বইটির পাতা থেকে কলকাতার প্রাচীন এক রঙ্গালয়ের টিকিট বেরিয়ে এল। যুবক প্রপিতামহ। থিয়েটার দেখেছিলেন। সে রাতের অভিনেতা কে ছিলেন! তিনি এখন কোথায়? কিছু আগে আর পরে দর্শক আর অভিনেতা দুজনেই কালের শিকার হয়েছেন। চোরকুঠুরিতে সময়ের কিছু অভ্রচূর্ণ পড়ে আছে।
নিমেষে আবার বর্তমানে ফিরে আসা। অতীতের মরীচিকা অদৃশ্য। যা ছিল তা ফিরে আসে। যা ছিল না তা আর আসে কী করে! স্মৃতি পরগাছা। বর্তমানের গা বেয়ে অতীত লতিয়ে ওঠে। বর্তমান থেকে শুষতে থাকে প্রাণরস। অতীত আছে বলেই বর্তমান নিরালম্ব নয়। ভাসমান মেঘ। নয়। জপের মালার মতো। মুহূর্তের রুদ্রাক্ষ জীবন-জপ-মন্ত্রে ঘুরে ঘরে আসছে আবার ফিরে ফিরে যাচ্ছে। বছর বছর জুড়ে জীবনের সূত্র দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে। এরই মাঝে যুদ্ধ, শান্তি, দেশবিভাগ, মানচিত্রের নব-বিন্যাস, নতুন দেশসীমার জন্ম, রিপাবলিক ডিকটেটারশিপ থেকে ডেমোক্রেসি।
তবু, বর্তমান যতই চেষ্টা করুক অতীতকে একেবারে ঠেলে বের করে দিতে পারে না। অতীত সময়ের ছোট ছোট ডোবা তৈরি হয়। কোনও কোনও অঞ্চলে শতাব্দী আটকে থাকে। এপাশে তিরাশি সাল বইছে ওপাশে ছয় সাল আটকে আছে গাছের ডালে ঘুড়ির মতো।
দেড়শো বছরের প্রাচীন মন্দির দাঁড়িয়ে আছে আকাশের গায়ে মাথা ঠেকিয়ে। অষ্ট ধাতুর ধর্ম পতাকাটি হেলে গেছে একপাশে। মন্দিরগাত্রের কারুকার্য কিছু কিছু অদৃশ্য হয়ে গেছে। বহুকাল বিগ্রহের অঙ্গরাগ হয়নি। সন্ধ্যায় ক্ষীণ তেজের একটি বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে। পুরোহিত একজন আছেন। বয়েসে নবীন হলেও, সাজপোশাক প্রাচীনের মতোই। আরতির ঘণ্টা বাজে টিং টিং করে কেঁদে কেঁদে। শীর্ণ একটি মানুষ কোণে বসে কাঁসর বাজায় থেমে থেমে। তার আবার একটি চোখে দৃষ্টি নেই। আরও একটি পাশে চুপটি করে বসে থাকে এক বৃদ্ধা। সময় তার শরীরের সমস্ত রস শুষে নিলেও প্রাণশক্তিটি এখনও কেড়ে নিতে পারেনি। মন্দির চত্বরের বাইরে কিছু দূরে অবন মালাকারের ভিটে। তালাবন্ধ পড়ে আছে দীর্ঘকাল। বিশাল বিশাল বৃক্ষে নিশীথের বাতাস কানাকানি করে। কর্কশ সুরে প্যাঁচার ডাকে প্রেতেরা নড়েচড়ে ওঠে। মিত্তির বাড়ির মেজোবাবু শতাব্দীর ধাপ বেয়ে বেয়ে নেমে আসেন, ফিনফিনে পাঞ্জাবি গায়ে, শুড় তোলা চটির শব্দ তুলে। দক্ষিণের চিলেকোঠায় ঝুলতে থাকে সুন্দরী মেজোবউ মনের দুঃখে। ভাঙা আস্তাবলে অদৃশ্য ঘোড়া পা ঠুকতে থাকে। উন্মাদ বড়বাবু মাঝরাতে চাতাল থেকে তালঠুকে লাফিয়ে পড়েন কুস্তির আখড়ায়। পরনে লাল ল্যাঙোট। পালোয়ান রামখেলোয়া বোঝাতে থাকে, বাবু এখনও ভোর হয়নি।
রাতে পৃথিবীর পরিসর বড় কমে আসে। দিন যেন মানুষের দান ফেলে দাবা খেলতে বসে। রাত এসে ছক গুটিয়ে নেয়, বোড়েরা উঠে যায় খোলে। গজ এলিয়ে পড়ে ঘোড়ার গায়ে। রাজা শুয়ে পড়ে রানির পাশে। মন্ত্রী চলে যায় বেড়েদের পায়ের তলায়। রাতে মানুষ চলে আসে মানুষের কাছে। অতীত সরে আসে বর্তমানে। নিদ্রার অচেতনতা এগিয়ে আনে অদৃশ্য ভবিষ্যৎ। গাছের ডালে প্রথম রাতে যা ছিল কুঁড়ি, ভোরের আলো ফোঁটার আগেই তা হয়ে দাঁড়ায় পরিপূর্ণ একটি স্থলপদ্ম। দিন চলে যায়। জঠরে জ্বণের আকার একদিনের মাপে বাড়ে। ফাঁসির আসামি মৃত্যুর। দিকে এগিয়ে যায় আরও একদিন। কারুর আসার দিন এগিয়ে আসে, কারুর যাওয়ার দিন। সময় পৃথিবীর সর্বত্র একতালে চলছে না। কোথাও ঘোড়ার চাল, কোথাও বলদের চাল, কোথাও স্থির। পৃথিবী কখনও জ্যোতির্ময়ী কখনও তামসী। মহামায়ার পদতলে শ্বেতশুভ্র শিব। দিন গেল, রাত এল—সময়ের এই হল সহজ হিসেব। জন্ম আর মৃত্যু এই হল নাটকের এক-একটি অঙ্ক। যা ছিল, তা একদিন নেই হবে, যা ছিল না, তা একদিন আছে হবে। শেষ হবে না কিছুই।
কালোয়াত কাল
কোথায় গেল আমাদের সেই সময়। Good old days চতুর্দিকে এত বিভিন্ন রকমের ভয়ংকর ভয়ংকর অপরাধী মার্কেটে ছাড়া পায়নি। জমিদাররা লেঠেল, পাইক, বরকন্দাজ পুষতেন। জমি দখল, চর দখল এই সব নিয়ে মারদাঙ্গা, মাথা ফাটাফাটি হত। লাশও পড়ে যেত। পুলিশ কেস। হত। উকিলে-উকিলে মুখ শোঁকাকি। মামলা উঠল, মামলা নামল। বিধবার সংখ্যা বাড়ল।
ডাকাত ডাকাতি করত সম্পন্ন মানুষের বাড়িতে। গরিবগুর্বো মধ্যবিত্তদের এলাকায় চোর, হিঁচকে চোর আর সিঁদেল চোর। ঘটি, বাটি, ল্যাম্পো, গামছা, গাড়ু, লাউ, কুমড়ো, বেগুন, বরবটি, দু কুনকে চাল, শালগ্রামের সিংহাসন, সাইকেল, দা, কুড়ুল, খোন্তা, গাঁইতি ইত্যাদি হাবিজাবি জিনিস চুরি করত।
গোলাগুলি, বন্দুক, চপার এসব ধারে কাছে যেত না। এদের একটাই কোয়ালিফিকেশন ছিল জলের পাইপ বেয়ে ওঠা, গাছের ডাল ধরে ঝুলে পড়া। কার্নিশ বেয়ে হাঁটা। চালের বাতা সরিয়ে ঘরের ভেতর ধুপ করে নয়, থুপ করে নেমে পড়া। এদের কাছে থাকত গুরুদত্ত ঘুমপাড়ানি মন্ত্র।
তখন সস্তাগণ্ডার বাজার। গোটাকতক শাড়ি, ধুতি, কাঠকুটো, তেল, মশলা, চুরি করলে দু একদিনের জন্যে সংসারের সুরাহা হত। ব্যাঙ্কডাকাতি, রেলডাকাতি এসব বড় বড় ব্যাপার। অবশ্যই রিস্কি। আমাদের কালে ছিচকে চোরদের ওপর মানুষের সিমপ্যাথিও ছিল। রাতে যে চোর, দিনের বেলা সে তো আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ। কলেজে পড়ি, আমাদের সকলের ভীষণ প্রিয় ভোলাদার চায়ের দোকানে চা খাই। সেই সময় মাঝেমধ্যেই লিকলিকে রোগা আমাদেরই বয়সি একটি ছেলে চা খেতে আসত। সবাই জানত সে চোর। তার কোনও লজ্জা, দ্বিধা, সংকোচ ছিল না। হাসছে, কথা বলছে, মজার মজার কথা। সেইসব কথা শুনে আমরা সবাই হো হো করে হাসতুম। সে যে চোর, একথা জানাতে তার কোনও লজ্জাই ছিল না।
