সন্দেশ, বৈশাখ ১৩৯৬
নিধিরামের ইচ্ছাপূরণ
কোনও মানুষই তার নিজের অবস্থা সম্পর্কে ষোলো আনা সন্তুষ্ট বোধ করে না। কোনওনা-কোনও ব্যাপারে একটা খুঁতখুঁতেমির ভাব প্রায় সবার মধ্যেই থাকে। রাম ভাবে তার শরীরে আরও মাংস হল না কেন–হাড়গুলো বড্ড বেশি বেরিয়ে থাকে; শ্যাম ভাবে–আমার কেন গলায় সুর নেই, পাশের বাড়ির ছোঁকরা তো দিব্যি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গলা সাধে; যদু বলে–আহা, যদি খেলোয়াড় হতে পারতাম!–গাভাসকার ব্যাটা কত রেকর্ড করে কী নামটাই করে নিল! মধু বলে–যদি বোম্বাইয়ের। ফিল্মের হিরো হতে পারতাম!–যশ আর অর্থ দুইয়েরই কোনও অভাব হত না।
তেমনই নিধিরাম মিত্তিরের মনেও অনেক অপূর্ণ বাসনা আছে। শুধু অপূর্ণ বাসনা নয়; ঈশ্বর তাঁকে যেভাবে সৃষ্টি করেছেন তাতেও তাঁর আপত্তি। এই যেমন, বেশিরভাগ লোকই ফল খেতে ভালবেসে। আম জাম লিচু আঙুর আপেল এসব ফলের কত সুনাম; লোকে কত ভালবেসে এসব ফল খায়, আর তা থেকে পুষ্টি লাভ করে। নিধিরামের কিন্তু কোনও ফলেই রুচি নেই। বিধাতা তাকে এমন বেয়াড়া ভাবে সৃষ্টি করলেন কেন?
তারপর নিধিরাম নিজের চেহারা সম্পর্কেও সন্তুষ্ট নয়। দেখতে সে খারাপ নয়, কিন্তু মাথায় খাটো। ১৯৭৩-এ সে একবার নিজের হাইট মেপেছিল। পাঁচ ফুট সাড়ে ছ ইঞ্চি। তার আপিসের লোকনাথ গুঁই ছ ফুট লম্বা। নিধিরাম তার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে আর তার মন ঈর্ষায় ভরে যায়। যদি আরেকটু লম্বা হওয়া যেত!
তার ক্ষমতা অনুযায়ী যতদূর সম্ভব ততদূর নিধিরাম করেছে। মুখার্জি বিল্ডার্স অ্যান্ড কনট্রাকটরস কোম্পানিতে আজ চোদ্দ বছরের চাকরি তার। তার কর্তা তার উপর খুশিই আছেন। মাইনেও সে যা পায় তাতে স্ত্রী আর দুটি ছেলেমেয়ে নিয়ে তার দিব্যি চলে যায়। কিন্তু আসল কথাটা হচ্ছে কি, চাকরি ব্যাপারটাই নিধিরামের পছন্দ নয়। কত লোক আছে যারা স্রেফ লিখে পয়সা করে–গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক। তাতে তাদের খাটতে হয় ঠিকই, কিন্তু চাকুরেদের মতো দশটা-পাঁচটা ডেস্কের উপর। ঘাড় গুঁজে বসে থাকতে হয় না। আর শিল্পী, সাহিত্যিক, গাইয়ে, বাজিয়ে হলে বাজারে যে নাম হয়, আপিসে চাকরি করে তো তা হয় না। পাবলিককে খুশি করে যে আনন্দ পাওয়া যায়, সে আনন্দ নিধিরাম কোনওদিন পাবে না। এটা তার একটা বড় আফসোসের কারণ। তার এক বন্ধু আছে, মনোতোষ বাগচী, সে থাকে পাইকপাড়ায়। অভিনয়ে সে রীতিমতো দক্ষ। সে পেশাদারি থিয়েটারে যোগ দিয়ে খুব নাম করেছে। হিরোর পার্টই করে বেশিরভাগ। নিধিরাম মনোতোষকে অনেকবার বলেছে, ভাই, আমাকে অ্যাকটিং-এ একটু তালিম দিয়ে দে না। আমার বড় শখ। অন্তত ক্লাবে-টাবেও যদি দু-একটা পার্ট করতে পারি তা হলেও তো পাঁচজনে আমাকে চেনে।
মনোতোষ বলেছে, সকলের মধ্যে সব গুণ থাকে না। অ্যাকটিং যে করবি তার গলা কোথায় তোর? লোকে পিছনের সারি থেকে তোর কথা শুনতে না পেলে এমন আওয়াজ দেবে যে অভিনয়ের বারোটা বেজে যাবে।
.
এবার পুজোর ছুটিতে পুরীতে গিয়ে নিধিরাম এক সাধুবাবার সাক্ষাৎ পেল। ভদ্রলোক সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁকে ঘিরে জনা বিশেক মেয়ে-পুরুষ ভক্তের দল। সাধু-সন্ন্যাসীর দেখা পেলে নিধিরাম কৌতূহল চেপে রাখতে পারে না, বিশেষ করে এঁর মতো তেজিয়ান চেহারার সাধু হলে তো কথাই নেই!
নিধিরাম ভিড় ঠেলে একটু কাছে যেতেই বাবাজির দৃষ্টি তার উপর পড়ল। কী বাবা নিধিরাম, বলে উঠলেন বাবাজি, যা নয় তাই হবার শখ হয়েছে?
নিধিরাম সাধুর মুখে নিজের নাম শুনেই তাজ্জব বনে গেছে; খাঁটি সিদ্ধপুরুষ না হলে এ ক্ষমতা হয় না। সে আমতা-আমতা করে বলল, আজ্ঞে কই, না তো।
না আবার কী? বলে উঠলেন বাবাজি, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তোর দেহ দুভাগে ভাগ হয়ে রয়েছে; একটা তোর বাস, আর একটা বাসনা। বাসনাটাই যে প্রবল হয়ে উঠেছে তার কী হবে?
কী হবে তা আপনিই বলে দিন বাবাজি।কাতর কণ্ঠে বলল নিধিরাম। আমি মুখ্য মানুষ, আমি আর কী বলব?
হবে হবে, বললেন বাবাজি। মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। তবে এখনই নয়, সময় লাগবে। একেবারে মূল উপড়ে ফেলতে হবে তো। তারপর আবার নতুন করে শেকড় গজাবে, আর সে শেকড় নতুন জমিতে ভুয়ের নীচে প্রবেশ করবে। চাট্টিখানি কথা নয়! তবে ওই যা বললাম–তোর হবে।
এই ঘটনার কিছুদিন পরেই কলকাতায় ফিরে এসে একদিন নিধিরামের কলা খেতে ইচ্ছে করল। বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের মোড়ে কলা বিক্রি হচ্ছে; নিধিরাম একটা কিনে খেয়ে দেখল–দিব্যি স্বাদ। উনচল্লিশ বছর বয়সেও তা হলে মানুষের রুচি পালটায়! এটার সঙ্গে সাধুবাবার কোনও সম্পর্ক আছে কিনা সেটা নিধিরামের খেয়াল হয়নি, তবে এই দিয়েই তার পরিবর্তনের সূত্রপাত।
সেদিন আপিসে নিধিরামের কাজে মন বসল না। কদিন থেকেই সে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে, পুরীর বাবাজির কথা মনে পড়ছে, ফলে তার কাজে ব্যাঘাত হচ্ছে। তার পাশের টেবিলের ফণীবাবু টিফিন টাইম হয়েছে দেখে একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, আজ মিত্তিরমশাইকে অন্যমনস্ক দেখছি কেন? কীসের এত চিন্তা?
কথাটা বলে সিগারেটে একটা টান দিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছাড়লেন ভদ্রলোক, আর সেই ধোঁয়া নিধিরামের নাকে মুখে প্রবেশ করে হঠাৎ তাকে বিষম খাইয়ে দিল। অথচ নিধিরাম নিজেই বিড়ি-সিগারেট খায়, ধোঁয়ায় সে সম্পূর্ণ অভ্যস্ত। আজ হঠাৎ তার এমন হল কেন? তার নিজের পকেটে এক প্যাকেট উইলস রয়েছে; খেয়াল হল যে এগারোটার সময় চায়ের পর সে সিগারেট ধরায়নি। এটা নিয়মের একটা বিরাট ব্যতিক্রম। এখানেও তার একটা পরিবর্তন সে লক্ষ করল। এই নিয়ে সে ফণীবাবুকে কিছু বলল না।
