পরের রবিবার, সকাল দশটা নাগাদ মহিম বৈঠকখানায় বসে খবরের কাগজ পড়ছে। এমন সময় দরজায় রিং হল। চাকর পশুপতি গিয়ে দরজা খুলল। বাবু আছেন? প্রশ্ন এল মহিমের কানে। চাকর হ্যাঁ বলতে দরজা দিয়ে একটি ভদ্রলোক ভিতরে ঢুকে এলেন। তাঁর মুখে হাসি। ডান হাতটা সামনের দিকে বাড়ানো। মহিমও তার ডান হাতটা বাড়িয়ে ভদ্রলোকের হাতটা শক্ত করে ধরে অবাক হাসি হেসে বলল, কী ব্যাপার প্রতুল? তুই দেখছি শুধু গতরে বেড়েছিস–চেহারা একটুও পালটায়নি। বোস, বোস।
প্রতুলের মুখ থেকে হাসি যায়নি, সে পাশের সোফায় বসে বলল, বন্ধুত্বের এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?
এগজ্যাক্টলি, বলল মহিম, আমিও ঠিক সেই কথাই ভাবছি।
তুই তো লিখিস, তাই না?
হ্যাঁ–তা লিখি।
একটা পুরস্কারও তো পেলি। কাগজে দেখলাম।
কিন্তু তোর কী খবর? আমার ব্যাপার তো দেখছি তুই মোটামুটি জানিস।
প্রতুল একটুক্ষণ মহিমের দিকে চেয়ে থেকে বলল, আমারও চলে যাচ্ছে।
কলকাতাতেই থাকিস নাকি?
সবসময় না। একটু ঘোরাঘুরি করতে হয়।
ট্রাভেলিং সেলসম্যান?
প্রতুল শুধু মৃদু হাসল, কিছু বলল না।
কিন্তু একটা কথা তো জানাই হয়নি, বলল মহিম।
কী?
সেদিন তুই ব্যাটাচ্ছেলে এলি না কেন? কারণটা কী? অন্য লোকের হাতে চিঠি পাঠালি কেন?
আমার একটু অসুবিধা ছিল।
কী অসুবিধা? খুলে বল না বাবা!
কথাটা বলতে বলতেই মহিমের দৃষ্টি জানলার দিকে চলে গেল। বাইরে গোলমাল। অনেক ছেলে ছোঁকরা কেন জানি একসঙ্গে হল্লা করছে।
মহিম একটু বিরক্ত হয়ে উঠে গিয়ে জানলার পর্দা ফাঁক করে অবিশ্বাসের সুরে বলল, ওই গাড়ি কি তোর?
এতবড় গাড়ি মহিম কলকাতায় দেখেছে বলে মনে পড়ল না।
আর এইসব ছেলেরা হল্লা করছে কেন? মহিমের দ্বিতীয় প্রশ্ন।
এবার বন্ধুর দিকে ফিরে মহিমের মুখ হাঁ হয়ে গেল।
প্রতুল নাকের নীচে একজোড়া চাড়া দেওয়া পুরু গোঁফ লাগিয়ে তার দিকে চেয়ে মিটমিট হাসছে।
কিশোরীলাল! মহিম প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।
প্রতুল গোঁফ খুলে পকেটে রেখে বলল, এখন বুঝতে পারছিস তো কেন লাইটহাউসে যেতে পারিনি? খ্যাতির বিড়ম্বনা। রাস্তাঘাটে বেরোনো অসম্ভব।
মাই গড।
প্রতুল উঠে পড়ল।
বেশিক্ষণ থাকলে আর ভিড় সামলানো যাবে না। আমি কাটি। আমার ছবি একটাও দেখিসনি তো?
তা দেখিনি।
একটা অন্তত দেখিস। লাইটহাউসের দুটো টিকিট পাঠিয়ে দেব।
প্রতুল বাইরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল–মহিম তার পিছনে।
দরজা খুলতে একটা বিরাট হর্ষধ্বনির সঙ্গে কিশোরীলাল! কিশোরীলাল! চিৎকার শুরু হয়ে গেল। প্রতুল কোনওরকমে জনস্রোতের মধ্য দিয়ে পথ করে নিয়ে গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করে দিল, আর সঙ্গে সঙ্গে গাড়িও রওনা দিয়ে দিল। মহিম দেখল প্রতুল তার দিকে হাত নাড়ছে। মহিমের হাতটা ওপরে উঠে গেল।
ভিড় ঠেলে একটা ছেলে মহিমের দিকে এগিয়ে এসে চোখ বড় বড় করে বলল, কিশোরীলাল আপনার বন্ধু।
হ্যাঁ ভাই, আমার বন্ধু।
মহিম বুঝল, এবার থেকে পাড়ায় তার আসল নাম মুছে গিয়ে তার জায়গায় নতুন নাম হবে–কিশোরীলালের বন্ধু।
সন্দেশ, পৌষ ১৩৯৬
দুই ম্যাজিশিয়ান
পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়, দশ, এগারো।
সুরপতি ট্রাঙ্কগুলো গুনে নিয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট অনিলের দিকে ফিরে বলল, ঠিক আছে। দাও, গাড়ি পাঠিয়ে দাও সব ব্রেকভ্যানে। আর মাত্র পঁচিশ মিনিট।
অনিল বলল, আপনার গাড়িও ঠিক আছে স্যার। কুপে। দুটো বার্থই আপনার নামে নেওয়া আছে। কোনও অসুবিধে হবে না। তারপর মুচকি হেসে বলল, গার্ডসাহেবও আপনার একজন ভক্ত। নিউ এম্পায়ারে দেখেছেন আপনার শো। এই যে স্যার–আসুন এদিকে।
গার্ড বীরেন বক্সি মশাই একগাল হেসে এগিয়ে এসে তাঁর ডান হাতখানা সুরপতির দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
আসুন স্যার, যে-হাতের সাফাই দেখে এত আনন্দ পেইচি, সে-হাত একবারটি শেক করে নিজেকে কেতাখ করি!
সুরপতি মণ্ডলের এগারোটি ট্রাঙ্কের যে-কোনও একটির দিকে চাইলেই তার পরিচয় পাওয়া যায়। Mondols Miracles কথাটা পরিষ্কার বড় বড় অক্ষরে লেখা প্রতিটি ট্রাঙ্কের পাশে এবং ঢাকনার উপর। এর বেশি আর পরিচয়ের দরকার নেই কারণ ঠিক দুমাস আগেই কলকাতার নিউ এম্পায়ার থিয়েটারে মণ্ডলের জাদুবিদ্যার প্রমাণ পেয়ে দর্শক বারবার করধ্বনি করে তাদের বাহবা জানিয়েছে। খবরের কাগজেও প্রশংসা হয়েছে প্রচুর। এক সপ্তাহের প্রোগ্রাম ভিড়ের ঠেলায় চলেছে চার সপ্তাহ। তাও যেন লোকের আশ মেটেনি। থিয়েটারের কর্তৃপক্ষের অনুরোধেই মণ্ডলকে কথা দিতে হয়েছে যে, বড়দিনের ছুটিতে আবার শো করবে সে।
কোনও অসুবিধে-টসুবিধে হলে বলবেন স্যার। গার্ডসাহেব সুরপতিকে তাঁর কামরায় তুলে দিলেন। সুরপতি এদিকে ওদিকে দেখে নিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বেশ কামরা।
আচ্ছা স্যার, তা হলে…
অনেক ধন্যবাদ!
গার্ড চলে যাবার পর সুরপতি তার বেঞ্চের কোণে জানলার পাশটায় ঠেস দিয়ে বসে পকেট থেকে এক প্যাকেট সিগারেট বার করল। এই বোধহয় তার বিজয় অভিযানের শুরু। উত্তরপ্রদেশ : দিল্লি, আগ্রা, এলাহাবাদ, কাশী, লক্ষ্ণৌ। এ যাত্রা এই কটিই–তারপর আরও কত প্রদেশ পড়ে আছে, কত নগর কত উপনগর। আর শুধু কি ভারতবর্ষই? তার বাইরেও যে জগৎ রয়েছে একটা বিরাট বিস্তীর্ণ জগৎ। বাঙালি বলে কি আর অ্যাম্বিশন নেইঃ সুরপতি দেখিয়ে দেবে। এককালে যে-দেশের জাদুকর হুডিনির কথা পড়ে তার গায়ে কাঁটা দিত, সেই আমেরিকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে তার খ্যাতি। বাংলার ছেলের দৌড় কতখানি, তা সে প্রমাণ করবে বিশ্বের লোকের কাছে। যাক না কটা বছর! এ তো সবে শুরু।
