সুরপতি কয়েক মুহূর্ত কোনও কথাই বলতে পারল না। ত্রিপুরাবাবু ধুতির খুঁট দিয়ে কপালের ঘাম মুছে হাতের একটা পোঁটলা মেঝেতে রেখে সুরপতির বেঞ্চের বিপরীত কোণটাতে বসলেন। তারপর সুরপতির দিকে চেয়ে একটু হেসে বললেন, অবাক লাগছে, না?
সুরপতি কোনওমতে ঢোক গিলে বলল, অবাক মানে–প্রথমত, আপনি যে বেঁচে আছেন তাই আমার ধারণা ছিল না।
কীরকম?
আমি আমার বি.এ. পরীক্ষার কিছুদিন পরেই আপনার মেসে যাই। গিয়ে দেখি তালা বন্ধ। ম্যানেজারবাবু নাম ভুলে গেছি–বললেন যে, আপনি নাকি গাড়ি চাপা পড়ে…
ত্রিপুরাবাবু হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, সেরকম হলে তো বেঁচেই যেতাম! অনেক
ভাবনাচিন্তা থেকে রেহাই পেতাম।
সুরপতি বলল, আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে–আমি কিছুদিন আগেই আপনার কথা ভাবছিলাম।
বলো কী? ত্রিপুরাবাবুর চোখেমুখে যেন একটা বিষাদের ছায়া পড়ল। আমার কথা ভাবছিলে? এখনও ভাবো আমার কথা? শুনে আশ্চর্য হলাম।
সুরপতি জিভ কাটল। এটা আপনি কী বলছেন ত্রিপুরাবাবু! আমি কি অত সহজে ভুলি? আমার হাতেখড়ি যে আপনার হাতেই। আজ বিশেষ করে পুরনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ছিল। আজ বাইরে যাচ্ছি শো দিতে। এই প্রথম বাংলার বাইরে।–আমি যে এখন পেশাদারি ম্যাজিশিয়ান তা আপনি জানেন কী?
ত্রিপুরাবাবু মাথা নাড়লেন।
জানি। সব জানি। সব জেনেশুনেই, তোমার সঙ্গে দেখা করব বলেই আজ এসেছি। এই বারো বছর তুমি কী করেছ না করেছ, কীভাবে তুমি বড় হয়েছ, এ অবস্থায় এসে পৌঁছেছ–এর কোনওটাই আমার অজানা নেই। সেদিন নিউ এম্পায়ারে ছিলাম আমি, প্রথম দিন। একেবারে পিছনের বেঞ্চিতে। সবাই তোমার কলাকৌশল কেমন অ্যাপ্রিসিয়েট করল তা দেখলাম। কিছুটা গর্ব হচ্ছিল বটেই। কিন্তু
ত্রিপুরাবাবু থেমে গেলেন। সুরপতিও কিছু বলার খুঁজে পেল না। কীই-বা বলবে সে? ত্রিপুরাবাবু যদি কিছুটা ক্ষুণ্ণ বোধ করেন তা হলে তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না। সত্যিই উনি গোড়াপত্তনটা না করিয়ে দিলে সুরপতির আজ এতটা উন্নতি হত না। আর তার প্রতিদানে সুরপতি কীইবা করেছে? বরং উলটে এই বারো বছরে ক্রমশ তার মন থেকে ত্রিপুরাবাবুর স্মৃতি মুছে এসেছে। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার ভাবটাও যেন কমে এসেছে।
ত্রিপুরাবাবু আবার শুরু করলেন, গর্ব আমার হয়েছিল তোমার সেদিনের সাকসেস দেখে। কিন্তু তার সঙ্গে আফসোসও ছিল। কেন জানো? তুমি যে রাস্তা বেছে নিয়েছ, সেটা খাঁটি ম্যাজিকের রাস্তা নয়। তোমার ব্যাপারটা অনেকখানি লোকভুলানো রং-তামাশা, অনেকখানি যন্ত্রের কৌশল। তোমার নিজের কৌশল নয়। অথচ আমার ম্যাজিক মনে আছে তোমার?
সুরপতি ভোলেনি। কিন্তু সেইসঙ্গে এও মনে হচ্ছিল তার যে, ত্রিপুরাবাবু যেন তাঁর সেরা ম্যাজিকগুলো তাকে শেখাতে দ্বিধা বোধ করতেন। তিনি বলতেন, এখনও সময় লাগবে। সেই সময় আর কোনওদিন আসেনি। তার আগেই এসে পড়ল শেফাল্লো। শেফাল্লোর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে সে অনেক স্বপ্নজাল বোনে। দেশে দেশে ম্যাজিক দেখিয়ে রোজগার করবে, নাম করবে, লোককে আনন্দ দেবে, লোকের হাততালি পাবে, বাহবা পাবে।
ত্রিপুরাবাবু অন্যমনস্কভাবে জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে আছেন। সুরপতি তাঁকে একবার ভাল করে দেখল। ভদ্রলোককে সত্যিই দুস্থ বলে মনে হচ্ছে। মাথার চুল প্রায় সমস্ত পেকে গেছে, গালের চামড়া আলগা হয়ে এসেছে, চোখ ঢুকে গেছে কোটরের ভিতরে। কিন্তু চোখের দৃষ্টি কি ম্লান হয়েছে কিছু? মনে তো হয় না। আশ্চর্য তীক্ষ্ণ চাহনি ভদ্রলোকের।
ত্রিপুরাবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, অবিশ্যি তুমি কেন এ-পথ বেছে নিয়েছ জানি। আমি জানি তুমি বিশ্বাস করো–হয়তো আমিই তার জন্য কিছুই দায়ী–যে খাঁটি জিনিসের কদর নেই। স্টেজে ম্যাজিক চালাতে গেলে একটু চটক চাই, চাকচিক্য চাই। তাই নয় কী?
সুরপতি অস্বীকার করল না। শেফাল্লো দেখার পর থেকেই তার এ ধারণা হয়েছিল। কিন্তু জাঁকজমক মানেই কি খারাপ? আজকাল দিনকাল বদলেছে। বিয়ের আসরে ফরাসের উপর বসে ম্যাজিক দেখিয়ে কীই বা রোজগার করবে তুমি, আর কেইবা জানবে তোমার নাম? ত্রিপুরাবাবুর অবস্থাটা তো সে নিজের চোখেই দেখেছে। খাঁটি ম্যাজিক দেখাতে গিয়ে যদি মানুষের পেট না চলে তো সে ম্যাজিকের সার্থকতা কোথায়?
সুরপতি ত্রিপুরাবসুকে শেফাল্লোর কথা বলল। যে জিনিস হাজার হাজার দর্শক দেখে আনন্দ পাচ্ছে, তারিফ করছে, তার কি কোনও সার্থকতা নেই? খাঁটি ম্যাজিক তো সুরপতি অশ্রদ্ধা করছে না। কিন্তু সে পথে কোনও ভবিষ্যৎ নেই। তাই সুরপতি এই পথ বেছে নিয়েছে।
ত্রিপুরাবাবু হঠাৎ যেন উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বেঞ্চির উপর পা তুলে দিয়ে তিনি সুরপতির দিকে ঝুঁকে পড়লেন।
শোনো সুরপতি, তুমি যদি সত্যিই বুঝতে পারতে আসল ম্যাজিক কী জিনিস তা হলে তুমি নকলের পিছনে ধাওয়া করতে না। হাতসাফাই তো ওর শুধু একটামাত্র অঙ্গ। অবিশ্যি তারও যে কত শ্রেণীবিভাগ আছে তার শেষ নেই। যৌগিক ক্রিয়ার মতো সেসব সাফাই মাসের পর মাস, বছরের পর বছর অভ্যাস করতে হয়। কিন্তু এ ছাড়াও তো আরও কত কী আছে। হিপনটিজম! কেবল চোখের চাহনির জোরে মানুষকে সম্পূর্ণ তোমার বশে এনে ফেলতে পারবে। এমন বশ করবে যে, সে তোমার হাতে কাদা হয়ে যাবে। তারপর ক্লেয়ারভয়েন্স, বা টেলিপ্যাথি, বা থটরিডিং। অপরের চিন্তার জগতে তুমি অবাধ চলাফেরা করতে পারবে। একজনের নাড়ি টিপে বলে দেবে সে কী ভাবছে। তেমন তেমন শেখা হয়ে গেলে পরে তাকে স্পর্শও করতে হবে না। কেবল মিনিটখানেক তার চোখের দিকে চেয়ে থাকলেই তার মনের কথা, পেটের কথা সব জেনে ফেলবে। এসব কি ম্যাজিক? জগতের সব সেরা ম্যাজিকের মূল হচ্ছে এইসব জিনিস। এতে কলকজার কোনও ব্যাপারই নেই। আছে শুধু সাধনা, নিষ্ঠা, একাগ্রতা।
