একদিন দেখি, বিহারী মোটা দাঁড়ার চিরুনি দিয়ে বিমলার চুলের জট ছাড়িয়ে দিচ্ছে। যেন দুই সখী। বিমলা একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল, এই মানুষটার কাম নেই, এর সবটাই প্রেম। আমাদের এই সংসার—আনন্দের সংসার। দুঃখ আমাদের পোষা কুকুরের মতো। আর কষ্ট হল আমাদের পাপোশ।
এই ভয়ংকর পৃথিবীর খাঁজে খাঁজে কোথাও না কোথাও এইভাবে স্বর্গ আটকে আছে। দেবতার দেখা পাওয়া যায়!
স্বামী-স্ত্রী সংসার
দেখো, বছর পাঁচেক হল আমাদের বিয়ে হয়েছে. প্রশান্ত চায়ের কাপে চুমুক লাগাল। প্রথম চুমুকটা সশব্দে। পরেরটা একটু কম শব্দ। তৃতীয়টা নিঃশব্দে। অর্থাৎ ঘোরতর আবেগ, স্বল্প আবেগ এবং পরিতৃপ্তি। সামনে পোর্সেলিনের প্লেটে ঘিয়ে-ভাজা ফুল ফুল চিঁড়ে, তার ওপর মিহি করে ছড়ানো মরিচের গুড়ো। পাশে আড় করে রাখা ঝকঝকে একটি চামচে।
কাপটা বেশ সন্তর্পণেই নামাতে চেয়েছিল। দূরত্ব আর বেগের হিসেবের সামান্য গোলযোগে সেই ঠকাস শব্দটা হলই হল।
প্রমীলা সামনের সোফায় বসে সোয়েটার বুনছিল। এই বোনার সময় সে গোলমতো অদ্ভুত একটা চশমা পরে। নাকের ডগায় ঝুলিয়ে রাখে বিচক্ষণ মোক্তারের মতো। প্রমীলা কোনও কথা না বলে স্থির দৃষ্টিতে প্রশান্তর দিকে তাকিয়ে রইল। প্রশান্ত অপরাধীর মতো মুখ করে বললে, আই অ্যাম সরি। আমি সাবধানেই নামাই, আর তখনই টেবিলটা ওপর দিকে উঠে আসে, এ এক অদ্ভুত ভৌতিক ব্যাপার।
প্রমীলা বোনায় মনোনিবেশ করে বললে, হুঁ, এর দাওয়াই আমার জানা আছে।
এর আবার দাওয়াই কী?
স্টিলের গেলাস। বাহারি কাপ তোমার জন্যে নয়।
প্রশান্ত ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চিঁড়ের প্লেটটা যেই তুলতে গেল, চামচেটা পেঁকির মতো উলটে পড়ল মেঝেতে পেতে রাখা কার্পেটে। সঙ্গে কিছু চিঁড়ে। অনেকটা সুন্দরীর মূৰ্ছা যাওয়ার মতো। প্রশান্ত এইবার কাঁচুমাচু মুখে বললে, আই অ্যাম সো সরি।
প্রমীলা বোনাটা পাশে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল। প্রশান্তর পায়ের কাছে শয্যাশায়ী চামচে আর ছত্রাকার চিঁড়েভাজার দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কোমরে হাত। নাকের ডগায় চশমাটা আরও ঝুলে গেছে। প্রশান্তর কোলেও কিছু চিঁড়ে। প্রশান্ত ফ্যাকাশে মুখে বললে, তুমি
কিছু ভেবো না, আমি একটা একটা করে সব চিঁড়ে তুলে দেব।
চিঁড়ে তো তুলবে, চিঁড়ের সঙ্গে যে মরিচ আর নুন ছিল সব তো ঢুকে গেল কার্পেটে। সে আমিব্রাশ দিয়ে ঘসঘস করে—
কার্পেটটার বারোটা বাজাবে। তোমার যা কালচার, তোমার উচিত রাস্তার রকে বসে মুড়ি তেলেভাজা আর মোটা কাচের গেলাসে চা খাওয়া।
প্রমীলা নীচু হয়ে চামচেটা তুলতে তুলতে বললে, কত কাজ যে বাড়াও। তোমার জন্যে একটা মিনিট শান্তিতে বসার উপায় নেই। বিছানার বেডকভারে কী ফেলেছিলে সকালে?
আমিই-ই!
হ্যাঁ, তুমি।
কই, কিছু না তো!
বিছানায় বসে দাঁত মাজছিলে?
বিছানায় বসে কেউ দাঁত মাজে?
তুমি সব পারো। তোমার তুলনা তুমি। আমাকে গোপালের মা বললে, দাদাবাবু টিভি দেখতে দেখতে মাজনের টিউব টিপছিল। ফটাস করে খানিকটা পড়ল। তার ওপর মাথার বালিশ চাপা দিয়ে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে গেল। আমরা সবাই জানি, কোনও একটা অপকর্ম করার পরই তুমি তোমার সেই বিখ্যাত শ্যামাসংগীতটা গাও।
প্রশান্ত বললে, তোমাদের কী হয়েছে জানো? যত দোষ নন্দ ঘোষ।
আজ্ঞে না, আমরা শুধু শুধু লোকের নামে দোষ দিইনা। মানুষের হ্যাবিটস থাকবেই। তোমার সবই ব্যাড হ্যাবিটস। চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়া। দাঁত মাজতে মাজতে টিভি দেখা। শোবার ঘরে চুল আঁচড়ানো। নাকে রুমাল চাপা না দিয়ে হাঁচা। বাথরুম থেকে বেরিয়ে পাপোশে পানা মোছা। ভিজে তোয়ালে জড়ো করে রাখা। বাথরুমের আলোনা নেবানো। কলের মুখ। ভালো করে না বন্ধ করা। সারারাত ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ার শব্দ। ওই দেখো, অফিস থেকে এসে জুতো খুলেছ। যেখানে খুলেছ সেইখানেই পড়ে আছে। মোজা খুলে জুতোর ভেতরে ভালো করে ঢোকাবার ধৈর্যও নেই। একটা বাইরে ঝুলে আছে জুতোর লেজের মতো। তুমি যে জায়গা দিয়ে হেঁটে যাবে সেখানে পাপোশ থাকলে ট্যারাবাঁকা। কার্পেট থাকলে ঢেউ খেলা। চটি থাকলে লাথি মারা। চুল আঁচড়াবে, চিরুনিতে চুল। দাড়ি কামাবে, সাবান মাখানোবুরুশটা পড়েই থাকবে। ডট পেন খুলবে বন্ধ করবে না। জামা খুলবে হ্যাঙারে ঝোলাবে না। বিছানায় শোয়া মাত্রই চাদর-মাদর গুটিয়ে একটা লন্ডভন্ড কাণ্ড। টুথব্রাশ জায়গায় না রেখে যেখানে-সেখানে ফেলে রাখা।
ছেলেবেলায় আমার মা শ্রীকৃষ্ণের শতনাম পড়তেন, এ যেন অনেকটাই সেই রকম। তাহলে শোনো আমি বলব না। দেখাব।
প্রশান্ত উঠে গেল। ফিরে এল একটা কাগজের বাক্স নিয়ে। বাক্সটা সামনের টেবিলে রেখে প্রশান্ত বসল। প্রমীলাকে বললে, তুমিও বোসো।
দুজনে মুখোমুখি। প্রশান্ত একজোড়া কানের টাব বের করে টেবিলে রাখতে রাখতে বললে, এগজিবিট নাম্বার ওয়ান। বাথরুমের জানলার ওপরে অবহেলায় পড়েছিল বোধহয় সাতদিন।
প্রমীলা বললে, অ, এইটা! আমি তো বাথরুমেই রাখি। সেফ জায়গা। খুলি, রাখি, রাখি, খুলি। তোমাকে কে হাত দিতে বলেছিল? চোরের স্বভাব!
মানে? চোরের স্বভাব মানে?
মানে খুব সোজা। সোনার মতো কিছু দেখলেই হাত দেবার ইচ্ছে, সরিয়ে ফেলার ইচ্ছে,
