ছেনোর মধ্যে একটা আমূল পরিবর্তন আসেনি সেটা জোর দিয়ে কে বলবে? মানুষের মন কখন।
কোনদিকে কীভাবে চলে সেটা বোঝা বড় শক্ত। ছেনোর যদি সত্যিই সংস্কার হয়ে থাকে?
সাংবাদিক উদগ্রীব হয়ে চেয়ে আছেন নিতাইয়ের দিকে।
নিতাই বলল, কালকের ঘটনাটি সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাই না। এটা কাগজে ছাপানোর উপযুক্ত খবর নয়।
আপনি কিছুই বলবেন না? হতাশার সুরে প্রশ্ন করলেন সাংবাদিক।
আজ্ঞে না, কিছুই না।
.
বলাই বাহুল্য, পরের দিন দৈনিক বার্তা কাগজে এ বিষয়ে কিছুই বেরোলো না। কিন্তু একটা আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, জীবানন্দ বাবাজি কলকাতায় এসেছিলেন পনেরো দিনের জন্য, তিনি হঠাৎ এই ঘটনার পরদিনই–অর্থাৎ সাতদিনের মাথায়–তাঁর ভক্তদের কাছে ঘোষণা করলেন যে, একটা জরুরি টেলিগ্রাম পেয়ে তাঁকে পাটনা চলে যেতে হচ্ছে।
এই ঘটনার পর দুবছর কেটে গেছে। বাবাজি কিন্তু আর কলকাতামুখো হননি।
সন্দেশ, আষাঢ় ১৩৯৩
নিতাইবাবুর ময়না
নিতাইবাবুর অনেকদিনের শখ একটা ময়না কেনার। তাঁর বন্ধু শশাঙ্ক সেনের বাড়িতে একটা ময়না আছে। সেটা হেন বাংলা কথা নেই যে বলে না। তার কথা শুনতেই নিতাইবাবু মাসে অন্তত তিনবার করে শশাঙ্কবাবুর বাড়িতে যান। সেদিন তো শশাঙ্কবাবুর বৈঠকখানায় ঢুকতেই নিতাইবাবু শুনলেন ময়না বারান্দা থেকে বলে উঠল, আসুন, বসুন।
একেবারে মানুষের গলা। কেবল একটু খোনা, যেমন সর্দি হলে হয়। চার বছর ধরে ময়নাকে কথা। বলতে শিখিয়েছেন শশাঙ্ক সেন। তাঁর ছেলে আর গিন্নিও বাদ যাননি। সুতরাং পাখির কথার স্টক এখন বিশাল। নিতাইবাবু মুগ্ধ হয়ে শোনেন, আর মনে মনে ভাবেন–এমন একটা পাখি থাকলে নিরানন্দ সন্ধ্যাগুলি চমৎকার কেটে যায়। শশাঙ্কবাবু বন্ধুকে দোকানের সন্ধানও দিয়ে দিয়েছেন। নিউ মার্কেটে পাখির সেকশন জানো তো? সেখানে গিয়ে লতিফের দোকানে খোঁজ করবে। আমার এই ময়নাও লতিফের দোকান থেকে কেনা।
নিতাইবাবু ন্যাশনাল ইনশিওর্যান্স কোম্পানিতে অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। বিয়ে করেননি। থাকেন ভবানীপুরে বেণীনন্দন স্ট্রিটের একটা ফ্ল্যাটে। অফিস টাইমে মার্কেট যাওয়ার উপায় নেই; অফিস ফেরতও যাওয়া হয় না, কারণ মার্কেট বন্ধ হয়ে যায়। তাই গুড ফ্রাইডের ছুটিতে সকাল দশটায় নিতাইবাবু মার্কেটে গিয়ে হাজির হলেন। পাখির বাজার কোথায় জানাই ছিল, সেখানে গিয়ে লতিফের কথা জিজ্ঞেস করতেই এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন, কেন স্যার? লতিফ কেন? আপনার পাখি চাই তো? নিতাইবাবু হ্যাঁ বলতে ভদ্রলোক বললেন, তা আমার দোকানে আসুন না। আমার স্টক কারুর থেকে কম না।
দোকানটা বড় তাতে সন্দেহ নেই, আর পাখিতে বোঝাই। কিচিরমিচির শব্দে কান পাতা যায় না।
কী পাখি খুঁজছেন? জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।
ময়না।
তা কটা চাই আপনার? এই দেখুন খাঁচার সারি। সবকটা ময়না।
কথা বলে?
ময়না কথা বলবে না? শিখিয়ে নিলেই বলবে। টকিং বার্ডের মধ্যে ময়নার পোজিশন অ্যাগবারে টপে। তবে একটা কথা–ময়না কিন্তু দুরকমের হয়। নেপালি আর আসামি।
দুটোয় তফাত কী?
আসামির দাম বেশি, কারণ কথা বলে বেশি ভাল।
নিতাইবাবু মনে মনে আসামি ময়না নেওয়াই স্থির করে ঘুরে ঘুরে পাখি দেখতে লাগলেন।
আমার নামটা মনে রাখবেন স্যার, বললেন দোকানের মালিক মণিলাল কর্মকার। ছাপ্পান্ন বছরের ব্যবসা আমাদের। গ্র্যান্ডফাদার এস্টার্ট করেন।
খাঁচাসমেত ময়না পাওয়া যাবে তো?
নিশ্চয়ই। তবে খাঁচার দাম আলাদা। আপনি আগে চয়েস করুন না! এইগুলো আসামি, আর এইগুলো নেপালি।
নিতাইবাবু আর সময় নষ্ট না করে একটা আসামি ময়নার দিকে দেখিয়ে বললেন, এইটে আমি নেব।
কিছু দরাদরির পর তিনশো টাকায় রফা হল–পাখি দুশো কুড়ি, আর খাঁচা আশি। নিতাইবাবু খাঁচাসমেত পাখি নিয়ে নিউ মার্কেটের সামনে দাঁড়ানো একটা ট্যাক্সিতে চড়ে বাড়িমুখো রওনা দিলেন।
ছোট ফ্ল্যাট। দুখানা ঘর আর একটা অপরিসর বারান্দা। একা মানুষের পক্ষে যথেষ্ট। চাকর গনশার হাতে খাঁচাটা চালান দিয়ে নিতাইবাবু বললেন, এটাকে বারান্দায় টাঙিয়ে রাখার ব্যবস্থা কর।
পাখিকে কী খেতে দিতে হবে সেটা বলে দিয়েছিল মণিলাল কর্মকার। সে ব্যাপারেও চাকরকে নির্দেশ দিয়ে দিলেন নিতাইবাবু।
বল দেখি রাধাকেষ্ট!
নিতাইবাবুর তর সইছিল না। নাওয়া-খাওয়া হয়নি, তাও পাখির বাকশক্তি পরীক্ষা না করে তাঁর সোয়ান্তি নেই।
রাধাকেষ্ট, রাধাকেষ্ট। বল দেখি রাধাকেষ্ট। খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে পাখির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আবার বললেন নিতাইবাবু।
এর পর ময়না ঘাড়টা একটু নাড়ল। তারপর পরিষ্কার গলায় কথা এল–হ্যালো গুড মর্নিং।
সে কী! পাখি যে ইংরিজি বলে!
নিতাইবাবুর বিস্ময় কাটার আগেই পাখি আবার কথা বলল।–ইউ রাসক্যাল! আর পরক্ষণেই কণ্ঠস্বরে বেশ বিরক্তি এনে পাখি বলে উঠল–শাট আপ! শাট আপ!
নিতাইবাবু চমৎকৃত হলেও তাঁর মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। মণিলাল কর্মকার এমন ভুল করল কী করে? এ ময়না যে সাহেব বাড়িতে ছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। পাখির কথা থেকে সাহেব যে কেমন লোক সেটাও খানিকটা আঁচ করতে পারলেন নিতাইবাবু। খিটখিটে মেজাজ, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সম্ভবত দো-আঁশলা, অর্থাৎ ফিরিঙ্গি। এ ময়না কি বাংলা শিখবে কোনওদিন, না কি তিনি এখনই গিয়ে এটাকে বদলে অন্য ময়না নিয়ে আসবেন?
