গান শেষ। সবাই স্তব্ধ। ঘোর লেগেছে। শাস্ত্র পালিয়ে গেছেন। ঠাকুর কথা বলছেন, ভজনানন্দ, ব্রহ্মানন্দ, এই আনন্দই সুরা। প্রেমের সুরা। মানবজীবনের উদ্দেশ্য ঈশ্বরে প্রেম। ঈশ্বরকে ভালোবাসা। ভক্তিই সার। জ্ঞান বিচার করে ঈশ্বরকে জানা বড়ই কঠিন। মহেন্দ্রনাথ বললেন, আমার অধ্যাপক বন্ধু কালীকৃষ্ণকে যেদিন প্রথম এখানে নিয়ে আসি সেদিন আমায় জিগ্যেস করেছিল, কোথায় নিয়ে যেতে চাও?
বলেছিলুম, খুঁড়ির দোকানে যাবে তো আমার সঙ্গে এসো, সেখানে এক জালা মদ আছে। বাড়ির নীচের গোলমালটা খুব বেড়েছে এইবার। মনে হচ্ছে অনেক লোক ঢুকে পড়েছে। এইবার দেখতেই হচ্ছে, ব্যাপারটা কী হল।
সরষে
আমি অনশন করব, আমৃত্যু অনশন।
সকালে চায়ের কাপ হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে জানালার দিকে মুখ বাড়িয়ে বসলেন প্রকাশবাবু। ঘটনাস্থল কলকাতার উপকণ্ঠে মধ্যবিত্ত পাড়ার সদ্যনির্মিত একটি বাড়ির দোতলার ঘর। পশ্চিম খোলা। জানলার ওপাশে আকাশ, পরিমিত গাছপালা। দু-একটি বাড়ি। গোটাকতক পায়রা। চরিত্র দুটি প্রাণী। সদ্য অবসরপ্রাপ্ত, ডাকসাইটে শিক্ষক প্রকাশ মুখোপাধ্যায় আর তাঁর স্ত্রী মহামায়া মুখোপাধ্যায়। বিবাহের আগে ছিলেন চট্টোপাধ্যায়।
কাপ থেকে চা চলকে ডিশে পড়ল। আর একটু জোরে ঠেললে মহামায়ার হাতে তৈরি, নীলের ওপর সাদার কাজ করা টেবিলক্লথে পড়ত। সেই সম্ভাবনায় মহামায়ার ভুরু কুঁচকে ছিল। মনে মনে প্রস্তুতও ছিলেন, একটু পড়ুক, তারপর কী করতে হয়, আমিও দেখাব। সাতদিন হয়ে গেল বাতের ব্যথায় উঠতে পারছিনা। ডাক্তারের কথা, ওষুধের কথা বলে বলে মুখে ফেকো পড়ে গেল। একদিন নিয়ে এলেন ঢ্যাঁপা ঢ্যাঁপা একগাদা রসুন। এককোষি রসুন রোজ সকালে একটা করে জল দিয়ে কোঁত করে গিয়ে ফেলো মায়া, সাতদিনে তোমার বাত বাপ বাপ করে পালাবে। আর একদিন নিয়ে এলেন ইয়া মোটা এক স্টিলের পাঞ্জাবি বালা। এটি মায়ের নাম করে ধারণ করে ফেলো মহামায়া, বাত তো ভালোই হবে, দেখবে যৌবনও ফিরে আসছে আবার। শেষে। নিয়ে এলেন হাততিনেক ইলেকট্রিক তার। কোমরে আড়াই প্যাঁচ মেরে বসে থাকো মায়া, প্রথম বর্ষার প্রথম বিদ্যুতেই অ্যাকশান পেয়ে যাবে। শরীরে কয়েক ওয়াট কারেন্ট ঢুকলেই তোমার। হাত-পায়ের গাঁট খুলে যাবে, যৌবনকালের মতো সারা বাড়ি ধুমধুম করে আবার দাপিয়ে বেড়াবে। কেপপন অনেক দেখেছি বাবা, এই মানুষটার মতো এমন হাড়-কেপপন দেখিনি!
মহামায়া ভারিক্কি গলায় বললেন, চা-টা চলকে টেবিলক্লথে পড়ে গেলে কী হত? আকাশের দিকে ফেরানো মুখ তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, যেত, যেত।
সাতসকালে বাবারে মারে করতে করতে চা করে নিয়ে এলুম, উলটে ফেলে দেওয়ার জন্যে! যত বয়েস বাড়ছে, তত তোমার রাগ বাড়ছে। ছেলে-মেয়ে, বউমা এই নিয়ে হাসাহাসি করে, তোমার প্রেসটিজে লাগে না?
না, লাগে না। ওরা হাসার জন্যে, ব্যঙ্গ করার জন্যে জন্মেছে, আমি জন্মেছি সেই উপহাস আর ব্যঙ্গ কুড়োবার জন্যে। যুগটাই তো পড়েছে, বাপ-জ্যাঠার কাছা খোলার যুগ। অপমান আমার। নয়, অপমান ওইসব চপল বালক-বালিকার। যাদের জীবনটাই হল অনন্ত, অখণ্ড, অপার, অপরিমেয়, অনিয়ন্ত্রিত, অলস তামাসার। পরপর একগাদা অকারান্ত শুনে মহামায়া বললেন, বাপস। রাগের চোটে মুখ দিয়ে অমরকোষের স্রোত বইছে। নাও খুব হয়েছে, চা খেয়ে নাও। ছেলেমানুষের মতো কথায় কথায় অত ক্ষেপে যাও কেন?
প্রকাশ এবার জ্বলন্ত মুখ ঘোরালেন, নো মোর সুগার কোটেড ওয়ার্ডস ম্যাডাম, মিষ্টি কথায় আর চিঁড়ে ভিজবে না, জল চাই, জল। বোকারাও ধাক্কা খেতে খেতে একদিন বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে, তখন আর তাকে বোকা বানানো যায় না। তখন নিজেকেই বোকা বনে যেতে হয়। কথা যত কম হয় ততই ভালো। তোমাদের সবকটাকে আমি চিনে নিয়েছি। সব শেয়ালের এক রা।
আমরা কী করলুম যে শেয়াল-টেয়াল বলছ?
এই সংসারে আমি এখন উপেক্ষিত। এ নেগলেক্টেড ওল্ড ফুল। আমার কোনও স্ট্যাটাস নেই। আমি গৃহপালিত দিশি কুত্তার মতো।
আঃ, কী যা-তা বলছ?
ঠিকই বলছি, ফ্যাক্ট ইজ ফ্যাক্ট। তোমরা যেই দেখলে, বুড়ো ব্যাটার লাস্ট ফার্দিংবাড়ি তৈরিতে খরচ হয়ে গেছে, রেস্তো চুঁচুঁ, ব্যাংক-ব্যালেন্স নিল, মরলে একজোড়া চশমা, আর ছেড়া একজোড়া চপ্পল ছাড়া আর কিছুই ব্যাটা রেখে যাবে না; তখনই তোমরা সব নিজমূর্তি ধরলে। ক্যাপসুল খুলে গেল। ঠিকই করেছ। জগতের নিয়মেই চলছ। প্রত্যাশা থেকেই মানুষের হতাশা আসে। মনের আর দেহের জোর থাকলে বানপ্রস্থে চলে যেতুম। এতকাল ধরে বোকাটাকে কুরে কুরে খেয়েছ। জ্ঞান যখন হল তখন দেখলে বোকার ছোবড়াটা পড়ে আছে। নড়বার-চড়বার ক্ষমতা নেই। চোখে চালসে, হাত-পা কাঁপছে। পড়ে পড়ে মার খাও। বাঁধা মার। সাংখ্য কী বলেছেন জানো—জীব তিন ধরনের দুঃখ পায়, আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক আর আধিদৈবিক। আধ্যাত্মিক দুঃখের কারণ আমাদের ইন্দ্রিয়, আর…।
তোমাদের সাংখ্যে গুলি মারো। সারাদিন ওই ছাইপাঁশ পড়ে পড়ে মাথাটি একেবারে গেছে। একদিন আগুন লাগিয়ে দেব, আপদ চুকে যাবে।
বাঃ চমৎকার মাস্তানি ভাষা শিখেছ তো। একজন অবসরপ্রাপ্ত, সম্মানিত, জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত প্রধানশিক্ষকের স্ত্রী-র ল্যাংগোয়েজ দেখো! আমাকে জুতো মারা উচিত। আমার গলায় যাঁরা পদক ঝুলিয়েছেন, তাঁদের বললো, এবার এসে জুতোর মালা ঝুলিয়ে দিয়ে যাক। যে নিজের বাড়িকে। শিক্ষিত করতে পারল না, সে সারাটা জীবন উৎসর্গ করে গেল দেশের শিক্ষায়। অপদার্থ পাঁঠা! আমি অত কথা শুনতে চাই না, তুমি চা খাবে কিনা?
