিস্টার অ্যারাটুন বলছিলেন এগুলো নাকি প্রায় তিন-চারশো বছরের পুরনো। এককালে গোপালপুর নাকি ওলন্দাজদের একটা ঘাঁটি ছিল। এসব বাড়ির বেশিরভাগই নাকি সেই সময়কার। দেয়ালের ইটগুলো চ্যাপটা আর ছোট ছোট, দরজা জানলার বাকি রয়েছে শুধু ফাঁকগুলো, আর ছাত বলতেও ছাউনির চেয়ে ফাঁকটাই বেশি। একটা বাড়ির ভিতর ঢুকে দেখেছি, ভারী থমথমে মনে হয়।
