পরের দিনই দিব্যেন্দু ফিরে গেল উত্তরবঙ্গে। বসন্ত ফেটে পড়েছে শহরতলির বনস্থলীতে। দূর আকাশের পাহাড়ে অভ্ররেখা। সারাদিন কাজে কর্মে বেশ তবু কেটে যায়। রাতে, আটটার মধ্যে শহর নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। তখন! তখনই দিব্যেন্দু তার নিরালা ঘরে বসে ভাবতে থাকে। দুটো প্রশ্ন —প্রেম আছে? না প্রেম নেই? পরক্ষণেই হু-হু পাহাড়ি বাতাসে দুলে ওঠে জানলার পরদা, সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে দ্বিতীয় প্রশ্ন—ভূত আছে? না নেই? কেউ বলে আছে, কেউ বলে নেই। মৃণালের ছোট্ট লেডিজ রুমাল দিয়ে চশমার কাচ মুছে, দিব্যেন্দু কারওকে একটা চিঠি লেখার চেষ্টা করে। কাকে লিখবে?
প্রেম বাড়ছে
সভ্যতা বাড়ছে। অসভ্যতা বাড়ছে। সভ্যতার বয়স বাড়ছে। নেতা বাড়ছে, গুরু বাড়ছে, চেলা বাড়ছে, জন্মের হার বাড়ছে, জিনিসের দাম বাড়ছে, কালো টাকা বাড়ছে, খুন বাড়ছে, গুন্ডামি বাড়ছে, সেইরকম প্রেমও বাড়ছে। চারের দশক, পাঁচের দশকে এত প্রেমিক-প্রেমিকা ছিল না। যত লোডশেডিং বাড়ছে, তত প্রেম বাড়ছে। যত ফ্ল্যাট বাড়ছে, তত প্রেম বাড়ছে। যত বেকার বাড়ছে, তত প্রেম বাড়ছে। ছয়ের দশক পর্যন্ত প্রেম ইঁদুরের মতো বইয়ের কলে রুপালি পর্দার ঘেরাটোপেই আটকে ছিল, হঠাৎ বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও, আ-হা, হাহা, হাহা, হাহা, হা। এখন ঘরে ঘরে প্রেমিক-প্রেমিকা।
‘যদি প্রশ্ন করা হয়, ছেলে কী করে?
‘আজ্ঞে প্রেম করে।’
‘চাকরি-বাকরি?’
‘দেশে তো চাকরি নেই, আছে সংরক্ষণ। যা নেই তার সংরক্ষণ।
‘খালি বাটি চাপাচুপি দিয়ে রাখা। খুলে দেখো ফক্কা।’
‘তাহলে প্রেম ছাড়া করে কী? জীবনের ছক বাতলান।’
প্রেমের পুজো, পুজোর প্রেম
বর্ষা বিদায় নিলেন। শরৎ এসেছে নীল আকাশের আঁচল উড়িয়ে। তারার চুমকি বসানো রাত। পেঁজা তুলোর মতো পাহাড়ে ফর্মেশান। ভাঙা কলকাতার দক্ষিণের আকাশের দিকে ঘাড় তুলে তাকালে মনে হয় ডনভ্যালিতে লেংচে বেড়াচ্ছি, চোখের সামনে মেঘের মুসৌরী। মৃদুমন্দ বাতাস ঘাড়ের কাছে প্রেয়সীর নিশ্বাসের মতো বলতে চাইছে, আমার রাজা, শরৎ এল, মৃগয়ায় যাবে না! কোথা সে বন সখী? কোথা সে জল? রাজারা আর মৃগয়ায় যান না। এখন মৃগয়ার যুগ। কথায় কথায় লাশ পড়ে যায়।
আমি কৃষ্ণ নই, নবকার্তিক নই, মোগল বাদশাহনই, ওমর খৈয়ামও নই; তাতে কী এসে যায়। আমার কায়দায় আমি চলব। সেই নোনাধরা গলির গলি তস্য গলির বাড়িতে আমার কোনও প্রেমিকা থাকতে পারে। হতে পারে তার এলোচুল কোমরের কাছে লুটিয়ে থাকে না, হতে পারে তার চোখ দুটি তেমন পটলচেরা নয়। চশমার আড়ালে সে চোখ কিছু নিষ্প্রভ। হাসিতে তেমন ঝিলিক নেই। কোনও প্রাইমারি স্কুলে ছাত্র ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে মেজাজ ঈষৎ তিরিক্ষি। তা হোক। ঘুসঘুসে জ্বরের মতো এই প্রেম চলেছে সেই সেভেন্টি টু থেকে। দরখাস্তের ভাষায়, সিনস। নাইনটিন সেভেন্টি টু আই হ্যাভ সাফারিং ফ্রম। এই একাশিতেও ম্যাচিওর করল না। করবে কী। করে? সাকার হতে হতে তো নিরাকার হওয়ার দিন এসে গেল। তবু এই শরতে আকাশে-বাতাসে ঢাক আর মাইকের শব্দ যখন খইয়ের মতো ভাসছে তখন একটু লড়ে যেতে দোষ কী।
ঘ্যাম অফিসের ঘ্যাম এগজিকিউটিভ তাঁর আলট্রামডার্ন প্রেমিকাকে নিয়ে গোয়া চলেছেন। পুজোয় যাঁরা কলকাতা ছাড়েন না হয় তাঁরা অথর্ব, নয় তো হা-ঘরে। এ সময়টা হল, চলো রীণা ক্যাসুরিনার। হিলটপ হোটেলে ফায়ার প্লেসের বারে বোসো। জল নয়, লাল পানীয়, দামি সিগারেট ঠোঁটে। বাইরের আকাশ ঢালু হয়ে বহু নীচে গাছ গুড়ি-গুড়ি, দেশলাই-দেশলাই বাড়ি আর ফিতে ফিতে নদীর ওপর টাল খেয়ে পড়েছে। এদিকে চাঁপার কলির মতো আঙুলে আংটির পাথরে আলোর মুচকি হাসি। এনামেল করা ঠোঁটে রাজ্যের তৃষ্ণা। পুরু কার্পেটে পায়ে-পায়ে জড়াজাড়ি। যেন সিগারেটের বিজ্ঞাপন। বহু দূরের আকাশের তলায় সেইন্যাস্টি ম্যাটমেটে কলকাতা! ঢাক বাজছে ঢ্যাম-কুড়-কুড়। প্যান্ডেলের বাঁশের আড়ায় উঠে, সস্তা নীল প্যান্ট-পরা দস্যি ছেলের দল বাঁদরের মতো লাট খাচ্ছে। লাঠিসুদ্ধ কাঁপা-কাঁপা হাত জোড় করে কপালে। ঠেকিয়ে বৃদ্ধ মানুষ মা দুর্গাকে নমস্কার করতে করতে মনে মনে বলছেন, কী যুগে এনে ফেললে দেবী! হঠাৎ সন্দেহ হল, মঞ্চে মায়ের ফ্যামিলির সবাই ঠিকঠাক আছেন তো? না, লাস্ট মোমেন্টে দোলা ফেল করে, এক-আধজন কৈলাসেই পড়ে রইলেন! পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চনমনে নাতনিকে জিগ্যেস করছেন, হ্যাঁ রে, আসল যে অসুর সেই অসুর কোথায়? নাতনির মন তখন অন্যদিকে। বারোয়ারির পটলদা অনেকক্ষণ চোখ দিয়ে বন্দুক দাগছে। দাদুর আবার সংশয়ের প্রশ্ন, হ্যাঁ রে, অসুর আছে তো? এতক্ষণে নাতনির কানে কথা ঢুকল। মনে মনে পটলদাকে বলল, অসভ্য। দাদুকে অসহিষ্ণু গলায় বললে, কী তখন থেকে অসুর অসুর করছ? এই তো পাম শু পরে, ঘাড় এলিয়ে বুক চিতিয়ে রয়েছে, দেখতে পাচ্ছ না? ওদিকে পটলদার চেলা বলছে, গুরু, একটু। হ্যারাসমেন্ট হলেও, মায়ের খুব টান আছে, খাঁটিয়া থেকে সব খটমল বের করে আনে। কী সব। জিনিস আসছে মাইরি! চকু সাত্মক। এদিকে বৃদ্ধের আবার প্রশ্ন, হ্যাঁ রে, গণেশের ইঁদুর? পাশে আর এক বৃদ্ধ এসে দাঁড়িয়েছেন। জবাব তিনিই দিলেন, তুমি কিচ্ছু ভেবোনা মধুসূদন! সব আছে। তুমি আছ, আমি আছি, অসুর আছে, ইঁদুর আছে, মা-জননী আছেন। লাল, তামাটে চুল ফিতের প্রজাপতি মেলে খয়া খয়া চেহারার একটি মেয়ে বৃদ্ধের নাতনির জামাকাপড়ের বাহার দেখছে।
