এবার বুঝেছ আমার ক্ষমতা?
সুরপতির হাত থেকে তাসের প্যাকেটটা আপনা থেকেই পড়ে গেল বেঞ্চির উপরে। ত্রিপুরাবাবু তাসগুলো গোছ করে তুলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, রাজি আছ?
সুরপতির অসুস্থ অবশ ভাবটা কেটে গেছে।
সে ক্লান্ত ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ম্যাজিকটা শেখাবেন তো?
ত্রিপুরাবাবু তাঁর ডান হাতের তর্জনী সুরপতির নাকের সামনে তুলে ধরে বললেন, লক্ষৌয়ের প্রথম শোতে তোমার অসুস্থতাহেতু তোমার পরিবর্তে তোমার গুরু ত্রিপুরাচরণ মল্লিক তাঁর জাদুবিদ্যা প্রদর্শন করবেন। তাই তো?
হ্যাঁ, তাই।
তুমি তোমার প্রাপ্য টাকার অর্ধেক আমাকে দেবে। ঠিক তো?
ঠিক।
তবে এসো।
সুরপতি পকেট হাতড়ে একটা আধুলি, আর নিজের আঙুল থেকে পলাবসানো আংটিটা খুলে ত্রিপুরাবাবুকে দিল।…
.
বর্ধমানে গাড়ি থামতে চা নিয়ে তার বস-এর কামরার সামনে এসে অনিল দেখে সুরপতি ঘুমে অচেতন। অনিল একটু ইতস্তত করে একবার স্যার বলে মৃদু শব্দ করতেই সুরপতি ধড়মড়িয়ে উঠে বসল।
কী…কী ব্যাপার?
আপনার চা এনেছি স্যার। ডিসটার্ব করলুম, কিছু মনে করবেন না।
কিন্তু…? সুরপতি উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে কামরার এদিক-ওদিক দেখতে লাগল।
কী হল স্যার?
ত্রিপুরাবাবু…?
ত্রিপুরাবাবু? অনিল হতভম্ব।
না, না…উনি তো সেই ফিফটি-ওয়ানে..বাস চাপা পড়ে..কিন্তু আমার আংটি?
কোন্ আংটি স্যার? আপনার পলাটা তো হাতেই রয়েছে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। আর…।
সুরপতি পকেটে হাত দিয়ে একটা আধুলি বার করল। অনিল লক্ষ করল সুরপতির হাত থরথর করে কাঁপছে।
অনিল, ভেতরে এসো তো একবার। চট করে এসো। ওই জানলাগুলো বন্ধ করো তো। হ্যাঁ, এইবার দেখো।
সুরপতি বেঞ্চির এক মাথায় আংটি আর অন্য মাথায় আধুলিটা রাখল। তারপর ইষ্টনাম জপ করে যা-থাকে কপালে করে স্বপ্নে-পাওয়া কৌশল প্রয়োগ করল আধুলির দিকে তীব্র সংহত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।
আধুলিটা বাধ্য ছেলের মতো গড়িয়ে আংটির কাছে গিয়ে সেটাকে সঙ্গে নিয়ে সুরপতির কাছে গড়িয়ে ফিরে এল।
অনিলের হাত থেকে চায়ের পেয়ালাটা পড়ে যেত যদি না সুরপতি অদ্ভুত হাতসাফাইয়ের বলে সেটাকে পড়ার পূর্বমুহূর্তেই নিজের হাতে নিয়ে নিত।
লক্ষ্ণৌয়ে জাদুপ্রদর্শনীর প্রথম দিন পর্দা উঠলে পর সুরপতি মণ্ডল সমবেত দর্শকমণ্ডলীর সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁর স্বৰ্গত জাদুবিদ্যাশিক্ষক ত্রিপুরাচরণ মল্লিকের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করল।
আজ প্রদর্শনীর শেষ খেলা–যেটাকে সুরপতি খাঁটি দেশি ম্যাজিক বলে অ্যাখ্যা দিল–হল আংটি ও আধুলির খেলা।
সন্দেশ, চৈত্র ১৩৬৯
ধাপ্পা
চার্লস ওয়েকম্যানের হিস্ট্রি অফ ম্যাজিক আপনার ক ভল্যুম ছিল?
সমরেশ ব্রহ্ম ইন্টারন্যাশনাল ম্যাজিক সার্কেলের চিঠির উত্তরে সইটা করে মুখ তুলে চাইল মহিমের দিকে। তার বন্ধু অধ্যাপক রণেন সেনগুপ্তর ছেলে মহিম। সবে লাইব্রেরিয়ানশিপ পাশ করেছে। সে নিজেই আগ্রহ করে তার সমরেশকাকার আড়াই হাজার অগোছালো বইগুলোকে বিষয় অনুযায়ী ভাগ করে গুছিয়ে শেলফে রেখে তাদের একটা তালিকা করে দেবার ভার নিয়েছে।
কেন, দু ভলুম! বলল সমরেশ।
মাত্র একটাই পাচ্ছি। সেকেন্ডটা?
সে কী! ভাল করে দেখেছ?
হ্যাঁ।
আশ্চর্য! সেটটা কানা হয়ে গেল? ও বই যে আর পয়সা দিলেও পাওয়া যায় না।
সমরেশ ব্রহ্মের বইয়ের নেশা সেই কলেজ থেকেই। পঁচিশ বছর আগের কথা। ইতিহাসের ছাত্র ছিল সে, তবে তার বাইরেও অনেক বিষয়ের বইয়ের প্রতি তার আকর্ষণ। যেমন ভ্রমণ কাহিনী, শিকার কাহিনী, প্রত্নতত্ত্ব, অ্যানাটমি। আর ম্যাজিক ম্যাজিক ছিল প্রথমে সমরেশের হবি। তারপর ক্রমে সেটা নেশায় দাঁড়ায়। বাপ ছিলেন কলকাতার নামকরা ব্যারিস্টর আদিনাথ ব্রহ্ম। ছেলেও বিলেত গিয়ে ব্যারিস্টরি পাশ করে আসে, এমন একটা ইচ্ছে বাপের ছিল, এবং সে ইচ্ছে অনুযায়ী সমরেশ গিয়েছিল বিলেত। কিন্তু কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে তিন মাস পড়ার পর জাদুকর মার্কা সিলভারস্টোনের সঙ্গে আলাপ হয়ে পড়াশুনা শিকেয় উঠল। সমরেশ তার বাপকে জানাল সে ব্যারিস্টরি পড়বে না; তার শখ চেপেছে ম্যাজিসিয়ান হবার। অনুরোধটা যাতে আরও জোরদার হয় সেই উদ্দেশ্যে নিজের চিঠির সঙ্গে সিলভারস্টোনেরও একটা চিঠি সে পুরে দিল খামের মধ্যে। সিলভারস্টোন লিখেছে আদিনাথ ব্রহ্মকে–তোমার ছেলের বন্ধু হিসেবেই তোমাকে লিখছি সমরেশ ইজ ওয়ান্ডারফুলি ক্লেভার উইথ হিজ হ্যান্ডস। ঐন্দ্রজালিক হিসেবে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে বলে আমি মনে করি।
এক্ষেত্রে যে কোনও সাধারণ বাপই হয় মর্মাহত হতেন, না হয় মারমুখো হতেন। কিন্তু আদিনাথ ছিলেন সাধারণের বাইরে। তিনি ছেলেকে লিখলেন, তোর স্বাধীনতায় আমি হস্তক্ষেপ করতে চাই না। তোর মধ্যে যদি কোনও বিশেষ ক্ষমতা থেকে থাকে, তা হলে সেটার স্ফুরণ হোক সেটাই আমার কাম্য। লন্ডনে যদি ম্যাজিক শেখার সুযোগ থাকে তা হলে তার জন্য কী খরচ পড়বে সেটা আমাকে জানাতে দ্বিধা করিস না। আমি টাকা পাঠিয়ে দেব।
সমরেশ কিন্তু আর লন্ডনে থাকেনি। সে দুমাসের মধ্যে দেশে ফিরে আসে এবং বাড়িতেই ম্যাজিক অভ্যাস শুরু করে। তখন তার বয়স বাইশ। পঁচিশ বছর বয়সে সে প্রথম মঞ্চে ম্যাজিক দেখায়। সেটা অবিশ্যি একক প্রদর্শনী; শুধু হাত সাফাইয়ের খেলা। তা সত্ত্বেও তরুণ জাদুকরের আশ্চর্য দক্ষতার প্রচুর। তারিফ করে দৈনিক কাগজের সমালোচকেরা।
